আমার চোখে ব্রাত্য রাইসু যেভাবে ধরা দিলো

ব্রাত্য রাইসু ভাইয়ের সাথে কবে ফেসবুকে পরিচয় তা ভুলে গেছি। বাস্তবেও কখনো কাছে থেকে দেখার বা আড্ডার সুযোগ হয় নাই।

প্রথম প্রথম উনার স্ট্যাটাস দেখলেই মেজাজ খারাপ হইত। সারাদিন রবি, নজরুল, জয় গোস্বামী সহ এহেন কোনো কবি নাই সমালোচনা করেন না, এইগুলা দেখে উনাকে নিতে কষ্ট হইত। ভাবতাম এই লোকের কি আর কাজ নাই?

এক সময় তো উনি খুব ভালো লেখতেন। পুরাতন কবিতা পড়ে মুগ্ধতা ছিল উনার প্রতি, অসাধারণ আর্ট করেন সেটা যে কেউ বিনা দ্বিধায় মেনে নিবেন। কিন্তু এখন উনি বড় কবিদের পিছনে কেন লাগছেন? কী এমন হ্যাডম হইয়া গেছেন যে অন্যরে নিচা কইরা নিজে বড় হইতে হইব?

এই ভাবনাগুলা তখন প্রকটভাবে ক্রোধান্বিত করত। আবার মনের অগোচরেই ভাবতাম, আচ্ছা আমি কি এক্সট্রিমিস্ট? রবি, নজরুলরে সমালোচনা করলে আমার লাগে কেন? নিজেই উত্তর দিতাম—আমি তো এক্সট্রিমিস্ট নই, শুধু বড়রে ছোট করাতে এত আনন্দ কীসের এটা মানতে পারছি না। ভাবনার এই দোলাচলে বইমেলা সামনে রাইখা দেশে যাওয়ার ছুটি নিলাম ২০১৫ সালের পুরা ফেব্রুয়ারি মাস। ততদিনেও এই আমার মাথা থেকে রাইসু ভাইয়ের প্রতি না ভালো লাগাটা যায় নাই।

হাসান আহমদ অপু

দেশে গিয়া বইমেলায় ‘ভিন্নচোখ’ এর স্টলে আফজাল ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। ভিন্নচোখ-এর সাক্ষাৎকার সংখ্যা কিনব বলে বইটা খুলে দেখি রাইসু ভাইয়েরও সাক্ষাৎকার। বইটা কিনলাম না রাইসু ভাইয়ের জন্যই। আফজাল ভাইরে বললাম, আগের কবি, চিত্রকর আর এখনকার রাইসুর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। উনি সমালোচনা না কইরা নিজে কবিতা লেখায় মনোযোগ দিয়া রবি, নজরুলরে ঢিঙ্গায়া যাইতে পারলে সমালোচনা মানাইত কিংবা সেই চেষ্টা করলে হয়ত বাংলা সাহিত্যও উপকৃত হইত। (খুবই সরল চিন্তা)।

ইতালি চলে আসলাম বইমেলা কাটিয়ে। ফেসবুকে যথারীতি রাইসু ভাইয়ের পোস্ট দেখি। বইমেলা থেইকা আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার কিনছিলাম, যদিও অনলাইনে কিছু সাক্ষাৎকার আমি আগেই পড়ছি। এই সাক্ষাৎকারগ্রহীতা রাইসুই যে ফেসবুকের রাইসু সেটা জানা ছিল না।

