আমার ব্যক্তিগত রাইসুরা

ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার পরিচয় ২০০৪ সালে। সেইটা হাই ফাইভ আমল।

আমি লেইট টিনএইজ আমলের প্রিটেনশাস বিষণ্নতায় হাই-ফাইভের প্রিটেনশাস বিষণ্ন প্রোফাইলে ততোধিক প্রিটেনশাস বিষণ্ন একখান ছবি ঝুলায়ে রাখছি। রাইসু আমার সেই ঠোঁট এবং কপাল পিয়ার্সিং করা এবং মাথায় চে গুয়েভারার সাদা-কালো ফেট্টি লাগানো ছবি দেইখা আমারে জিগাইলেন, আমি ব্যান্ডে গান গাই কিনা।

বাংলাদেশের ব্যান্ড গানে সেই সময় একটা প্রিটেনশাস বিষণ্নতা ঘুর ঘুর করতো, আমার তৎকালীন বয়ফ্রেন্ডও ব্যান্ডে গান গাইতেন, আমি রাইসুর কথায় বিশেষ আহ্লাদিত হইলাম। যদিও আমি গান গাইতাম না।

তো গান গাওয়াগাওয়ির আলাপের এক পর্যায়ে আমরা একদিন দেখা করলাম। রাইসু তখন যায়যায়দিন পত্রিকায় চাকরি করতেন। আমি গেলাম যায়যায়দিনের তেজগাঁওয়ের কাচের অফিসের নিচে উনার সাথে দেখা করতে।

অফিসের নিচে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ায়ে আমি উনার এক কলিগের সাথে কথা কইতেছি, রাইসু অফিস থিকা বাইর হইলেন। উনার গায়ে গরুর মাথার ছবিওয়ালা কমলা রঙের টি-শার্ট, হালকা বাদামি পকেটবহুল থ্রি-কোয়ার্টার ট্রাউজার্স এবং কালো রঙের স্পঞ্জের স্যান্ডেল। সেই স্যান্ডেলের চারদিকে জিসাস ক্রাইস্টের শরীরে লাগানো কাঁটার মত দেড় ইঞ্চি সাইজের বড় বড় প্লাস্টিকের কাঁটা। আমি কাঁটা বাঁচাইয়া সাবধানে রিক্সায় উঠলাম, উনি কইলেন, “এইসব ফালতু লোকদের সাথে মিশেন কেন?”

কলিগ ভদ্রলোকও সেই কথা শুনতে পাইলেন।

সেইটা আমার প্রথম রাইসু-ডোজ। একজন মানুষ যে অবলীলায় অন্য মানুষদের নাকচ কইরা দিতে পারেন এবং এই নাকচ করার প্রক্রিয়া যে বিন্দুমাত্র উনার সামাজিক ভদ্রতাবোধরে আহত করে না, সেইটা দেখা আমি একই সাথে লজ্জিত, কুণ্ঠিত ও ক্ষুব্ধ হইলাম।

নাদিয়া ইসলাম

যদিও পরে টের পাইছিলাম, রাইসুর এই বিশেষ গুণের কারণেই উনারে উনার চাইতে নিম্ন মানের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণিদের সাথে যোগাযোগ রাখার মত এবং ফোনে “ভাই কেমন আছেন” বইলা তিন আলিফ লম্বা আড্ডা দেওয়ার মত আয়ুক্ষয়কারী মধ্যবিত্ত সামাজিক আচরণের ভিতর দিয়া যাইতে হয় না। সেই কারণেই হয়ত আজকেও, এই পঞ্চাশতম জন্মদিনেও উনারে নতুন নতুন প্রেমে পড়া কিশোরী মেয়েদের মত দেখায়।

রাইসুর সৌন্দর্যের পিছে আরেকটা কারণ আছে অবশ্য। রাইসুরে যারা কাছ থিকা ব্যক্তিগতভাবে চিনেন, তারা উনার ‘হাইপোকনড্রিয়াক’ বৈশিষ্ট্যর কথা জানেন। উনি নিজে সারাক্ষণ খাওয়া-দাওয়া নিয়া খুঁত খুঁত করতে থাকেন, অন্যদেরও খাওয়া-দাওয়া নিয়া জ্বালাইয়া মারেন। উনি সিগারেট খান না, গাঞ্জা খান না, ড্রাগ নেন না, পান খান না, সুপারি খান না, ফুচকা বাদে রাস্তার তেলওয়ালা ভাজাভাজি খান না, মদ খাইলেও খান হিসাব কইরা।

আমি উনার বাসায় বেড়াইতে গেছি, উনি আমারে জিগাইলেন, আমি রসুন দিয়া জ্বাল দেওয়া দুধ খাব কিনা। সঙ্গত কারণেই আমার বিকাল সাড়ে চারটায় রসুন দিয়া জ্বাল দেওয়া দুধ খাওয়ার পক্ষে হ্যাঁ কওয়ার কথা না। রাইসু তাও ঝুলাঝুলি করতে থাকলেন। “খাও, খাও, দুধ ভাল জিনিস। রসুন আরো ভাল। প্রতিদিন একটা কইরা রসুন খাইলে…” ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি দুধ খাই নাই, রসুনও না। উনি এবং সাঈদ এবং মোস্তাফিজ ভাই তিনজন বিকাল সাড়ে চারটায় তিনগ্লাস দুধ খাইলেন। সাঈদ এবং মোস্তাফিজ ভাই রাইসুর সাথে খাওয়া নিয়া তর্ক করা ছাইড়া দিছেন। উনারা বুদ্ধিমান মানুষ।

এইখানেই রাইসুর খুঁতখুঁতানি শেষ না। উনার সাথে আমার দেখা করার কথা সন্ধ্যা সাতটায়, আমি পৌনে সাতটায় ফোন দিয়া জিগাইলাম উনি কই।

উনি জানাইলেন উনি এখনও বাসা থিকা বাইর হন নাই। কারণ বাইরে বজ্রপাত হয়।

আমি গ্লোরিয়া জিন্সের কাচের জানলা দিয়া উঁকি দিয়া দেখলাম কাচের বাইরে বৃষ্টি হইতেছে গুঁড়ি গুঁড়ি। রাইসু কইলেন, এই বছর বজ্রপাতে তেত্রিশ জন মানুষ মারা গেছেন। বজ্রপাতরে অবহেলা করার কিছু নাই।

রাইসু উইয়ার্ড। ঊনিশ-বিশ বছর বয়সে আমার এই উইয়ার্ডরে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। উনার লজ্জাহীন আচরণে আমি লজ্জিত হইতাম, ভাবতাম, লোকটা এমন কেন? যেই কাজগুলি করতে বা যেই কথাগুলি বলতে স্বাভাবিক মানুষরা তিনবার বা তেত্রিশবার ভাবেন, সেই কাজগুলি রাইসু অবলীলায় করতেন এবং সেই কথাগুলি অবলীলায় বলতেন।

নাদিয়া ইসলাম, ছবি. ব্রাত্য রাইসু, হেলভেশিয়া, উত্তরা, ২০০৫

উনি এবং উনার এক বন্ধু আরেক বন্ধুর বাসায় (নাম উল্লেখ করলাম না) বেড়াইতে গেছেন, তো সেই হোস্ট বন্ধু উনাদের সামনে বসায়ে রাইখা একলা একলা চা খাইলেন ও ডিনার করলেন, উনাদের সাধলেন না। তো এর পরের বার উনারা সেই হোস্ট বন্ধুর বাসায় যাওয়ার আগে দোকান থিকা কাবাব এবং রুটি কিনা নিয়া গিয়া সেইটা সোফার তলে লুকাইয়া রাখলেন। এরপর সেই হোস্ট বন্ধু যখন সোফায় ঠ্যাঙ্গের উপর ঠ্যাং তুইলা বইসা রাইসুরে “খেয়ে এসেছ না গিয়ে খাবে” ভঙ্গিতে চা সাধলেন, তখন উনারা সোফার তলা থিকা কাবাবের প্যাকেট বাইর কইরা হোস্ট বন্ধুরে রান্নাঘর থিকা একটা প্লেট আনাইতে কইলেন। হোস্ট বন্ধু সোফায় লজ্জিত ভঙ্গিতে বইসা চা খাইলেন, রাইসু এবং প্রথম বন্ধু প্লেটে কাবাব টাবাব রুটি ফুটি সাজাইয়া ডিনার করলেন। হোস্ট বন্ধুরেও খাইতে সাধলেন। স্বাভাবিক কারণেই হোস্ট বন্ধু ভদ্রলোক সেই কাবাব খাইলেন না। খাইতে চাইলেও হয়ত উনার গলা দিয়া কাবাব নামত না।

এই প্রসঙ্গে আরো একটা গল্প মনে পড়লো। এইটা রাইসুর পরিচিত একজন আমারে বলছেন। রাইসু একদিন শাহবাগে ভোরের কাগজের অফিসে বইসা ছবি আঁকতেছেন। এমন সময় সেইখানে হুমায়ুন আজাদ ঢুকলেন। তিনি রাইসুর ছবি আঁকা দেইখা জিগাইলেন, “কী আঁকছো, জুতো?”

