আমার প্রাণের বন্ধু

তার সংস্পর্শে যেতে পেরে অন্যতম অর্জন যা করেছি মনে করি, "জীবনে কোনো কিছুই দরকার নাই"—এই ধারণাটা আগে-ভাগে জেনেছি।

নিচের লেখাগুলো শেষ করে সবশেষে একটা কথা প্রথমেই জানানোর জন্য উপরের এই লাইনগুলো লিখছি। তা হলো, দেখলাম নিয়ন্ত্রনহীনভাবে আবেগ আপ্লুত হতে দিয়েছি নিজেকে । আর সবচে ভালো লাগছে, আমরা এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছি । তার জীবদ্দশাতেই সংকোচের সীমা অতিক্রম করে অনুভব, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারলাম। এখনো ইচ্ছে করলেই যে কোনো সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে না হলেও যে কোনো ফুটপাতে বা রেস্তোরায় বিশ্বাসী বন্ধুরা মিলে অকপট আড্ডা দিতে পারি, হাসাহাসি করতে পারি। বা, পেছনের অসংখ্য দিনের মতো এখনো যে কোনো দুপুরে তার বাসায় হাজির হয়ে এক সাথে গরম ভাত খেয়ে পৃথিবীর সেরা সুখী মানুষদের একজন হয়ে যাওয়ার অনুভূতি নিতে পারি । তিনি যেমন বলেন, “গরম ভাতের গন্ধের মধ্যেই তো কবিতা, শিল্প, সাহিত্য সব পাওয়া যাইতে পারে! পেট ভইরা ভাত খান ভাই সকল! ভাতই কবিতা।” যা বলছিলাম।

যত ক্যাচালই তিনি পরিচিতজনের সঙ্গে করুন, রাইসু ভাইকে সব সময় শ্রদ্ধা-সম্মানের চোখে দেখি। কারণ, মনে হয় সব কিছু অকারণে মনের আনন্দে করছেন। সব কিছু ছাপিয়ে বন্ধুদের প্রতি তাকে একজন দায়িত্ববান ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে অন্যের প্রতি মমতাবান মানুষ মনে হয়। দৈনন্দিন আচরন ছাড়াও ‘সর্বসাধারণ’ (১৯৯৯) সিরিজের সাক্ষাৎকারগুলোতে তার এই নিখাদ পরিচয় ফুটে উঠতে দেখেছিলাম মনে পড়ে।

ফয়সল নোই

পরিচিতজনরা জানেন, সব সময়ই কথার পিঠে পাল্টা কথা বলেন তিনি। কোন ভুল ধরে আকাশ পাতাল কিছু বলে অপ্রস্তুত করে দিতে পারেন এই ভয়ে সরাসরি পরিচয়ের প্রথম থেকেই প্রত্যেকটা শব্দ দুইবার ভেবে উচ্চারণ করতাম। একবারই তার নিষ্ঠুর কৌতুকের মুখে পড়েছিলাম মনে পড়ে; এক বর্ষা সন্ধ্যায় তার কবিতার বই ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ বইটি কিনে পাঠক সমাবেশের সামনে কারো সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন দেখতে পেয়ে কিছু লিখে দেয়ার জন্য এগিয়ে দিলে লিখলেন, “ফয়সল নোইকে বই নয় অটোগ্রাফ দিলাম!”

লেখাটি পড়ে আমার মুখ কিছুক্ষণের জন্য কালো হয়ে যাওয়া হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন তিনি। এর পর এত বছরে আর কোনো দিন কঠিন কোনো কৌতুক-বাণ ছোড়েন নি আমাকে। বসের পঞ্চাশতম জন্মদিন নিয়ে কিছু লিখতে বসে সেই সতর্কতা অনুভব করলাম এই মাত্র। এই লেখা যদি তার চোখে পড়ে, কত ভুল যে তিনি পাবেন! ভালো লাগছে দীর্ঘ দিন পর আবারো তরতাজা মনে পড়ায়, রাইসু ভাইর মনোযোগ পাওয়ার কত চেষ্টা করতাম। ফিরে দেখলে এও দেখি পরিচয়ের পর প্রতিটা দিন তার প্রতি মানসিক ভাবে নির্ভরশীল ছিলাম, প্রতিদিন তার কথা মনে পড়েছে, কোন মুহূর্ত ভুলে ছিলাম না।