ইতালির কাপ্রিতে ঘোরাঘুরি।

যে জয় গোস্বামীর কবিতার সমালোচনা করেন একদিন দেখলাম উনার সাথেই তার ছবি। সেইটা উনি ফেইসবুকে শেয়ার দিলেন। যে আহমদ ছফার সাথে হাজারো স্মৃতি তার সেই আহমদ ছফারে সমালোচনা করেন নির্দ্বিধায়। এই যে সম্পর্ক রেখেও ভেতরে কোনো ঘৃণা পোষণ না করে সমালোচনা করা যায় এই গুণটা তার আমি ধরতে পারলাম। অনেকটা এই ধারার আমি নিজে বইলাই হয়ত রাইসু ভাইরে আমি এমনে চিনতে পারছি। সমালোচনা মানেই যে ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষ নয় এইটার উদাহরণ হইতে পারে রাইসু ভাই। আমিও অনেক বড়দের সামনে অনলাইনে বেয়াদবি করি, মতামত লইয়া মুরুব্বিগো সাথে তর্কাতর্কি করি। বিশেষ কইরা আমার এলাকার তারা আমারে বেয়াদবই বলেন কিন্তু আমি জানি যখন আমি সমালোচনা করি সেই স্পেসিফিক বিষয় ছাড়া ব্যক্তির প্রতি কোনো ঘৃণা পোষণ করি না।

শুধুমাত্র এই জিনিসটা আবিষ্কারের পর তার প্রতি আমার ভালো লাগার শুরু। এই যে অনলাইনে হঠাৎ কইরা ঝগড়া লাগায়া দেওয়া, যে কাউরে নিয়া সমালোচনা করা—আমি শুধু এইসব স্ট্যাটাসের নির্যাসের ভেতর দেখতে পাই, রাইসু ভাই কোনো ঘৃণা কিংবা হিংসার বশবর্তী হয়ে এইগুলা করছেন না। উনি এইগুলা করবেন বইলাই হয়ত উনি রাইসু।

তারপর যতজন আমার সামনে তার ব্যাপারগুলাতে অভিযোগ করে, আমার মুগ্ধতারে সরাইতে চায়, আমি আপন মনে বলি—ওই অভিযোগগুলা আমারও ছিল। যেহেতু এইসব অভিযোগের ভেতর দিয়া গিয়া নিজেই উনারে আবিষ্কার করছি তাই তাগো অভিযোগের পালস ধরতে আমার অসুবিধা হয় না। এক কথায় বলি, দেখুন উনি যাই বলেন এর ভেতর কোনো ঘৃণা নাই, আক্রোশ নাই। উনারে ভালো লাগতে এইটুকু জানাই আপাতত আমার জন্য যথেষ্ট।

সবচেয়ে বেশি রাইসু ভাইয়ের ব্যাপারে যে ব্যাখ্যা দিতে হইছে সেটা হলো ‘দোরা কাউয়া পেয়ারা গাছে’ কবিতার কাহিনি কী? দোরা কাউয়া কে, পাতি কাউয়া কে?

আমি সহজ উত্তর দিতাম একটা লাইন আছে না—”দোরা কাউয়া পাতি কাকের গোয়া মারে রে।” দোরা কাউয়া হল বড় কবি পাতি কাউয়া নতুন কিংবা ছোট কিংবা তারকা না হওয়া কবি। তো বড়গুলান রেগুলার এই ছোট কবিগুলারে গোয়া মারতে থাকে। এই হয় নাই সেই হয় নাই বইলা নিজেরে এলিট শ্রেণী মনে করে। নতুন কবি হইলে তো কথাই নাই। ডাইরেক্ট সদরঘাট দেখায় এরা। এইভাবে নতুন প্রতিভারে গোয়া মারতে থাকে।

দোরা কাউয়া পাতি কাউয়ারে আমি বড় কবি ছোট কবি হিসাবে দাঁড় করায়া এর একটা ব্যাখ্যা বের করছি—রাইসু ভাই কী ভেবে লিখছে জানি না। রাইসু ভাই এই কবিতার ব্যাখ্যা দেন নাই। দিলেও চোখে পড়ে নাই। উনারা বলতেন এইটা আপনার ব্যাখ্যা রাইসুর না। তারপরও না বুঝাইতে পারলে আলোচনা শর্টের জন্য বলি, আমি উনার প্রতি বায়াসড, আমার কাছ থেকে উনার কোনো কিছুর মতামত নিয়েন না।

উনার অনেক মতের সাথে আমি একমত নই একদমই। গণজাগরণ মঞ্চ নিয়া দুইজনের অবস্থান পুরা দুই মেরুর।

এই বছর অক্টোবরে দেশে গিয়েছিলাম। “আব্বারে কইলাম, আব্বা স্পিরুলিনা খামু, আইনা দিয়েন তো।
জিগাইল কেন? এইটা কী? কেন খাবি?

কইলাম ফুড সাপ্লিমেন্টারি। খাইলে মানুষ দেরিতে বুড়া হয়। রাইসু ভাই (পরিচয় দিয়া) খায়। আমিও খামু।

আব্বায় কইল, বুঝছি হামদর্দের লিনা মনে হয়। কইলাম, হ।

দেশে ছোট ভাই প্লাস বন্ধু নাঈমরে (যার সাথে বেশি সময় কাটে) বললাম, রাইসু ভাই একটা মাল, উনার লগে আড্ডাইতে ভালোই লাগব। নাঈমও ‘দোরা কাউয়া পেয়ারা গাছে’ কবিতার ব্যাখ্যা চাইছিল। উত্তর সম্ভবত ওইভাবেই (বড় কবি, ছোট কবি) দিছি, মনে নাই পুরা। যাই হোক এখন আড্ডা যে দিব কিন্তু কীভাবে? চায়ের দাওয়াতই বা কীভাবে দেই? প্রথম মেসেজ কী বলে শুরু করবো এই নিয়ে খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। নাঈম বলতো. আরে দিয়া দিয়েন মেসেজ—দেখেন কী হয়?

আমি তো জানি উনি মুখের উপর “না” কইরা দিতে পারেন এবং এর সম্ভাবনাও কম না।

মেসেজ বক্স খুলে লেখতে গিয়েও সাহস হইত না। এমনও হইছে মেসেজ লিখে কেটেও ফেলছি, সেন্ড করি নাই। অক্টোবরের ১৫ তারিখে নাঈম, শোভন আর আমি গ্রুপ চ্যাটের মধ্যে রাইসু ভাইয়ের ব্যাপারে আবারো আলাপ উঠতে নাঈম ভাই বলল, মিয়া সাহস কইরা পাঠায়া দেন তো এখনই। আমিও মেসেজ দিব কি দিব না করতে করতে পাঠায়া দিলাম—”ভাইয়া আপনার সাথে কি একদিন চা খাওয়া যাবে?”

রাইসু ভাই উত্তর দিলেন—“না।”

সাথে সাথে নাঈমরে বললাম, না করছে। নাঈম বলল, কীভাবে বলছেন স্ক্রীনশট দেন।

নাঈম বলল, আপনে তো গোড়াতেই গলদ করছেন, ‘ভাইয়া’ লেখছেন কেন? উনি তো এইটা পছন্দ করে না। আমিও অবাক হইয়া ভাবলাম, আরে এইটা তো আমি জানি কিন্তু ‘ভাই’ না লিখে ‘ভাইয়া’ লেখতাম গেলাম কেন? মেজাজ খারাপ হইল আরো।

কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ দিলাম, “প্রবাসী তো তাই ইচ্ছা ছিল।”

রাইসু ভাই উত্তরে লিখলেন, “২০ তারিখের পর নক কইরেন, বিকেলের দিকে টাইম করার চেষ্টা করব।”

২০ তারিখের আগেই আমার সামনেই চাচা গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। তাকে নিয়ে মেডিকেলে দৌড়াদৌড়ি, এদিকে নাঈমের আব্বাও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মেডিক্যালে ভর্তি হয়। খুবই খারাপ সময় যাচ্ছিল দুইজনেরই, তাই আর দেখা করা হয় নাই রাইসু ভাইয়ের সাথে।

দেখা হয়ে যাবে কোনো একদিন, তখন না হয় লেখবো, আকাশে রাইসুর লগে মেগ দেখতেছি। এখন পর্যন্ত মুগ্ধতা আছে রাইসু ভাইয়ের ব্যাপারে। হয়ত থাকবে আরো, না হয় না থাকুক তবে ঘৃণা থাকবে না।

আপনার অর্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে এই লেখা, শততম জন্মবার্ষিকীতে আরো অনেক কিছু লেখার প্রত্যাশায়।

(কভার ফটো. সেলফি, ইতালির নাপোলি থেকে কাপ্রি দ্বীপের পথে।)

Facebook Comments

Leave a Reply