রাইসু উত্তর দিলেন, “জ্বি স্যার, ‘জুতো’ আঁকছি, যারা বেশি কথা বলে তাদের মুখে ঢুকিয়ে দেব!”

এই রকম উত্তর যে উনি একলাই দিতেন তা না, উনি আমারে দিয়াও এইসব উত্তর দেওয়াইছেন। আমি প্রথম প্রথম খুব যে স্বেচ্ছায় এইসব কাজে যুক্ত হইতাম, তা না। তবে উনার দেখাদেখি পরবর্তীতে এই ধরনের ‘বেয়াদবি’তে আমি বিশেষ মজা পাওয়া শুরু করছিলাম।

সেইটা ২০০৫ সাল। আমরা শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের নিচে খাড়ায় চা খাইতেছি, কবি শাহরিয়ার মোল্লা একই কথা তিনবার তিনবার তিনবার কইরা “রাইসু আমার লেখাটা পড়ছেন? আমার লেখাটা পড়ছেন রাইসু? রাইসু আমার লেখাটা অমুক পত্রিকায় বের হইছে, পড়ছেন?” বলতেছেন এবং আমি আজিজ মার্কেটের দুর্গন্ধযুক্ত চিপায় দাঁড়াইয়া আকাশ বাতাস প্রকৃতি দেখতেছি, এমন সময় একজন লম্বামত বিশিষ্ট লেখক ভদ্রলোক আইসা আমাদের সাথে বিভিন্ন খাজুইড়া আলাপ জুইড়া দিলেন। আমি এবং রাইসু উনার চাইতে লম্বায় খাটো। আমি চা খাইতে খাইতে উনার মাথার দিকে উর্ধ্বপান বিরস দৃষ্টিপাত করতে করতে আজিজ মার্কেটের দুর্গন্ধযুক্ত চিপায় দাঁড়াইয়া যেইসব আকাশ বাতাস প্রকৃতি দেখা যায় আর কি, ঐসব দেখতে লাগলাম। প্রায় পাঁচ সাত মিনিট একপাক্ষিক কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমার তরফে কোনো প্রকার উত্তর না পাইয়া বিশিষ্ট লেখক ভদ্রলোক গলায় কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়া জিগাইলেন, আমার কথা বলা নিষেধ নাকি। আমি উপর নিচ মাথা নাড়াইলাম। কিছু বললাম না।

বিশিষ্ট লেখক ভদ্রলোক এইবার বেশ অবাক হইয়া আমারে জিগাইলেন, “কে নিষেধ করছে?”

আমি ডান হাতের এক নাম্বার আঙুল মানে তর্জনি দিয়া রাইসুর পেটের দিকে ইঙ্গিত করলাম। পেটের দিকে ইঙ্গিতের কারণ আমার হাত আমার নিজের পেট বরাবরই ছিল। বিশিষ্ট লেখক ভদ্রলোকের জন্য হাত নাড়াচাড়া করার মত শ্রমসাধ্য কাজ করার বিশেষ ইচ্ছা আমার ছিল না।

বিশিষ্ট লেখক ভদ্রলোক কী করবেন বুঝতে না পাইরা একবার আমার মুখের দিকে, একবার রাইসুর মুখের দিকে তাকাইয়া ‘এতবড় আস্পর্ধা! আমি রম্ভার স্বামী, আমাকে তোরা জানিস নে?’ স্টাইলে মুখে কিছু একটা বির বির করতে করতে ঐখান থিকা দ্রুতবেগে বাইর হইয়া গেলেন। ভাগ্যিস ২০০৫ সাল সত্যযুগে পড়ে নাই। পড়লে আমাদের আজিজ মার্কেটের দুর্গন্ধযুক্ত চিপায় খাড়াইয়াই শিক-কাবাবের মত ভষ্ম হইয়া যাওয়ার কথা।

এইরকম আরো প্রচুর ঘটনা আছে। সেইটা আমাদের প্রেমের হাই-টাইম। আমরা প্রতিদিন শাহবাগ আজিজ মার্কেটে যাই, আঁলিয়াস ফঁস্যেতে যাই, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাই, দৃকে যাই, বেঙ্গলে যাই এবং সবাইরে উলটাপালটা কথা বইলা ‘কিছু হয় নাই’ এমন ভঙ্গিতে হাত পা নাচাইতে নাচাইতে দুইলা দুইলা বাইর হইয়া আসি।

উলটাপালটা কথা রাইসুই বেশি বলেন, আমি উনার পাশে সাহাবির মত সোজা সোজা খাড়াইয়া থাইকা তাতে নিরব সম্মতি দেই। এবং এরপর বাড়ি আইসা ফোনে আমি আজকে কী কী ভুল করছি এবং কী কী করলে আরো ভালো বেয়াদবি হইত এই নিয়া গবেষণা করি। তো সেইদিন আমরা রাইসুর এক বান্ধবী এবং উনার স্বামীর বাড়িতে বেড়াইতে গেছিলাম। উনাদের কাছে ফেলিনির ‘স্যাটারিকন’ ফিল্মটার ভাল প্রিন্ট আছে, আমরা মদ খাইতে খাইতে সেই ফিল্ম দেখলাম।

উনাদের বাড়িতে যাওয়ার পর জানা গেলো ভদ্রমহিলা এবং উনার স্বামী আমার ছোটখালার বুয়েটের ক্লাসমেইট। তো সেই সূত্রে উনারা আমারে ‘তুমি’ বইলা সম্বোধন করছেন (যদিও উনারা রাইসুরে আপনি বইলা ডাকেন)। আমি তাতে আপত্তি করি নাই। আমার খালার বন্ধুরা আমারে ‘তুমি’ বইলা ডাকতেই পারেন। আর ‘তুই তুমি আপনি’ ইত্যাদির রাজনীতি নিয়া আমি তখনো মাথা ঘামাই না। ‘কে কারে কী বইলা ডাকল’ এইসব আমার কাছে তখন ইম্পর্ট্যান্ট না।

রাত্রে বাড়ি ফিরার পরে রাইসু আমারে ফোন দিয়া কইলেন, এই যে উনার বান্ধবী আমারে ‘তুমি’ বইলা ডাকছেন, এইটা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ হইছে। এইটা নিয়া উনারে ‘টাইট’ দিতে হবে। আমি রাইসুরে কইলাম, এই কাজ আমার দ্বারা সম্ভব না। এরপর রাইসু আমারে আরো ঘণ্টাখানেক ধইরা নসিহত করলেন।

আমি রাইসুর সম্মান-অসম্মান বিষয়ক যুক্তিতে তখন মোটেই কনভিন্স হই নাই। কিন্তু আলাপ থামানোর জন্য আমি উনার এবং আমার খালার বান্ধবীরে একটা মেইল করলাম। লিখলাম, “আপনি এখন থিকা আমারে ‘আপনি’ বইলা ডাকবেন। না ডাকলে আমিও তোমারে ‘তুমি’ বলব।”

মেইল পাওয়ার পরে রাইসুর এবং খালার বান্ধবী আমারে ব্লক কইরা দিলেন।

রাইসুর এই নসিহত করার খবরদারী একপাক্ষিক ছিল না। আমি নিজে রাইসুর উপর একই প্রকার খবরদারী করতাম এবং কেউই অন্যপক্ষের যুক্তি বা প্রজ্ঞারে পাত্তা দিতাম না। আজকে থিকা তের বছর আগে আমি অত্যন্ত বদরাগি একজন শিশুশ্রেণির অযৌক্তিক ঘাড়-ত্যাড়া মানুষ ছিলাম। এখনও যে খুব বেশি উন্নত হইছি, তা অবশ্য না!

একবার রাইসু আসছেন আমার বাসায় আমার সাথে দেখা করার জন্য। উনি যখন বাসার গেইটের সামনে আসছেন, সেই সময় আমার পিতৃদেবও বাসায় ঢুকতেছেন। রাইসুরে দেইখা আমার বাপ আমার বেডরুমে ঢুইকা বললেন, একজন লোক আমারে খুঁজতেছেন। সম্ভবতঃ ইন্টারনেট কানেকশান ঠিক করার লোক।

আমি গেইটের বাইরে গিয়া দেখি বাদামি রঙের শর্টস, কোঁচকানো এবং উলটাপালটা বোতাম লাগানো ত্যাড়াব্যাড়া সাদা সুতির শার্ট এবং হলুদ ও বাদামি রঙের ফ্লিপফ্লপ পইরা ঝাঁকড়া চুলওয়ালা দাঁড়িওয়ালা রাইসু চকচকা হাসি হাসি মুখে দাঁড়ায়ে আছেন। আমি তৎক্ষণাৎ মেজাজ খারাপ কইরা উনারে বাসা থিকা বাইর কইরা দেই। যদিও এই জামাকাপড় রাইসু প্রতিদিন পরতেন।

তবে উনারে বাইর কইরা দেওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা পরেই আমার খুব অপরাধবোধ হইল এবং আমি কানতে কানতে উনারে ফোন দিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম উনি আমার ফোন ধরবেন না। শুধু যে ধরবেন না, তা না, উনি জীবনেও আমার সাথে কথা বলবেন না। বললেও এমন অপমানজনক এমন কিছু একটা বলবেন যেইটা শুইনা আমার ইন্দুর মারার বিষ খায়ে কচুগাছের সাথে গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করতে হবে। আমারে আশ্চর্য কইরা দিয়া উনি ফোন ধরলেন। আমার ‘সরি’রেও অ্যাক্সেপ্ট করলেন। এবং আমারে আরো আশ্চর্য কইরা দিয়া উনি আবার উলটা পথে আমার বাসায় আসলেন। আইসা ঝুরঝুরা গরুর মাংস দিয়া ভাতও খাইলেন। ভাত খাওয়ার পরে চাও খাইলেন।

আমার বাসার রান্না মোটামুটি অখাদ্য শ্রেণির। আমার বাপ খুব ভালো রান্না করেন, কিন্তু উনি বেশিরভাগ সময় রান্না করেন না। আমার মায়ের দৈনন্দিন রান্না খুবই অপছন্দের কাজ এবং উনারা দুইজনেই অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন, সুতরাং আমাদের বাসায় রান্নার লোকজন যা রান্না করেন, তা হয় ইদার ঝাল এবং লবণ ছাড়া অথবা অতিরিক্ত ঝাল ও লবণসহ। তাতে আমার মাতৃ ও পিতৃদেবের কোনো সমস্যা হয় না, কারণ উনারা এক কাপ দই বা গোটা সাতেক কাঠবাদাম বা এক প্লেট লবণ ছাড়া সিদ্ধ সবজি বা এক টুকরা মাছ খায়ে রাতের খাবার সাইরা ফেলতে পারেন। সমস্যা হয় যখন রাইসু বাসায় আসেন।

রাইসু এক দিনের পুরানা বাসি খাবার খান না। আমাদের বাসার সব রান্নাই বাসি। উনি আইসা আমার আম্মার সাথে খাবার নিয়া আলাপ শুরু কইরা দেন। বাসায় পরোটা আছে কিনা। পরোটা না থাকলে বানায় দেওয়া যাবে কিনা। গরুর মাংস কবে রান্না হইছে। একই মাংস এর আগে মাইক্রোওয়েভে গরম করা হইছে কিনা। কোন পাত্রে মাংস ফ্রিজে রাখা হইছে। প্লাস্টিকের বাটিতে মাইক্রোওয়েভে গরম করা খাবার যে বিষাক্ত তা কি আমার আম্মা জানেন কিনা। চিজ দিয়া ডিম ভাইজা দেওয়া যাবে কিনা। চিজ কয়দিনের পুরানা। চিজ বেশি পুরানা হইলে তাতে গ্যাসের সমস্যা হয় সেইটা আম্মা জানেন কিনা। বেশি কাঁচামরিচ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভাল কিনা ইত্যাদি।

আম্মা রাইসুর এহেন অত্যাচারে বিরক্ত হইতেন না। আমি পরোটা খাইতে চাইলে “নিজে বানায়ে খাও” বা “রেনুরে বলো বানায়ে দিতে” বলা উনিই আবার হাসি হাসি মুখেই উনারে খাস্তা পরোটা বানাইয়া দিতেন। গ্রেইট করা চিজ এবং দুইটা কাঁচামরিচ এবং একটা কুঁচি কইরা কাটা পেঁয়াজ এবং অল্প লবণ দিয়া ‘স্যালমোনেলা’ মরছে অথচ ডিম এখনো সামান্য কাঁচা আছে এমন স্টাইলে ডিম ভাইজা দিতেন। ফ্রিজ থিকা গরুর মাংস বাইর করতে বইলা সেই মাংস চুলায় ভাজি ভাজি কইরা দিতেন। আম বা আপেল কাইটা দিতেন। ফ্রিজ থিকা পুডিং বা মিষ্টি বাইর কইরা দিতেন। আবার আধা ঘণ্টা পর আইসা জিগাইতেন, উনি কাঁচা আম বা আনারসের ড্রিংক খাবেন কিনা। কাঁচা আম বা আনারসের জুস এবং পাল্প সারা বছরই বরফে স্টোর করা থাকত রাইসুর জন্য। রাইসু আসলে সেই পাল্পের সাথে বিটলবণ, জিরার গুঁড়া, বরফ ইত্যাদি হাবিজাবি মিলাইয়া ড্রিংক বানানো হইত। রাইসু ড্রিংক না খাইলে এরপর নিজেই চা বানায়ে দিতেন।

রাইসুর জন্য চা বানাইতে যাওয়া আরেক যন্ত্রণা। রাইসু পর্বের আগে আমি প্রচুর জ্বাল দেওয়া এবং কনডেন্সড মিল্ক ও প্রচুর চিনিবহুল ঢাকাই চা খাইতাম। উনার চায়ের প্রতি অবসেশান জর্জ অরওয়েলের পিউরিটান ইংলিশ চা-প্রেমের কাছাকাছি ছিল। চায়ের পানিরে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ফুটতে দিতে হবে। কিন্তু সেই পানি যেন কোনোক্রমেই ফুটনাংকের কাছে না পৌঁছায়। এরপর তা কেতলিতে নিয়া তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ (প্রতি কাপের জন্য দেড় চা চামচ) চা পাতা ঢাইলা পাঁচ মিনিট ধইরা ইনফিউজ করতে হবে। এরপর এই বস্তুরে ছাঁইকা কাপে ঢাইলা তাতে ১০:১ রেশিওতে আগে থিকা ফুটাইয়া রাখা ঘরের তাপমাত্রার সাধারণ গরুর দুধ মিশাইতে হবে। কোনো চিনি ফিনি মিশানো চলবে না।

আমি উনার রেসিপি ফলো কইরা কিছুদিন উনার জন্য চা বানাইলাম। উনি আমার প্রতি ভদ্রতায় বা প্রেমে সেই চায়ে এক চুমুক দিয়া পাশে সরায়ে রাইখা অন্য আলাপে ঢুইকা যাইতেন। উনারে চা দিয়া ইম্প্রেস করা যাবে না বুইঝা আমি একসময় চা বানানো ছাইড়া দিলাম। সুতরাং রাইসু বাসায় আসলে আমার মা’ই উনারে চা বানায়ে দিতেন। উনারা রান্নাঘরে চুলার পাশে দাঁড়াইয়া ফুটন্ত পানির কেতলির দিকে প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকতে থাকতে গাহর্স্থ্য আলাপ করতেন। আমি এবং রান্নার কাজ করার রেনু খালা উনাদের দুইজনের দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকাইতাম।

আমি রাইসুর কবিতার প্রেমে পড়ি “আমরা গরিষ্ঠ জনগণ—অনাহারে অর্ধাহারে ভেসে যেতে চাই মেঘ—তোমার মতন” লাইন পইড়া। আমি রাইসুর প্রেমে পড়ি ২০০৫ এর বইমেলায়। অন্যান্য দিনের মতই রাইসু পেংগুইনের মত লাফাইয়া লাফাইয়া হাঁটতেছেন, হাঁটার মাঝখানে পা স্কিপ করার ভঙ্গিতে ছোট্ট কইরা একপাক ঘুরতেছেন, উঁচা গলায় হাত পা নাইড়া টাইনা টাইনা ‘জলে গিয়াছিলাম সই, খালা খাজলের ফাখি দেইখ্যা আইলাম অই’ গাইতেছেন, এমন সময় দেখলাম আমাদের সামনে একটা বইয়ের স্টলের সামনে বিশাল হৈচৈ।

উনার গানের গলা খুব সুন্দর। আমি উনার সাথে পরিচয়ের পরেই ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল শোনা শুরু করছি। এর আগে আমার ‘জনরা’ ছিলো হেভি মেটাল, অল্টার মেটাল, হার্ড রক, পাংক রক, গ্রান্জ এইসব। একদিন উনি আমারে সিয়ারাম তিওয়ারির প্রায় আটান্ন মিনিটের একটা পিস পাঠাইলেন। আমি সেই ‘ধ্রুপদ’ শুইনা প্রায় এক সপ্তাহ মাতালের মত ঘুরলাম। গান যে এত সুন্দর হয়, গান যে এত অদ্ভুত হয়, গান যে মানুষরে এইভাবে এইভাবে কোনো কারণ ছাড়া বিষণ্ন বা কোনো কারণ ছাড়া উৎফুল্ল বানাইতে পারে, সেইটা আমি তখন জানতাম না।

উনি নিজেও সারাক্ষণ আধাখ্যাঁচড়া গান গাইতেন। মল্লিকার্জুন মনসুরের থিকা এক লাইন। কেসার বাঈ কেরকার থিকা দুই লাইন। গিরিজা দেবী থিকা এক প্যারা। এখনও গান। গত সপ্তাহে (নভেম্বর ২০১৭) আমি আর উনি লিট ফেস্ট থিকা হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে বাইর হইতেছি, উনি উনার স্বভাবমত নিজের মনে কী এক গান গায়ে যাইতেছেন, আমি নিশ্চিত এই গান আমি জীবনে কোনোদিন শুনি নাই, হঠাৎ আমার একটা ‘ডেজা-ভ্যু’ হইল। কোনো কারণ ছাড়াই আমার চোখে হু হু কইরা পানি চইলা আসল। মনে হইল, এই ঘটনা এর আগেও ঘটছে। একই গান আমি আগেও শুনছি। একই গানে একই সুরে একই গলার স্বরে আমি এর আগেও একবার হু হু কইরা কানছি।

রাইসু আমারে কইলেন, “মানুষের ব্রেইনের পিছনেও নিশ্চই আরো একটা মানুষ আছে। সেই সব মানুষরা নিশ্চই একজনের সাথে আরেকজন কানেক্টেড।”

আমি কইলাম, “সবগুলি ব্রেইনের পিছনের সবগুলি মানুষ না হইয়া একটা মানুষও হইতে পারে রাইসু! আমরা সবাই আসলে একটাই মানুষ বা একটাই এনটিটি!”

রাইসু হৈচৈর উল্টাদিকের লোক। উনার উচ্চশব্দ পছন্দ না, মানুষের ভিড় পছন্দ না। ২০০৫ এর বইমেলার কথা বলতেছিলাম। তো আমরা আগায়ে গেলাম। দেখলাম ছোট একটা বাচ্চা ছেলেরে অনেকগুলা বড় মানুষ মিলা পিটাইতেছেন।

বাচ্চা ছেলেটা বই চোর। লুঙ্গির ভিতর বই ঢুকাইতে গিয়া তিনি ধরা পড়ছেন। রাইসু আগাইয়া গেলেন এবং একলাই ‘আজকেই তোরে পিটাইয়া মাইরা ফেলব’ মবের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া ছেলেটারে আড়াল করলেন। উত্তেজিত মব তখন রাইসুরেও বই-চোরের সাগরেদ হিসাবে মাইরা ফেলতে ধরছেন, উনি হাত উঁচা কইরা ‘বই চুরি কেন ভাল’ বিষয়ে উনার স্বভাববিরুদ্ধ একটা ভাষণ দিয়া ফেললেন। মারামারি থামল। আমি গিয়া বাচ্চা ছেলেটার হাত ধরলাম। ঐ ছেলে খুবই স্বাভাবিক আছেন, উনি নিয়মিত চুরি করেন এবং নিয়মিত মাইর খান নিশ্চয়ই।

আমি অবশ্য রাইসুর হিরোইজম দেইখা উনার প্রেমে পড়ি নাই; সব স্বাভাবিক হইলে ঐ চোর পোলা যখন আইসা রাইসুর কাছে অর্থ সাহায্য চাইলেন এবং অন্য সব রেসকিউয়ারের মতই এনজিও স্টাইলে রাইসু উনারে সাহায্য করবেন এমন প্রত্যাশা করলেন, তখন রাইসু খুবই ননশ্যাল্যন্ট ভঙ্গিতে ‘আমি চোরদের ভিক্ষা দেই না’ স্টাইলে উনারে সরায়ে দিলেন। বই চোর পোলা রাইসুর এহেন বিমাতাসুলভ আচরণে ব্যথিত হইলেন, আমি রাইসুর প্রেমে পড়লাম।

আমি প্রেমে পড়লাম উনার কন্ট্রাডিকশানের কারণে। উনার স্ট্যান্ডহীনতাই উনার পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড, এই কারণেই উনারে ছকে ফেলানো যায় না।

একই ঘটনারে বাইনারি ভাইবা দেইখা যে কোনো এক পক্ষে দাঁড়ানোর বাইরেও যে আরো বিভিন্ন পার্সপেক্টিভ থিকা দেখা সম্ভব, এবং একই সাথে সবগুলি পার্সপেক্টিভরে আমলে আনা বা একই সাথে তাদের নাকচ করা সম্ভব, সেইটা আমি রাইসুরে দেইখা শিখছি।

এই জিনিস আমার অ্যাক্সেপ্ট করতে সময় লাগছে, আমি প্লেটো বা নিৎস বা হেগেল পড়া লোক, আমি যুক্তিবাদরে খুব বাইনারি ভাবে দেখতে শিখছি। রাইসু আইসা আমার চিন্তার জগতরে পুরা উল্টায়ে পাল্টায়ে ছ্যাড়াব্যাড়া কইরা দিলেন। আমি হয়ত কোনো একটা বিশেষ ঘটনায় সকাল দশটায় রাইসুর একটা স্ট্যাটাস দেইখা এবং তার সাথে নিজের মতের মিল পাইয়া তাতে ‘লাইক’ দিয়া গেলাম, ঘণ্টা দুই পরে ফেইসবুকে ঢুইকা ঐ একই ঘটনার উল্টাপাশের বক্তব্যরে সমর্থন কইরা রাইসুর আরেক স্ট্যাটাস দেইখা আমার মেজাজ বিগড়ায়ে গেল। কিন্তু আমি জানি এইটাই রাইসু।

এসেমেট্রি যেমন সেমেট্রিরে ডিফাইন করে, কেওস যেমন সবচাইতে সুন্দর সেমেট্রি, তেমনি, ছকহীনতাই রাইসুর ছক। তারে জামাতি বা নারীবাদবিরোধী বা অ্যাটেনশান সিকার বইলা গালি দেওয়া এই কারণেই সহজ, কারণ উনি এমনকি জামাতের পক্ষে কথা বলছেন। একই সাথে উনি আওয়ামী লীগের পক্ষে, বিএনপির পক্ষেও কথা বলছেন। উনাদের বিপক্ষেও কথা বলছেন। নার্সিসিজমের পক্ষে কথা বলছেন, বিপক্ষেও কথা বলছেন। নারীবাদের পক্ষে কথা বলছেন, নারীবাদের বিপক্ষেও কথা বলছেন। বেশিরভাগ মানুষের তাই উনারে হজম করা সম্ভব হয় না।

আমার মতই বেশিরভাগ মানুষ নিজেরে ‘নারীবাদী’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক’ বা ‘রবীন্দ্রপ্রেমী’ বা ‘দেশপ্রেমিক’ বা ‘জাতীয়তাবাদী’ ইত্যাদি ট্যাগলাইনের নিচে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজের ট্যাগলাইনের বাইরের অন্য মানুষরে বা একই সাথে কনট্রাডিকটারি ট্যাগলাইনে অবস্থান করা মানুষরে নেওয়া আমাদের পক্ষে সহজ না। কিন্তু রাইসু এমন একজন মানুষ, যিনি আপনারে আপনার অক্ষমতার সামনে অস্বচ্ছন্দ্য কইরা, ন্যাংটা কইরা নিজের চিন্তার দুর্বলতা দেখতে বাধ্য কইরা আপনারে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে আক্রান্ত কইরা দিতে সিদ্ধ এবং ভাজি-ভাজি হস্ত।

হুমায়ূন আহমেদ নাকি হিমু লিখছিলেন রাইসুরে দেইখা। আমি জানি না ঘটনা সত্য কিনা। তবে হিমু লেখার অনেক আগেই হুমায়ূনের সঙ্গে রাইসুর পরিচয় ছিল। ক্লাস এইটে থাকার সময়ে হুমায়ূনের ছোটভাই কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে হুমায়ূনের বাসায় যাওয়া হইত উনার।

হিমু লেখার অনেক আগেই রাইসু হিমুর মতই খালি পায়ে হাঁটতেন, উদ্দেশ্যহীনভাবে, লিটারেলি—মাইলের পর মাইল।

এবং এই হাঁটার শুরু উনার তের বা চৌদ্দ বছর বয়স থিকা। স্কুল থিকা বাসায় ফিরা উনি প্রতিদিন একলা একলা হাঁটতে বাইর হইতেন। এবং পানির পাশে গিয়া চুপচাপ বইসা থাকতেন। কিছুদিন আগে আমি রাইসুর ছোটবেলার এক বন্ধুর ইন্টরভিউ নিতে গেছিলাম। প্রশ্ন শুরু করার পরে দেখি ভদ্রলোকের গল্পের বিষয়বস্তু শুধুই হাঁটাহাঁটিতে সীমাবদ্ধ।

আমরা যখন প্রেম করা শুরু করি, আমারে দিয়াও রাইসু ধানমণ্ডি টু উত্তরা আবার উত্তরা টু ধানমণ্ডি হাঁটাইছেন। আমি যে খুব শখে হাঁটতাম তা না, আমি হাঁটতাম রাইসুর প্রেমে। উনি জোর করতেন না, একমাত্র খাওয়া দাওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে জোর করাকরি উনার মধ্যে নাই, কিন্তু উনি হিপনোটিস্টদের মত প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। উনি যে কোনো মানুষরে খুব সহজেই কনভিন্স এবং কনফিউজ কইরা ফেলতে পারতেন। এখনো পারেন। মেয়েরা খুব সহজেই এই কারণে উনার প্রেমে পইড়া যান বইলা আমার ধারণা।

উনার বান্ধবীরা কোনোদিন আমার জন্য সমস্যা বা জেলাসি তৈরি করেন নাই। উনার মধ্যে প্রতারণা বা ছল আচরণ নাই। তখন সোমা আপা উনার বর্তমান স্ত্রী। একবার বইমেলায় আমরা হাঁটতেছি, রাইসুর একপাশে সোমা আপা, অন্য পাশে আমি। যারা সোমা আপারে চিনেন রাইসুর তৎকালীন স্ত্রী হিসাবে, যারা আমারে চিনেন রাইসুর তৎকালীন প্রেমিকা হিসাবে, উনারা সবাই আমাদের তিনজনরে একসাথে দেইখা কমপ্লিট বোকচোদ টাইপ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেলেন।

তখন আমার নিজের তৎকালীন বয়ফ্রেন্ডের সাথেও আমার ব্রেকাপ হইয়া গেছে। যখন থিকা আমার রাইসুর সাথে পরিচয়, সেই সময় থিকাই উনি আমারে রাইসু কত খারাপ এবং বাজারে উনার নামে কত নোংরা গল্প চাউর আছে এই মর্মে সাবধান করছিলেন। এরপর কোনো একপ্রকারে আমার অ্যাকাউন্ট হ্যাক কইরা আমার আর রাইসুর চ্যাটালাপ সংগ্রহ করছিলেন। আমি এবং রাইসু তখন ফিল্ম, টিভি সিরিয়াল, সাহিত্য ফাহিত্য আর কোন আর্টিস্ট কত খারাপ আঁকেন বা কোন কবি কত বাজে কবিতা লিখেন এই নিয়াই শুধু আলাপ করতাম।

রাইসু সেই সময় ‘এন-সি-আই-এস’ বা ‘টোয়েন্টিফোর’ বা ‘প্রিজন ব্রেক’ মার্কা প্রচুর আমেরিকান টিভি সিরিয়াল দেখতেন এবং এইসব টিভি সিরিয়াল কীভাবে আর্টহাউজ ফিল্মের প্রিটেনশাস ‘সুগারকোটেড’ আর্টের জগৎ থিকা আমাদের বাইর কইরা নিয়া আসতেছে, এই নিয়া পজেটিভভাবে উত্তেজিত থাকতেন। আমি তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘আর্ট অ্যাপ্রেসিয়েশান’ কোর্স করতেছি, রাইসুর কথাবার্তা আমার মোটেও ভাল লাগত না। আমি সেই সময় ফেলিনি, কুরোসাওয়া, কুবরিক ইনাদের পাশাপাশি ডিজনির ফিল্মের খুব ভক্ত। আমার খুব প্রিয় একটা ডিজনি ফিল্ম ছিল ‘পোক্কাহন্‌টাস’।

পোক্কাহন্‌টাস একজন নেটিভ আমেরিকান আদিবাসী মেয়ে। ১৬০৭ সালে লন্ডন থিকা ভার্জিনিয়া কোম্পানির ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের নিয়া পানিপথে যাত্রা শুরু হইলে মাঝরাস্তায় ঝড়ে পইড়া জাহাজসহ ক্যাপ্টেন জন স্মিথ আইসা হাজির হন পোক্কাহন্‌টাসদের দ্বীপে। সেইখানে আইসাই উনারা সোনার সন্ধানে চারদিকে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি এবং থাকার জন্য ঘরবাড়ি বানানো শুরু করেন। স্বভাবতই এই নিয়া ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের সাথে পোক্কাহন্‌টাসের গোত্র পোঔওয়াতানের ঝামেলা শুরু হয়। কিন্তু এইদিকে পোক্কাহন্‌টাস প্রেমে পড়েন ইংরেজ জন স্মিথের। স্বভাবতই এই প্রেম উনার গোত্রের কারোরই মাইনা নেওয়ার কথা না। কেউ মাইনা নেনও না। এরমধ্যেই ইংরেজরা পোক্কাহন্‌টাসের হবু বর, আরেক গোত্রের গোত্রপ্রধানের ছেলে কোকুয়ামরে গুলি কইরা মাইরা ফেলেন এবং সেই সূত্রে আদিবাসী ভার্সাস সেটেলারদের যুদ্ধ শুরু হয়। জন স্মিথ ধরা পড়েন। যেইদিন সকালে জন স্মিথরে এক্সেকিউট করা হবে, সেইদিন সকালে পোক্কাহন্‌টাস গিয়া স্মিথের গায়ের উপর শুইয়া পইড়া বলেন, স্মিথরে খুন করা হইলে উনারেও খুন করতে হবে, খুনের বদলে খুন এইসব কিছুর সমাধান দিতে পারে না—ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

জন স্মিথ বাঁইচা যান।

যুদ্ধ থামে। ইংরেজদের বলা হয় দ্বীপ ছাইড়া চইলা যাইতে। কিন্তু ইংরেজ গভর্নর র‍্যাটক্লিফ এই সন্ধি মাইনা নেন না। তিনি পোক্কাহন্‌টাসের গোত্রপ্রধান বাপের উদ্দেশ্যে গুলি চালান। গুলি গিয়া লাগে জন স্মিথের গায়ে।

ফিল্মের শেষে দেখা যায়, লন্ডনে নিয়া প্রপার শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে গভর্নর র‍্যাটক্লিফরে বাইন্ধা টাইন্ধা জাহাজে উঠানো হইতেছে। এবং আহত জন স্মিথও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডন ফেরত যাইতেছেন। উনি পোক্কাহন্‌টাসরে উনার সাথে লন্ডন আসতে বলেন, কিন্তু পোক্কাহন্‌টাস জানান, উনি উনার গোত্ররে রাইখা অন্য কোথাও যাবেন না। কারণ উনি এইখানে বিলং করেন এবং উনি এইখানেই স্মিথের ‘ফেরত আসার’ অপেক্ষায় থাকবেন, ইত্যাদি।

ফিল্ম শেষ।

তো আমি রাইসুরে সেই ফিল্ম দেখতে বললাম। উনি দেখলেন। এরপর আমারে বললেন, এই যে আদিবাসী পোক্কাহন্‌টাস শুধুমাত্র সাদা চামড়া ইংরেজ একজনের সাথে প্রেমের কারণে তার স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন, দ্বিতীয় পর্বে উনারে দলবল সহ ফেরত আসার সুযোগ কইরা দিলেন, এই নিয়া আমি কী ভাবি?

আমি সত্যি সত্যি কী ভাবি সেইটা আমি আর রাইসুরে সেই চ্যাটালাপে বলি নাই। আমার খুব প্রিয় একটা ফিল্মরে আমার চোখের সামনে ন্যাংটা কইরা দেওয়ার কারণে সত্যি সত্যি আমি সেইদিন উনারে মনে মনে খুন করতে চাইছিলাম। পরে ভাবছিলাম, এই ফিল্ম আমি নিজে বহুবার দেখার পরেও কেন এই প্রসঙ্গ আমার মাথায় আসে নাই? শুধুমাত্র রাইসুই কেন এইসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রাজনৈতিক বিষয় খেয়াল করেন যেইটা বেশিরভাগ সময়েই আমাদের চোখ এড়াইয়া যায়?

তো যাই হোক, আমরা প্রচুর চ্যাট করতাম—যেইটা নিয়া আমার তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড খুব উৎকণ্ঠায় ছিলেন। কিন্তু সেই চ্যাটালাপে উনারে সন্তুষ্ট করতে পারবে এমন প্রেমরস, কামরস বা মেয়ে পটানো টাইপ কিছু ছিল না। তারপরেও উনি সেইসব চ্যাটালাপ দিয়া ফাইলের পর ফাইল ভর্তি করায়ে রাখছিলেন। হলুদ সবুজ এবং গোলাপি রঙের হাইলাইটার দিয়া আমাদের কথাবার্তা দাগায়েও রাখতেন।

নাদিয়া ইসলাম, ছবি. ব্রাত্য রাইসু, ম্যাংগো, ধানমণ্ডি, ২০০৬

এর কিছুদিন পরেই আমি আমার তৎকালীন বয়ফ্রেন্ডের হ্যাকিং-এর গল্প এবং উপরোল্লিখিত ফাইল আবিষ্কার করি এবং সেই মর্মে উনার সাথে ব্রেকাপ করি। রাইসু সেই গল্প শুইনা আমারে এবং আমারে বয়ফ্রেন্ডরে ডাকায় নিয়া আসলেন এবং নানি-দাদি স্টাইলে মাথা-টাথা হাতায়ে আমাদের সম্পর্ক ঠিক কইরা দিতে চাইলেন। আমার এবং তৎকালীন বয়ফ্রেন্ডের সম্পর্ক ঠিক হইল না, তবে তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড ও রাইসুর খুব ভাল বন্ধুত্ব হইয়া গেল।

তো এরপর যখন আমি রাইসুর সাথে প্রেম করা শুরু করি, তখন আমার প্রাক্তন ও বর্তমান বয়ফ্রেন্ড দুইজনরে দুইপাশে নিয়া আমরা চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া শুরু করলাম। উনাদের দুইজনের একজনও সিগারেট খান না, উনারা স্বাস্থ্যসচেতন, তাই আমি একলা একলা দূরে দাঁড়াইয়া চায়ের কাপ হাতে নিয়া সিগারেটের ধোঁওয়া ছাড়ি, আর উনারা দুইজন চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চিতে বইসা সমাজ সংস্কৃতি নিয়া হা হা হি হি করেন। চায়ের দোকানের দোকানদার দাদন মামা এবং আমার বন্ধুরা (যারা আমাদের তিনজনরেই চিনেন এবং আমাদের সম্পর্ক সম্পর্কে জানেন) আমাদের দিকে ‘সমাজ উচ্ছন্নে যাচ্ছে’ এমনভাবে বিষদৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকেন।

আমার সেই বিষদৃষ্টি দেখতে ভাল লাগা শুরু হয়।

একদিন আমি আর রাইসু গেছি সাংবাদিক সাহিত্যিক ফয়েজ আহমদের বাসায় উনার ইন্টারভিউ নিতে। ইন্টারভিউ বেসিক্যালি নিতেন রাইসু। আমি বইসা বইসা দেখতাম উনারা কী করেন। মাঝেমধ্যে টুকটাক দু’একটা প্রশ্ন করতাম। তবে আমার আশ্চর্য লাগত যখন দেখলাম আমার ফালতু প্রশ্নগুলিরেও উনি অন্যান্য ইন্টারভিউয়ারের মত ‘ট্র্যাশ কোয়েশ্চেন’ হিসাবে ফালায়ে দিতেছেন না। এইটাই উনার ইন্টারভিউ নেওয়ার স্টাইল ছিল। বাকি সবাই যখন শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাইখা ‘আজাইড়া’ আলাপ ফালায়ে লেখা এডিট করতেন এবং নিজে যে ইন্টারভিউয়ার হিসাবে একজন মহাজ্ঞানী প্রশ্নবিদ বিদ্যাসাগর এই মর্মে প্রমাণিত হইয়া লেখারে সুন্দর, স্মার্ট, পরিশীলিত ও সেক্সি বানানোর ধান্ধা করতেন, তখন রাইসু প্রচলিত এই সৌন্দর্যের ধারণারে ‘কাঁচকলা খাও’ বইলা ইন্টারভিউরে তার অরিজিনাল ফর্মেই রাইখা দিতেন। ইন্টারভিউ যে আসলে গতিশীল একটা ‘প্রফেশনাল’ দ্বিপাক্ষিক আলাপ এবং কোনোভাবেই পরীক্ষার সেট করা প্রশ্নপত্র বা চায়ের দোকানের ‘আমি কত জানি রে’ মার্কা আড্ডা না, সেইটা আমি রাইসুর সাথে লেখক রশীদ করীম বা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বা কবি আবুল হোসেন সহ আরো অনেকের ইন্টারভিউ নিতে গিয়া শিখছিলাম। সেই সব ইন্টারভিউর বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত কোথাও ছাপা হয় নাই। মূলতঃ রাইসুর অলসতা জনিত দীর্ঘসূত্রিতার কারণে।

হাইপোকনড্রিয়াক এবং মাইলের পর মাইল হাঁটা একজন মানুষ কীভাবে অলস হইতে পারেন, রাইসু সেই গবেষণার একটা উৎকৃষ্ট উপাত্ত হইতে পারেন নিঃসন্দেহে। উনি নিজের অলসতার গল্প লুকাইয়া রাখেন নিজের কমপ্লেক্স চিন্তার আড়ালে। উনার নিজের লিখা এবং ফালায়ে রাখা অপ্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তখনই তিরিশের উপরে। আমি ২০০৫ সালে সেই সমস্ত বইয়ের একটা তালিকা করছিলাম আমার বাটারকাপের স্টিকার লাগানো ডায়েরির পিছনের পাতায়। কথা ছিল এর পরের বছর থিকাই একটা একটা কইরা উনি বই বাইর করবেন। তো ২০১৬ তে দেশে আইসা আমি উনারে জিগাইলাম, “রাইসু, বই কই?”

উনি কাঁধ ঝাঁকাইয়া আমারে কইলেন, সব তো রেডি। আমি আজকে বললে কালকে উনি প্রেসে যাবেন। আমি কইলাম, “ওকে, গুড, দেখি তোমার পাণ্ডুলিপি!”

উনি কইলেন, পাণ্ডুলিপি তো প্রিন্ট করা হয় নাই। কারণ উনি কবিতার বইয়ের আগে ইন্টারভিউয়ের বইগুলি বাইর করতে চান। তো সেই ইন্টারভিউ আছে ক্যাসেটে। সেই ক্যাসেট থিকা ঐগুলি ট্রান্সক্রাইব করতে হবে।

আমি কইলাম, “তো, করো ট্রান্সক্রাইব! সাঈদ সাহেব তো বাসায় বইসা ফেইসবুকিং করতেছেন। উনারে দেও ট্রান্সক্রাইব করতে!”

রাইসু কইলেন, “ক্যাসেট চালানোর টেপ রেকর্ডার নাই তো!”

তো এর পরের দিন টেপ রেকর্ডার কিনতে সাঈদ বা কামরুল সাহেবকে পাঠানো হইল। যেইটা কিনা নিয়া আসা হইল সেইটা উনার পছন্দ হইল না। তার পরের দিন উনি নিজে গেলেন টেপ রেকর্ডার কিনতে, গুলিস্তান।

খাওয়া দাওয়ার মত গ্যাজেট নিয়াও উনার খুঁতখুঁতানি আছে। বাংলাদেশে সম্ভবতঃ রাইসুই একমাত্র ব্যাচেলর যার বাসায় কমপ্লেক্স ফ্রুট জুসার থিকা শুরু কইরা দরকারি অদরকারি সব রকমের গ্যাজেট এবং সফটওয়্যার আছে। আমি তখন লন্ডন। উনি আমারে ফোন দিয়া কইলেন, “শোনো তুমি তো ফেইসবুকে অনেক সময় নষ্ট করতেছো। একটা সফটওয়্যার আছে (এই মুহূর্তে নাম মনে নাই)—যেইটা তোমারে টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে শিখাবে। সফটওয়্যারটা কীভাবে কাজ করে শুনো। এইটা তোমার হোমপেইজে থাকবে। এবং তোমারে তিন ধরনের টমেটো দিবে।”

—কী দিবে?

—টমেটো। সালাদে খায় যে, ঐ সবজি! তো প্রথম টমেটো তোমারে দেওয়া হবে এক ঘণ্টার জন্য। এই এক ঘণ্টা তুমি ফেইসবুকিং করবা। এরপর সে তোমার ফেইসবুক বন্ধ কইরা দিবে। এরপরের টমেটো দিবে পয়তাল্লিশ মিনিটের জন্য। এইরকম তিনটা টমেটো পাবা তুমি। লাস্টেরটা পাবা পনেরো মিনিটের জন্য। সেইটা তোমার ঐদিনের জন্য লাস্ট ফেইসবুক ইউজ।

আমি ফোনের এইপাশে মেজাজ ঠাণ্ডা কইরা শান্ত গলায় কইলাম, “রাইসু শোনো, আমার টমেটো ফমেটো লাগবে না। আমার ফেইসবুক বন্ধ করতে ইচ্ছা করলে আমি নোটিফিকেশান অফ কইরা লগ-আউট করলেই হয়। এইসব আজাইড়া জিনিস তোমার মত মানুষদের জন্য আবিষ্কার হইছে।”

উনি কইলেন, “টমেটো অবশ্য সবজি হিসাবে ভাল না। টমেটোতে প্রচুর লবণ। লবণ কিডনির জন্য খারাপ।”

তো যাই হোক, টেপ রেকর্ডার কিনার পরের দিন আমি উনার বাসায় গেলাম—“ট্রান্সক্রাইব শুরু করছো?”

রাইসু সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। আমি তাকাইয়া দেখলাম, ক্যাসেটদের সব মাটিতে আচার এবং লেপ কম্বল শুকাইতে দেওয়া স্টাইলে রৌদ্রে দেওয়া হইছে।

রাইসু লাজুক হাইসা কইলেন, “বয়সের কারণে সব ড্যাম্প হইয়া গেছে। তবে অসুবিধা নাই। আমি ঠিক করছি, কবিতার বইগুলিই আগে বাইর করব। তবে তার আগে আরো কয়েকটা কবিতা লিখা নেই। ঠিক আছে না?”

আমি আর কথা বাড়াইলাম না। কথা বাড়াইলে ইন্টারভিউয়ের আগে কবিতা কেন জরুরি এবং যেই কবিতা আগে লেখা হইছে সেইগুলির চাইতে নতুন কবিতা কেন জরুরি সেই বিষয়ে আমারে পঞ্চাশ মিনিটের সাইকোসোশ্যাল অ্যানালিসিস মার্কা লেকচার শুনতে হবে। সেই লেকচার আমি ২০০৫ সাল থিকা শুইনা আসতেছি।

তো যা বলতেছিলাম। আমরা গেছি ফয়েজ আহমদের বাসায়।

ফয়েজ আহমদ আমার কপালে পিয়ার্সিং কইরা সেইখানে ঝুলানো সেইফটিপিন দেইখা রাইসুরে বললেন, ঢাকার মেয়েদের ফুটা করার জায়গার অভাব হইতেছে কিনা ইদানিং। আমি উনারে কইলাম, “আপনার মত ঢাকার কবিরা যেইহারে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগতেছেন, আমাদের আর সেই গুয়ের চাপ কমাইতে যত্রতত্র ফুটা করা ছাড়া গতি কী?”

রাইসু পরে আমারে গোপনে বলছিলেন, কথাটা একটু ‘ওভারডোজ’ হইয়া গেছে। এত না বললেও হয়ত চলত।

যারা রাইসুরে আমার মত কাছ থিকা দেখছেন, তারাই স্বীকার করবেন রাইসু যে কোনো মানুষরে উনার দর্শন দিয়া, উনার অভিনবত্ব দিয়া, উনার সরল হাসি দিয়া উল্টায়ে পাল্টায়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু উনি কি আমার বিরুদ্ধে আমার সামনে বা পিছনে কথা বলেন না? আমি জানি, বলেন। উনারে যারা ভালোবাসছেন, উনি তাদের সবার বিরুদ্ধেই কথা বলছেন। আহমদ ছফা রাইসুরে নিজ পুত্রের মমতায় ভালোবাসছেন, রাইসুও তারে ভালোবাসতেন, কিন্তু উনিই আবার ছফারেই বার বার নাকচ কইরা দিছেন। এইটা রাইসুর অকৃতজ্ঞতা বা কৃতঘ্নতা না, এইটাই রাইসুর চরিত্র। একজনরে ভালোবাসলেই তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমরা তার যে অথরিটি তৈরি করি, রাইসু সেই অথরিটিরে পাত্তা দেন না। আমি রাইসুরে দেখি উনার কবিতার লাইনে, “বাৎসল্যবিহীন যারা, লক্ষ করো, কীভাবে ব্যক্ত হয়ে উঠছে বাহুল্য; ওই ব্যক্তি হয়ে ওঠে স্তন—নারীবাদিনীর, ছুঁড়ে ফেলা ছিন্ন স্তন ফুঁসে উঠছে স্বীকৃতিসংক্রান্ত। তাকে দাও অধিকার—বিন্যস্ত হবার; তাকে শিশুদের হাত থেকে রক্ষা করা হোক!” এই অদ্ভুত- অথরিটি অস্বীকার করা, কন্ট্রাডিকটারি লাইন একমাত্র রাইসুর পক্ষেই লেখা সম্ভব।

রাইসুর কবিতা আমার পছন্দের আরো একটা কারণ আছে। কবিতা মাত্রই যে ন্যাকামি, কবিতা মাত্রই যে গুরুগম্ভীরতার প্যাঁচাল, কবিতা মাত্রই যে মেলোড্রামা, কবিতা মাত্রই যে শীত শীত এবং কুঁই কুঁই ব্যাপার, সেইটা শক্তি চট্টোপধ্যায়, বিনয় মজুমদার এবং ব্রাত্য রাইসু আমার জন্য পাল্টায়ে দিছেন। “সাট আটজন সরলা এবং টরল রাবিন্ড্রিক—সঙ্গে শিল্পাঞ্জি একজন—টিনি টবলা বাজাচ্ছেন” এমন সহজ শব্দে কঠিন সাহিত্যরে ‘গোয়া মাইরা দেওয়া’ লাইন বাংলাদেশে আর কোনো কবি লিখছেন বইলা আমি জানি না। অথবা “আমি উকিল, আমার ঘরে—কুকিল ডাকব দিনেদুপুরে—নাকি?—অথচ কুকিল বাইরে ডাকে!—হোয়াই?—কুকিল ঘরের বাইরে থাকে,—তাই তে ঘরের বাইরে ডাকে।—টোয়াইইই!” এর মত ননসেন্সিকাল হিউমার রাইসুর মত আর কে লিখছেন তা আমি জানি না।

রাইসুর ডার্ক উইট হজম করতে অনেক দিনের প্র্যাকটিস করা পাকস্থলি লাগে। প্রথম ধাক্কায় রাইসু বদহজম তৈরি করেন সন্দেহ নাই। কিন্তু যারা রাইসুর কাছের বন্ধু তারা জানেন, রাইসুর এই সমস্ত মানুষরে অপদস্থ করার চরিত্র, মানুষরে নাকচ করার বৈশিষ্ট্য, বাংলা সাহিত্যর কলকাত্তাইয়া এবং রাবীন্দ্রিক ন্যাকামি চরিত্ররে এক ধাক্কায় ‘র’ এবং আনরিফাইন্ড এবং আনপলিশ্‌ড্‌ বানাইয়া ফেলার ক্ষমতা, বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের উচ্চমার্গের ডালে বইসা মৃদু মৃদু ‘এলিট’ দোলা খাওয়ার বাসনারে অ্যাটেনশান সিকিং এবং নার্সিসিজমের চর্চার মাধ্যমে লঘু এবং সেই সূত্রে সাব-অল্টার্ন বানাইয়া ফেলার প্রভাব, বাংলারে প্রমিতর নাক-উঁচু হাত থিকা উদ্ধার কইরা মাটির কাছের ভাষার কাছে নিয়া যাওয়ার কালচারাল স্ট্রাগল, রাইসুর নিজেরে নিয়া বা নিজের আর্থ-সামাজিক শ্রেণি নিয়া মধ্যবিত্ত মানসিকতায় সংকুচিত না থাকার উইট দিয়া মানুষ হিসাবে রাইসুরে ডিফাইন করা সম্ভব না।

আমি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরছি, বহু মানুষ দেখছি। রাইসুর মত ‘ভাল’ মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কমই দেখছি। ভাল খারাপ আপেক্ষিক, সন্দেহ নাই। কিন্তু সমাজ এবং ধর্মের বিবর্তনে কালেক্টিভ আনকনশাসনেস দিয়া আমরা যারে ভাল বইলা বিচার করি, তার পুরাটাই রাইসু। উনি নিজ স্বার্থে মানুষের অপকার করেন না, উনি মানুষের পিঠে পিছন থিকা ছুরি চালান না, উনি মিথ্যা কথা বলেন না, উনি হিপোক্রিসি করেন না (যদিও হিপোক্রিসি কেন ভালো এই নিয়া উনার লম্বা লেখা আছে), উনি ছলের আশ্রয় নিয়া প্রেম করেন না, উনি মানুষরে ঠকান না, উনি শ্রেণি দিয়া মানুষ বিচার করেন না।

উনার উড়াধুরা কথা ও সুপেরিয়রদের সাথে বেয়াদবির কারণে (এবং বেশিরভাগক্ষেত্রে উলটাপালটা জামা কাপড় পরার কারণে) বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে উনার চাকরি টিকে নাই, উনার পুরা জীবন কাটছে পয়সাহীনতায়। এবং তার মধ্যেও উনি উনার বাসার কাজের মানুষের পুত্র-কন্যাদের নিজের কম্পিউটার দিয়া সাহায্য করছেন, তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি জোগাড় কইরা দিছেন। সবই গোপনে।

উনার বাড়িতে যেই বেড়াইতে বা কাজে আসেন, যাওয়ার সময় উনারে রাইসু অবধারিতভাবে জিগান উনার ফেরত যাওয়ার পয়সা আছে কিনা। এবং সেইটা শুধু পয়সাহীনদের সাথে উনি করেন না। একদিন কবি চঞ্চল আশরাফ আসতেছেন উনার বাসায়। উনি চঞ্চলরে কইলেন আসার সময় নিচের দোকান থিকা দুই প্যাকেট মুড়ি কিনা নিয়া আসতে। এরপর জিগাইলেন, মুড়ি কিনার টাকা উনার কাছে আছে কিনা। এমন না যে চঞ্চলের কাছে মুড়ি কিনার টাকা থাকে না। কিন্তু উনি নিজের কাজে আরেকজনরে দিয়া এমনকি দুই পয়সা খরচ করাইলেও সেইটা ফেরত দেন। উনি নিজের টাকায় নিজের জন্য বিশেষ কিছু করছেন বইলা আমি জানি না। এই টাকা উনি অন্যদের বিনাশর্তে ধার দিছেন ও দান করছেন। এই নিয়া আমি প্রশংসা করতে গেলেও আমারে ঝাড়ি দিয়া অফ করায়ে দিছেন, কইছেন, “আমারে নবী বানাইতেছো কেন? আমি যা আমি তাই। আমারে এত ভাল বানানোর দরকার নাই। এইসব কথা কোথাও বলবা না।”

আমি এইসব কথা একশ’বার বলব। ফেসবুকে যখন বিনাবেতনে রাইসু নিন্দাকারী সম্প্রদায় “রাইসু তার বড়লোক বন্ধুদের পয়সায় মদ খায় বা অন্যের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে” বইলা নোংরা গল্প চালান, বা কুৎসাবাজ বাতিল লেখকরা যখন পার্টিতে দাওয়াত দিয়া ডাইকা রাইসুরে ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দেন, তখন আমার কষ্ট হয় এই ভাইবা যে, আমরা শুধুমাত্র একজন মানুষের ‘কথা’ সহ্য না করতে পাইরা এবং তারে কোনো ছকে না ফেলতে পাইরা কীভাবে তার নামে মিথ্যাচার কইরা তার চরিত্রহনন করতে উস্তাদ।

রাইসুরে বাসা বা পার্টি থিকা বাইর কইরা দেওয়ার গল্প প্রচুর। একই ভাবে রাইসুর নিজেরও সভা পণ্ড কইরা মানুষের বাসা বা পার্টি থিকা বাইর হইয়া আসার গল্পও অনেক।

একবার উনি ধানমণ্ডিতে উনার এক আর্কিটেক্ট বড়ভাই ও বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খাইতে গেছেন উনার তৎকালীন স্ত্রী সোমা আপা (সোহানা শফিক) এবং তৎকালীন বন্ধু শিকোয়া নাজনীন ও উনার স্বামী মুন্না ভাইয়ের সঙ্গে। দাওয়াতকারী বন্ধু উনারে পার্টির লোকজনের সামনে বেকা হাইসা জিগাইলেন, বাড্ডা থিকা ধানমণ্ডিতে আসতে কষ্ট হয় কিনা? রাইসু উনারে উত্তর দিছিলেন, “আপনে একটা ফকিন্নির বাচ্চা, আপনার আম্মা ফকিন্নি, আপনে তার বাচ্চা, আপনের যদি রাজশাহী থিকা ধানমণ্ডি আসতে কষ্ট না হয় আমার কেন বাড্ডা থিকা হবে?”

এই কথার পরে উনি সভা পণ্ড কইরা দিয়া উনার তৎকালীন স্ত্রী ও তৎকালীন বন্ধু ও বন্ধুর স্বামীরে নিয়া ট্যাঙটেঙাইয়া বাইর হইয়া আসলেন। মজার বিষয় হইতেছে, ওই ‘ফকিন্নির বাচ্চা’ আর্কিটেক্ট ভদ্রলোকের সঙ্গে রাইসুর সম্পর্ক এখনও যারপরনাই মধুর।

রাইসুর সিগনেচার আমার বুকের বামদিকে ট্যাটু করা। প্রাক্তন প্রেমিকের নাম কীভাবে বুকের উপর নিয়া হাঁটি, এই নিয়া আমারে বহুবার প্রশ্ন শুনতে হইছে। আমি যেই উত্তর উনাদের কাউরেই দেই নাই, এমনকি রাইসুরেও না, তা হইল, রাইসু শুধুমাত্র আমার প্রাক্তন প্রেমিক বা খুব ভাল একজন বন্ধু না। রাইসু আমার দেখায় পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষ। উনি বেয়াদব হইতে পারেন, উনার কবিতা কারও ভাল নাও লাগতে পারে, উনার আঁকা ছবিরে ‘আর্ট হয় নাই’ এমন বইলা অনেকে উড়াইয়া দিতে পারেন, উনারে বুদ্ধিজীবী বা দার্শনিক বইলা কারও স্বীকার করতে শরীর জ্বলতে পারে, উনারে অপছন্দ করা যাইতে পারে, উনার কথার ধাররে, উনার উইটরে ঘৃণা করা যাইতে পারে, উনার চরিত্ররে সুবিধাবাদী বইলা ট্যাগ করা যাইতে পারে, কিন্তু সৎ, বুদ্ধিমান, সরল, যুক্তিবাদী, সৃষ্টিশীল, সুন্দর এবং পাগল মানুষ হিসাবে উনারে অস্বীকার করার কোনো উপায় কারও নাই।

উনি আদর্শবাদ সহ সকল বাদের সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াও একজন আদর্শবাদী নীতিবান মানুষ। উনি একলাই বাংলা সাহিত্যের এলিট চেহারা পাল্টায়ে দিছেন। উনি একলাই বাংলাদেশের কালচারাল জগতরে দোরা কাউরা দিয়া ‘গোয়া মারাইয়া’ আমাদের চিন্তাপদ্ধতিরে পাল্টায়ে দিছেন। ঢাকা শহরে এবং বাংলাদেশে রাইসু একজনই আছেন।

পড়ুন: নাদিয়া ইসলামের আরো লেখা

রাইসু, আই লাভ ইউ। আমি ভবিষ্যতে আরো প্রেম করব, প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিসের, বইয়ের, মানুষের প্রেমে পড়ব, কিন্তু তোমার প্রতি আমার প্রেম আজীবন সাবমিশানের। এবং তা জনসমক্ষে স্বীকার করতে আমার লজ্জা নাই। তুমি আমার প্রিয় কবি, প্রিয় আর্টিস্ট, প্রিয় দার্শনিক—(প্রিয় ঔপন্যাসিক না, সৈয়দ মনজুরের  সাথে তোমার লেখা উপন্যাস অখাদ্য), তুমি আমার প্রিয়তম দুইজন মানুষের একজন। প্রথমজন আমার নিউরোটিক মা। তুমি আমার মায়ের চাইতে একটু কম নিউরোটিক, মায়ের চাইতে বেশি পাগল, তুমি আমারে মায়ের প্রায় সমান এবং কিছুক্ষেত্রে উনার চাইতেও বেশি ভালোবাসা দিছো। তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে আমি লন্ডন থাকি বা আন্দামান বা হনলুলু, ফোন দিয়া বলছো, “পানি খাইয়া ঘুমাও বাবু!”

পঞ্চাশতম জন্মদিনে শুভকামনা। অনেক অনেক অনেক ভাল থাকো, অনেক অনেক অনেক প্রেম করো, আর তোমার স্মার্টনেস, ইনটেলিজেন্স, উইট, উইয়ার্ডনেস, ইনসাইট, শার্পনেস, ইউনিকনেস, প্রজ্ঞা, দর্শন, ক্রিয়েটিভিটি এবং তোমার টোল পড়া ত্যাঁড়াব্যাকা দাঁতের হাসি দিয়া আমাদের আউলাঝাউলা কইরা দাও। আর অনেক হাঁটো। অনেক হাঁটো। ইদানিং হাঁটা কইমা গেছে তোমার।

আদর। শুভ জন্মদিন।

১৯/১১/২০১৭

(কভারের ছবি. মম মোস্তফা ২০১৬)

Facebook Comments

1 Comment

Add Yours →

খুব ভালো লেখা, তবে বড্ড বড়। নেটে এত বড় লেখা পড়ার থেকে ছাপানো বই পড়তে ভালো লাগে।

Leave a Reply