আমার মনে সব সময় ভরসা করে ছায়ার মতো পাশে রাখি তাঁকে। ফেসবুকে বিভিন্ন লেখায় সম্প্রতি টের পেলাম আমার মতো অনেকের মনোঃদার্শনিক তিনি। তার চিন্তাপদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান করি, ঘটনার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করি। তার সংস্পর্শে যেতে পেরে অন্যতম অর্জন যা করেছি মনে করি, “জীবনে কোনো কিছুই দরকার নাই”—এই ধারণাটা আগে-ভাগে জেনেছি। যেই সূত্রে জীবনে কিছু হতে হবে, এইম ইন লাইফের এই ক্লান্তিকর দুঃশ্চিন্তা থেকেও মুক্তি লাভ করেছি । এবং সেই সূত্রে সফল বন্ধু-বান্ধবদের দেখেও কোনো হিংসা লাগে না।

আগের কয়েক বৎসর দূর থেকে দেখলেও হীনম্মন্যতা, দ্বিধা কাটিয়ে কখনো কথা বলে উঠতে পারি নি। তবে দেখা হলে হাত তুলে সালাম দিয়েছি নিয়মিত। এখনকার মতোই চঞ্চল ও সদাহাসিমুখ ছিলেন। কী দেখছেন, কী গুরুত্ব দিচ্ছেন বুঝতে পারা মুস্কিল ছিল। এর অনেক পর আমাকে মুরীদ হিসাবে অস্বীকৃতভাবে মেনে নেয়ার পর বুঝেছি—তার কিছু বিষয়ের পাসওয়ার্ড বলে না দিলে অন্যের কোনো ধরনের গবেষণাতেই কোনো ফল হবে না। রাইসু ভাইর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি অনেক চর্চাই করেছি বিভিন্ন বিষয়ে। তার কিছু তিনি করেন বলে আমি অনুমান করেছি। কিছু জিজ্ঞেস করলে বুঝিয়ে বলেছেন। সেই সময়গুলো তুমুল আনন্দে কেটেছে। আমার মনের জন্য তাঁকে জীবনের সেরা শিক্ষক মেনে অপার আনন্দ পেয়েছিলাম। এই শিক্ষকেরই একনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হয়েছি। মনে পড়ে রাইসু ভাইর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘অর্থহীন কথা বলা’ চর্চা শুরু করেছিলাম।

রাইসু ভাইর সঙ্গে প্রথম সরাসরি কথা হয় একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের অনুরোধ করতে গিয়ে। মাসুদ হাসান ও আমার যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন অণৃন্য থেকে মুজিব ইরমের দ্বিতীয় বই ইরমকথা প্রকাশের পর প্রথম আলোর বাৎসরিক নির্বাচিত বইয়ের সমালোচনায় তা নিয়ে লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় চঞ্চল আশরাফ। প্রকাশক হিসেবে ওই লেখার প্রতিক্রিয়া লিখে হাজির হয়েছিলাম ব্রাত্য রাইসুর কাছে।

পরিবার পরিজন, বাল্য বন্ধুদের বাইরে ঢাকায় তিনিই প্রথম আমার সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছিলেন। সাহস করে দুর্বল হাতের লেখাগুলো নিয়ে প্রথম আলোতে গেলে তিনি ফ্রি হয়ে এসে ওয়েটিং রুমে সময় নিয়ে কথা বলতেন। এক সঙ্গে ঢাকা, ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক কবি যশোঃপ্রার্থী অপেক্ষা করতেন অনেক সময়। সবার সঙ্গে সময় নিয়ে কথা বলতেন। লেখা চেয়ে নিতেন হাত পেতে। নাক উঁচু ঠাট বা তাচ্ছিল্য পাই নি কখনো। তার হাসিমুখের সম্ভাষণ ও সার্বক্ষণিক হাসিমুখে মজা করে কথা বলা শুনে প্রাথমিক জীবনের বিপন্ন সময়, অসম্পূর্ণতা, সংকট ভুলে যেতাম।

একদিন আমরা কয়েকজন বসে থাকলে তিনি নাম্বার দিয়ে বললেন কার পর কার সঙ্গে কথা বলবেন। আমরা এক সঙ্গে হেসে উঠেছিলাম। গেলেই জাহাঙ্গীর ভাইর কেন্টিনের চা-সিঙ্গারা খাওয়াতেন। কখনো নিজের রুমে ডেকে বসতে দিলে জীবন ধন্য হয়ে যেতে থাকতো। কখনো কোনো বই রিভিউ করার জন্য এগিয়ে দিলে মন আনন্দে ভরে উঠতো। অনেক লেখকের মুখ প্রথম দেখেছিলাম ওখানে বসে। অনেক লেখকের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। তাদের কারো কারো সাথে দীর্ঘ সম্পর্কের সৌভাগ্য হয় এই সূত্রে।

সে সময়ের অল্পবয়সী কেউ কেউ এখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমার। তখন শাহমান মৈশান চিত্র সমালোচনা লিখতেন। তার সাথে আমার ওখানে একাধিকবার দেখা ও কথা বলার সূত্রে সুসম্পর্ক হয়। একদিন মৈশান বললেন, আসলেই রাইসু ভাই একজন দরদী মনের মানুষ। পরবর্তী জীবনে রাইসু ভাইর এই দরদী মনের পরিচয় আমি ব্যক্তিগতভাবে অফুরান পেয়েছি। আরো অনেককে পেতে দেখেছি। অন্যের সমস্যা তিনি নিজের করে দেখেন। না বললেও অনুমান করতে পারেন। যাকে বলে অ্যামপেথিক।

লেখকদের দীর্ঘ তালিকা ছিল একটা, নিয়ম করে লেখার তাগাদা দিতেন। শামসুর রাহমানকে ‘রাহমান ভাই’, সৈয়দ শামসুল হককে ‘হক ভাই’, নির্মলেন্দু গুণকে ‘গুনদা’ বলার মতো বড় কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ফোন আমার নবীন চোখ গোল করে দিত। স্বনামখ্যাত সাজ্জাদ শরিফের রুমের একটা কম্পিউটার ব্যবহার করতেন তিনি। আমি দীর্ঘ সময় কোনার দিকের কোনো চেয়ারে কুজো হয়ে বসে তার কাজ করা দেখতাম। আর রুমে কেউ ঢুকলেই উঠে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিতাম। একদিন রাইসু ভাই সদ্য সালাম দিয়েছি এমন একজনের সামনে বললেন, ঐ মিয়া মাইনষ্যেরে এত সালাম দেন ক্যান আপনি! বলে, যিনি আসলেন তাকে বসতে বলে কথা বলা শুরু করলেন। যেন আমাকে কিছু বলেন নি।

পরিচয়ের কিছু দিন পর থেকে যতটা কাছাকাছি সময়ে গেলে তিনি বিরক্ত হতে পারেন তা চিন্তা করে নিয়মিত যেতাম। বাকি দিনগুলো যে সব কাগজ কন্ট্রিবিউটরদের লেখা ছেপে টাকা দেয় সবগুলোতে ঘুরে ঘুরে অ্যাসাইনমেন্ট নেয়ার চেষ্টা করে কাটাতাম। কোথাও নিজের আইডিয়ায় কোনো ফিচার বা অন্য কিছু লিখে জমা দিয়ে ছাপানোর অনুরোধ করতাম। একদিন বিকেলে গিয়েছি; তিনি বললেন, তাড়া না থাকলে বসেন, বের হবো।

এপ্রিলের দিকে হবে মনে হয় ১৯৯৯ সালের। বৃষ্টি নামছিল। প্রথম আলোর নিচে নেমে সামনের রাস্তার জ্যামে ধীরে চলা শাহবাগগামী বাসে উঠতে ইঙ্গিত করে উঠে পড়লেন। পিছু পিছু আমিও উঠে পড়লাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সেই প্রথম যাই। একজন বয়কে পুরি-চা দিতে বলে তিনি পূর্বপরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডা দিতে শুরু করলেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আসার কথা বিশেষত এই কারণে বললাম, সেই প্রথমবার তার সঙ্গে বাইরে বের হয়েছি। এরপর অনেক লেখকের বাসায় গিয়েছি তার সাথে। আমাকে সাথে নিতেন কখনো কখনো।

৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে স্মৃতিকথা, সঙ্গে তোলা ছবি থাকলে পাঠাতে বলে ফেইস বুকে ঘোষণা দেখে লেখার ইচ্ছে হলো। এর আগে শ্রদ্ধেয় মাহবুব মোর্শেদ ভাই দুই তিন মাস আগে একই বিষয় নিয়ে বই প্রকাশের কথা বলেছিলেন। মাহবুব ভাইর কথায় লেখার কিছুটা মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আন্তরিক টান থাকা সত্ত্বেও লিখতে বসে বুঝলাম, লেখার অনভ্যাস ও লেখকসুলভ দক্ষতার অভাবে স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে তুলে সব কথা বলা আমার দ্বারা সম্ভব না। তাই লেখাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে মনে হচ্ছে। অন্য কোনো অবসরে অসামান্য এই মানুষটির সঙ্গ স্মৃতি বিস্তারিত স্মরণের চেষ্টা করবো অবশ্যই। তাছাড়া, আজ এখন ১৮ তারিখ দুপুর ১ টা ২৮। আর সাড়ে ১০ ঘণ্টা পর জন্মদিন উপলক্ষে সাইটে লেখা প্রকাশ করা হবে। সো, টাইম নাই। এক বাক্যে বললে যদি সব হয়ে যেত, বলতাম, আলহামদুলিল্লাহ, দারুণ কোয়ালিটি টাইম কাটিয়েছি আমরা।

আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের ১৯/২০ বছরের আনন্দ কী কী ঘটনার মধ্যে লুকানো ধরতে পারছি না। তবে রাইসু ভাই সিকদার আমিনুল হকের বাসায় কম্পিউটার ঠিক করে দিতে যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকবার। আর্টিস্ট রনি আহম্মেদের উত্তরার বাসায় নিয়ে গিয়েছেন কয়েকবার। আলতাফ হোসেনের বাসায় একটু ঘুরে যাওয়া এড়াতে রাস্তার পাশ থেকে ওয়াল ডিঙ্গাতাম তার সঙ্গে। এমন দিনগুলো বেশি মিস করি, মেস থেকে বের হয়ে ৮/১০ দিন পর ফিরেছি। রাতে তখনকার পান্থপথ বৌবাজারের পাশের বাসায় অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন অনেকে মিলে। নিয়মিতই কেউ না কেউ রাতে থেকে যেতেন বেশি রাত হয়ে যাওয়ায়। পাঠচক্র হতো মাঝেমধ্যে। টমাস মুর আর নোয়াম চমস্কির নাম ওখানে প্রথম শুনেছিলাম। সকালের নাস্তায় যেদিন প্রথম স্পিরুলিনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন বললেন, “খুব স্টিমুলাস । ক্লান্ত হবেন না কখনো। প্রানোচ্ছল রাখবে।’

রাইসু ভাই যখন জানলেন আমার নিয়মিত কোনো উপার্জন নেই শ্রদ্ধেয় মুজিব মেহদী ভাইর কাছে পাঠালেন। বললেন, “আমি ওনাকে অনুরোধ করেছি, দেখা করেন।” মুজিব ভাইর কাছে গেলে তিনি আমাকে পারবো কি না জিজ্ঞেস করে স্বনামখ্যাত ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর ব্যক্তিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ দেন। তখন উপার্জনহীন কবিদের অবশ্য গন্তব্য ছিলেন মাসুদ খান। একদিন বললেন, টাকা নাই মনে হয়? আমি নাই জানাতে মাসুদ ভাইকে ফোন করে বললেন, আরো একজন সঙ্গতিহীন উঠতি কবিকে পাঠালাম ১ হাজার টাকা দিয়া দেন। তারপর ঠিকানা দিয়ে সন্ধ্যার পর যেতে বললেন।

মাসুদ খান খুব কৌতূহল দেখিয়ে সাধারণ একটা প্রশ্ন করলেন, বললেন, কী রাইসু পাঠাইছে, না? নাম কী আপনের? এরপর স্বাভাবিকভাবে টাকা দিলেন। চা খেতে দিলেন। যেন কত পরিচিত। মাসরুর আরেফিন, শিবব্রত বর্মন, অমি রহমান পিয়াল ভাইর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার জন্য তার টাকা ধার করার করার সূত্রে।

রাইসু ভাই তখন প্রচুর সিনেমা দেখতেন। তার বাসায় প্রথম সিনেমা দেখেছিলাম এয়ার ফোর্স ওয়ান। এরপর আমার কাজ না থাকলে তার বাসায় দিনরাত সিনেমাই দেখতাম কখনো। তিনি সকালে অফিসে চলে যেতেন, আমাকে বলতেন, আপনি গেলে চাবি দরজার উপর রেখে যাইয়েন। ইমরান মাঝি, মাসুদ রানা (বেলায়েত মাসুদ), ও আমি তখন শেওড়াপাড়া থাকি। মাঝি ও মাসুদ কয়েক মাস না থাকায় সমস্যা হলে রাইসু ভাই বললেন, ইস্কাটনে কামু থাকে তার কাছে যান।

আমি রাতে কামরুজ্জামান কামুর বাসা খুঁজে বের করি। তিনি তখনো আসেন নাই। বাসা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পিংকির মা আমাকে বসতে বললেন। কামু ভাই ফিরলে অসামান্য সারল্যের একজন মাটির মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি নরম গলায় টেনে টেনে বললেন, “ও রাইসু পাঠাইছে আপনেরে? থাকবেন? থাকেন।” পশ্চিমের ডাইনের একটা রুমে ফ্লোরে পাতা বিছানা দেখিয়ে বললেন, “ওইটায় আমার সাথে শেয়ার কইরেন।” রাইসু ভাইর সূত্রে পাওয়া কামরুজ্জামান কামুর মমতা এখনো আমার সঙ্গে আছে।

এখানে এর পর কিছুদিনের জন্য ওঠেন মাতিয়ার রাফায়েল ও সাখাওয়াত টিপু। টিপুর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয় আমার। যা এখনো টিকে আছে। রাইসু ভাই বিষয়ে খুব উৎসাহী ছিল তখন টিপু। দিনে অনেকবার বলতো, রাইসু এই বলেছে, রাইসু ওই বলেছে। আর যেন অনেক আনন্দ পেয়েছে এভাবে হাসতো। কামু ভাই, মাতিয়ার, মাসুদ, টিপু ও আমি মিলে একটা যৌথ উপন্যাস লিখেছিলাম অনেক দূর। কামু ভাই তার বিখ্যাত হওয়া অনেকগুলো গান এখানে লিখেছিলেন। লিখে আমাদের শোনাতেন কোন কোনটা।

কয়েক মাস পর রাইসু ভাই বললেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিদিনের ঘটনা প্রকাশিত বইগুলো থেকে কম্পাইল করতে পারবো কিনা? অফিস করা লাগবে না। চার পাঁচ দিনেরটা কম্পাইল হলে একবারে দিয়ে আসলে হবে। বললেন, আপনি পাইবেন ৬ হাজার আর আমি নিমু ১০ হাজার। আমার জন্য এই প্রস্তাব ছিল আকাশের চাঁদ হাতের কাছে চলে আসা। আমি বাংলাবাজার থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রকাশিত সব বই কিনে কাজে লেগে যাই। ৫/৬ মাস পর এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। রাইসু ভাই এক সন্ধ্যায় আজিজ মার্কেটে শ্রদ্ধেয় মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীকে অনুরোধ করলেন আমাকে কাজ দিতে । ফারুকী ভাইও দ্রুত সিদ্ধান্ত দেন, “আগামী ১ তারিখ থেকে যোগ দেন।” ঠিক হয়েছিল আমি কাজ করবো প্রোডাকশন বয় হিসাবে। তবে ১ তারিখের আগে তারও দু মাস আগে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে দেয়া পরীক্ষায় টিকে গেলে জীবনের অন্যতম ভুল সিদ্ধান্তটি নিয়ে ওখানে ২৫শ টাকায় জয়েন করি।

৪ টা ৩ বেজে গেল! একটা লেখার কথা উল্লেখ করে হুট করে শেষ করে দেই।

গত অক্টোবরের ৮ তারিখ দৈনিক প্রথম আলোর স্বপ্ন নিয়ে পাতায় ছাপা হওয়া আর্ন্তজাতিক কফি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান স্টারবাকের চেয়ারম্যান হাওয়ার্ড শালটজের একটি বক্তব্য পড়ে উপলব্ধি করি রাইসু ভাই আমার জীবনে কে। রাইসু ভাইর কথা মনে পড়ে। অভয়ভরা হাসিমুখ চোখে ভেসে ওঠে। আরো মনে পড়ে, সহায়হীন সময়ের শহরে পায়ের নিচে পা পেতে দেয়া অনন্য মানুষ: অনন্ত জাহিদ, হাসান মাহমুদ, ম আলী আকবর হায়দার, নাসির আহমেদ, আসীফ নূর, মুজিব ইরম, সরকার আমিন, আলফ্রেড খোকনের কথা।

এর আগে গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হাওয়ার্ড শালটজের বক্তব্যের শুরুটা ছিল এরকম, “২০১৬ সালে স্টারবাকস কফি প্রথমবারের মতো সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে একটা স্টোর চালু করেছে। এর আগে আমি কখনোই দক্ষিণ আফ্রিকায় যাইনি। তাই তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না। সেখানকার মানুষের দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা দেখার মতো কোনো প্রস্তুতিও আমার ছিল না।

আমরা সেখানে দুটো দোকান চালু করেছি। এর আগে আমি ৫০ জন তরুণের সঙ্গে বসেছিলাম, যারা সবুজ অ্যাপ্রোন পরে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করবে। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আমি এই তরুণদের প্রত্যেকের গল্প শুনেছি।

তারা যখন বলতে শুরু করল, দেখলাম দারিদ্র্য, সংগ্রাম ছাড়াও মানুষগুলোর জীবনে অনেক আনন্দ আছে। এই আনন্দের জন্য তাদের হৃদয় ভরে আছে কৃতজ্ঞতায়। তবে তাদের কাছ থেকে আমি দুটো জিনিস জানলাম। প্রথমত, এই ৫০ তরুণের কেউই আগে কখনো কোনো চাকরি করেনি। প্রথম চাকরিতে ঢুকতে যাচ্ছে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে ভীষণ রোমাঞ্চ কাজ করছে। দ্বিতীয়ত, তাদের কাছে একটা আফ্রিকান শব্দ শিখলাম। এই শব্দটা নেলসন ম্যান্ডেলাও তার বক্তৃতায় বারবার ব্যবহার করেন। শব্দটা হলো, ‘উবুন্টু’। জানতে চাইলাম, এর অর্থ কী ?

উবুন্টু অর্থ হলো, ‘তোমার জন্যই আমি এখানে’।

১৮/১১/২০১৭

Facebook Comments
More from ফয়সল নোই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *