আমি কি রাইসুর বন্ধু?

ফৌজিয়া খান
ফৌজিয়া খান, ছবি. হাসান তারেক চৌধুরী, নেত্রকোণা, ২০১৭
১৯৮৮ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি।... সেই সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মৌলিক উৎকর্ষ নামে একটা পাঠচক্র করতাম আমরা।... সেই সময় রাইসু এলো।

শিরোনামের এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে রাইসুকে বন্ধু বিবেচনা করি। করি, প্রসঙ্গক্রমে নানাখানে বলিও তা। যেসব জমায়েতে বলি তারাও আমার বন্ধুই বটে — শুনে অনেকে অবাক হয়, অস্বস্তি বোধ করে। কিছুতেই মেলাতে পারে না কী করে ‘ওই রাইসু’ ‘এই ফৌজিয়া’র বন্ধু হতে পারে!

রাইসুকে আপাতভাবে অমার্জিত মনে হয়। মনে হয়, বেয়াদব! কেউ কেউ ভাবেন, রাইসু অ্যাটেনশন সিকিং। কেউ কেউ আবার এই রাইসুকেই পছন্দ করেন — ঈর্ষণীয় রকমের বেশি পছন্দ করেন!

রাইসু আসলে এমনই তার নিজের মতোন যাকে আমরা সচরাচর দেখি না।

আমরা মানে কারা? আমরা মানে যারা ‘মধ্যবিত্ত’। মধ্যবিত্ত টাকা-সম্পত্তির মালিকানায়, মধ্যবিত্ত তথাকথিত মঙ্গল বা সু চিন্তায়। মার্জিত শোভন পোশাকে শরীর-ঢাকা মধ্যবিত্ত আমরা যারা। আমরাই তারা যারা বইয়ে পড়া পাণ্ডিত্য অবিকল প্রমিত ভাষায় শোভন স্বরে যে কোনো জায়গায় অবিরল বলে যেতে পারি। এই আমরাই ‘আমাদের’ চারপাশে। এই ‘আমাদের’ সাথেই আমাদের ওঠাবসা, চলাফেরা। এদের সাথেই আমাদের আরাম। সব সময় এমন আরামজনদের সাথে অভ্যস্ত মানুষেরা রাইসুকে মেনে নেবে কেন? মানে না। মানে না বলেই অতি সম্প্রতি ফেসবুকে পড়া ঘটনা রাইসুর জীবনে ঘটে। কী ঘটনা? ওই যে কিছুদিন আগে ঢাকা ক্লাবে কোনো এক দাওয়াতে গিয়ে না খেয়েই বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবার মতোন ঘটনা।

পরিচয়ের পর থেকেই দেখছি, চেনাজানা অনেকেই রাইসুকে দেখতে পারেন না। আমার অবশ্য রাইসু সম্পর্কে অতি মুগ্ধতা কিংবা ঘৃণা কোনোটাই নাই। কিন্তু রাইসু আমার বন্ধু। কারণ তারুণ্যের শুরুতে পরিচয় হওয়া রাইসুর সঙ্গে এখনও যখন কদিচ কদাচিৎ কথা হয় তখন মনের মধ্যে আরাম বোধ হয়। অকারণ ভদ্রতার মুখোশপরা কথা বলতে বা শুনতে হয় না।

ফৌজিয়া খান

১৯৮৮ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। ফল প্রকাশও হয়ে যেতে পারে — মনে নেই সেটা; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায়। সেই সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মৌলিক উৎকর্ষ নামে একটা পাঠচক্র করতাম আমরা। আমরা মানে তারা যারা তখন সেখানকার বইপড়া কলেজ কর্মসূচির তৃতীয় ব্যাচ। কলেজ কর্মসূচিতে আমরা মূলত সাহিত্য পড়েছি। মৌলিক উৎকর্ষে ইতিহাস বিজ্ঞান দর্শনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাদের। সেই সময় রাইসু এলো। এলো তবে আমরা যারা বই পড়তাম, বই নিয়ে আলোচনা সভায় মুখর থাকতাম রাইসু তেমন ছিল না। মানে পাঠচক্রের নির্ধারিত বইগুলো সে খুব একটা পড়ত বলে মনে পড়ে না। পড়ত না, না পড়াটা আড়ালও করত না। নির্ধারিত আলোচনায় বসতও না। কিন্তু আসত নিয়মিত। আগের সপ্তাহে বাড়ি নিয়ে পড়া বইটি নিয়ে আলোচনা শেষে কেন্দ্রের খোলা ছাদ কিংবা গাছতলায় আমাদের যে আড্ডা হতো সেখানে সে ছিল সরব। সরব তার স্বভাবসুলভ রসিকতায়, অপ্রমিত বাংলায়। রাইসু তখন রইসউদ্দিন রাইসু। তখনও জানি না — রাইসু কবিতা লেখে, ছবি আঁকে, ক্লাসিক্যাল মিউজিক শোনে।

রাইসুর পোশাক পরিশীলিত মার্জিত মধ্যবিত্তিক ছিল না — ছিল একটু আউলা ঝাউলা। আবার ধনী ঘরের বাউলা ধরনেরও ছিল না। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। স্যান্ডেলটাও খুব সাধারণ। মাথার চুল চিরুনিতে আঁচড়ানো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বন্ধুদের মধ্যে রাইসুর মতোন পোশাকে অপ্রমিত বাংলায় তীক্ষ্ণ বিদ্রূপে টইটুম্বুর আর কেউ তখন ছিল না।

সেই সময় রাইসুর মতোন পোশাকে আদিত্য কবিরকেও দেখেছি। (আদিত্য-এর বাবা প্রয়াত কবি হুমায়ুন কবির। ওর মা রেবু আপা শামসুন্নাহার হলের হাউজ টিউটর। শহর ঢাকার মধ্যবিত্ত আর্ট-কালচার করা মানুষেরা নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ওদের বাসায় যাতায়াত করেন। আমি নিজেও গেছি দু’এক সময়।) আদিত্য অবশ্য আমাদের কেন্দ্রের বন্ধু নয়। তবে সেই সময়ই আদিত্যের সাথেও আমার চেনাজানা হয়। অবাক যে, আউলা-ঝাউলা পোশাকে রাইসুকে কারোর কারোর ‘অসহনীয়’ মনে হলেও কাছাকাছি পোশাকের আদিত্যর ব্যাপারে লোকজনের তেমন ইমপ্রেশন দেখি নাই! কেন? এই কেনর উত্তর এখন বুঝি। কিন্তু তখনও এর উত্তর এতটা খোলা ছিল না। না আমার নিজের কাছে, না আমাদের সমাজে।

উত্তরটা আসলে আমাদের বিভাজিত সমাজের ‘শ্রেণি’ শব্দে আড়াল হয়ে আছে। আমাদের সমাজে শ্রেণির বিভাজনটা এখনকার মতোন তখন (৯০ দশকের গোড়ার দিককার কথা বলছি) পুরোপুরি টাকার মালিকানায় গিয়ে ঠেকে নি। আউলা ছেলে আদিত্য স্পঞ্জ পায়ে, কখনও বা খালি পায়ে শহরময় ঘুরে বেড়ালেও ওকে নিজেদের মধ্যে নিতে আমাদের মতোন মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিসেবীদের অসুবিধা হতো না। কিন্তু আর্ট-কালচার করা শোভন সমাজের চোখে রাইসু ‘র’। আর্ট কালচার করা শোভন মানুষেরো শ্রেণি ও শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেন, তাত্ত্বিকভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল মানুষের মর্যাদায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু যাপিত জীবনে শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিমানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান আমরা অনেকেই দিয়ে উঠতে পারি না। তখন রাইসুর পরিবারকে কেউ চিনত না। (আমি অবশ্য এখনও ওর পরিবারকে জানি না।) আমরা কেবল জানতাম, ও বাড্ডা থেকে আসে। টাকাওয়ালা লোকের অভিজাত পাড়া গুলশানের ঠিক পাশেই থাকা বাড্ডা — তখনও কুলীন অনেকের থাকবার জায়গা হয়ে ওঠে নি! ফলে পোশাকে, আচারে কাছাকাছি আদিত্য কবিরকে মেনে নিলেও রাইসুকে নিতে অনেকেরই অনীহা ছিল। রাইসু তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমাদের সেই কুলীন শীলিত শোভন বন্ধু মহলে একটু আল টপকাই ছিল! তবে রাইসু আর আদিত্য কিন্তু বেশ বন্ধু ছিল। তখন অনেকদিন ওদের দু’জনকে আউলা পোশাকে স্পঞ্জ পায়ে বাংলামটর থেকে শাহবাগ, হাকিম চত্বর, বাংলা একাডেমি হয়ে ঢাকার পথে পথে হাঁটতে দেখেছি।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সেই হা হা হো হো করে কাটানো শোভন দিনে আমরা সব প্রমিত বাংলায় শীলিতভাবে কথা বলি। সাহিত্য পড়ি, বিজ্ঞান পড়ি, পৃথিবীর ইতিহাস পড়ি, পড়ি দর্শন। বইয়ে পড়া সেইসব জ্ঞান নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি। ফুল, বৃক্ষ, শিল্প, নন্দন, সৌন্দর্য, দর্শন নিয়ে ভাবি আর ভাবি যে জীবন স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর, স্বপ্নের চেয়েও বড়! কিন্তু রাইসু আড্ডায় এইসব স্বপ্ন, সুন্দর নিয়ে কথা বলে না! বরং চারপাশের বাস্তব জীবন, সময় ও সম্পর্ক নিয়ে নির্দ্বিধায় ‘র’ তামাশার রসে মজে থাকে! আমাদের বয়সী কারোর মধ্যে তখনও অত রসবোধ দেখি নি। তখনকার চেনাজনদের মধ্যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকেই সবচে রসিক দেখেছি। সায়ীদ স্যার কথায় কথায় উইট করতেন। আমরা হো হো করে হাসতাম। সায়ীদ স্যারের উইট তখন নির্ভেজাল লাগত — যেমন লাগত সুকুমার রায় আর বনফুলের লেখা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে রাইসু তখন নজর কেড়েছে নির্দ্বিধায় অপ্রমিত বাংলায় অনবরত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত রসালাপের গুণে।

আমাদের দেশ তখন সামরিক শাসক মেজর জিয়ার কাল শেষ করে মেজর জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসন শোষণে আছে। কিন্তু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছেলেমেয়েরা এইসব নিয়ে কথা বলি না — আমরা নন্দন আর সৌন্দর্যের তত্ত্ব নিয়ে তর্কে নিমগ্ন; তখন সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে আমাদের তেমন দুঃশ্চিন্তা নেই। আমরা তখন দলবদ্ধভাবে বাঙালির ইতিহাস পড়ি কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে কথা বলি না। আমরা ‘স্বপ্ন’ নিয়ে কথা বলি কিন্তু ‘জীবন’ নিয়ে ভাবি না। শিল্প সাহিত্য আর সৌন্দর্যের এক অলীক বাস্তবের মধ্যে মনের আনন্দে আমরা সব চলছি ফিরছি। ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ সায়ীদ স্যারের মুখে বহুবার শোনা এই কথা তখন আমরা অনেকেই আপ্তবাক্য হিসেবে নিয়ে নিয়েছি। সেই সময় রাইসু এসেছিল আমাদের মধ্যে — ওর ঝাঁঝালো উইট নিয়ে।

রাইসুর উইট অন্যরকম। রাইসুর উইটে সব সময় হাসা যায় না। রাইসুর দেখার চোখ ছিল তীক্ষ্ণ। সমাজ শ্রেণি আর মানুষে মানুষে সম্পর্কের পোশাক ছাড়া কঙ্কালটা নিয়ে রাইসু ব্যঙ্গ করত নির্দ্ধিধায়। সেই বয়সে আমাদের শীলিত শোভন মধ্যবিত্তিক সীমানার বাইরের জীবনটাও সম্ভবত ওর দেখার সুযোগ হয়েছিল। রাইসুর রসিকতায় ওর দেখা জীবনের নির্যাস থাকত। ফলে এহেন প্রবল তীব্র ধারালো প্রাণবন্ত বাস্তব রাইসুর উপস্থিতি-সাহচর্য অনেকেই এড়িয়ে চলতে চাইত। কিন্তু রাইসুকে অস্বীকার করা যেত না।

ফৌজিয়া খান
বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বন্ধুরা, ১৯৮৮ সালে পিকনিকের সময় রাইসুর সাথে আমাদের ব্যাচের একমাত্র ছবি

মনে পড়ছে আমাদের পরের ব্যাচের নিঘাতের বিয়ে খেতে যাওয়ার কথা। নিঘাত দেওয়ান নামে শান্ত খুব সুন্দর এক মেয়ে ছিল — কথা তেমন বলত না। কিন্তু নিয়মিত কেন্দ্রে আসত। যতদূর মনে পড়ে ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই প্রবাসী পিএইডিধারী সুদর্শন এক ভদ্রলোককে বিয়ে করে। পারিবারিকভাবে, ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল — কেন্দ্রের খুব কাছে ইস্কাটনে সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে। রাতে ওর বিয়ে খেতে গিয়ে দেখি কেন্দ্রে আমাদের চেনাজানা ছোটবড় সবাই সেখানে আমন্ত্রিত। আমি আর শিমু (নাহিদ ইসলাম শিমু, কেন্দ্রে পরিচয় হওয়া বন্ধুদের মধ্যে সবচে নিকট নিয়মিত আস্থার সম্পর্ক এখন যার সাথে আমার) ঢুকছি যখন দেখলাম সায়ীদ স্যার তার গাড়ি থেকে নামছেন। সাথে লুনা আপা (স্যারের বড় মেয়ে লুনা সায়ীদ), মাযহার ভাই (আহমাদ মাযহার, লেখক); আমীরুল ভাইসহ (আমীরুল ইসলাম, শিশু সাহিত্যিক/ ছড়াকার) আরো কেউ থাকতে পারেন। ওনারা ঢুকেছেন সবে; সব পরিচিতরা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি সেই সময় দেখি রাইসু, সাজ্জাদ ভাই (সাজ্জাদ শরিফ) এবং আরো দু’চারজন যারা একসাথে আড্ডা দিত — গেট দিয়ে ঢুকছে। ওদের দেখেই মাযহার ভাই বেশ বিরক্ত হলেন। বলে উঠলেন, এই রাইসু গংকে কে বলেছে বিয়ের কথা?

কে বলেছিল জানি না। নিঘাতই ওদেরকেও ইনভাইট করেছিল কিনা জানি না। কিন্তু ওরা কল কল করে এলো, ঘটা করে খেলো, সকলের সঙ্গে আড্ডা দিল। আড্ডায় অবশ্য সায়ীদ স্যার ছিলেন মধ্যমণি। স্যারের সাথে সমানে সরব সরস আড্ডা দিয়ে রাইসুরা সুন্দর বেরিয়ে গেল। সেই আড্ডায় মাযহার ভাই, আমীরুল ভাইও সম্ভবত যোগ দিয়েছিলেন!

কেন্দ্রের খোলা ছাদে তখন শিল্প সাহিত্যে আগ্রহী পড়ুয়া চিন্তাশীল মানুষদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল — তাদের সরব তুমুল আড্ডা সেখানে হতো। ফলে সেইসব মানুষদের দেখেছি তখন, কোনো কোনো গ্রুপের সাথে আড্ডাও হয়েছে। তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আমতলা কিংবা খোলা ছাদের অবারিত আড্ডায় চৌকশ সকলে সাজ্জাদ ভাইকে (সাজ্জাদ শরিফ — তখন তাকে আমরা কবি হিসেবেই চিনতাম, এখন তিনি ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক প্রথম আলো) খুব গুরুত্ব দিত। গুরুত্ব দিত মানে তাকেই তখন সবচে বেশি পড়ুয়া জ্ঞানী মনে করা হতো। সাজ্জাদ ভাই খুব শার্প ছিলেন। তারও উইট খুব ভালো। সমবয়সীরা কেউই তেমন রাইসুর বন্ধু হলাম না। কিন্তু চটজলদি সাজ্জাদ ভাই আর রাইসু খুব বন্ধু হয়ে গেল। মানে তখন তাদের দুজনকে বেশির ভাগ সময় এক সাথে দেখতাম। রাইসু আরো বন্ধু হলো আমাদের ঠিক আগের ব্যাচের ফাখরুল ভাইয়েরও। ফাখরুল ইসলাম চৌধুরীও তখন প্রখর মেধাবী বলে পরিচিত। ধারালো তিন মেধাবী তাদের সরস আড্ডায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ সরগরম রেখেছেন তখন। ক্রমে ওদের সেই সার্কেলে যুক্ত হলো আরো প্রখর দর্শনচক্রের সদস্য তীব্র, জিয়া, মাহফুজ।

বইপড়া কর্মসূচি শেষে আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে স্কুল কর্মসূচিতে কাজ শুরু করি। তারও পরে প্রায় বিনা বেতনে আমি আর বন্ধু শিমু লাইব্রেরিতে কর্মী হয়েছি। প্রতিদিন বিকেলে কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে অফিস করি। গায়ে গতরে কামলা দেই আর বিনা পয়সায় পছন্দ মতোন বই পড়ি। ফাউ হিসেবে পাই তখন কেন্দ্রে আসা ঢাকার প্রায় সকল বুদ্ধিজীবীকে কাছ থেকে দেখা বা কথা বলার সুযোগ! নিয়মিত আড্ডা দেই লাইব্রেরির সহকর্মী গল্পকার শহীদুল আলম, পারভেজ হোসেনদের সাথে। সেখানে তখন পারভেজ ভাইয়ের বন্ধু গল্পকার নাসরীন জাহান আসতেন। নাসরীন আপা তখন মাত্র তার প্রথম উপন্যাস ‘উড়ুক্কু’ লিখেছেন। কেন্দ্রের লাইব্রেরিতেই তিনি ‘উড়ুক্কু’র পাণ্ডুলিপি আমাকে দিয়েছিলেন। ছাপা হয়ে পুরস্কার পাবার আগেই বইটি পড়ার সুযোগ হয়েছিল। পাকামো করে কোনো মন্তব্য তাকে দিয়েছিলাম কিনা এখন আর মনে নেই। তবে মনে পড়ে, ‘উড়ুক্কু’ নামটি স্বপ্নে পাওয়ার কথা বলেছিলেন নাসরীন আপা। কেন্দ্রের অফিস আওয়ার ছিল বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা। আমি শুরুর দিকে চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত অফিস করতাম। সেটা ক্রমে এক ঘণ্টা করে বাড়িয়েছি। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাটা বাড়িতে সহনীয় হবার পর এটা করেছি। তো ওই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে কাজ করার সময়ই রাইসু এবং সাজ্জাদ ভাইয়ের সাথে আড্ডা দেওয়ার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। সাজ্জাদ ভাই তখন নিয়মিত কেন্দ্রে আসতেন। ছাদে যাওয়ার আগে লাইব্রেরিতে ঢু মারতেন — কিছুক্ষণ গল্প গুজব হতো।

জীবন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য তখন আমার ছিল না। ক্যারিয়ার নিয়েও কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমি স্বাধীন মানুষ হতে চেয়েছিলাম। কাজ করতে চেয়েছি — জীবনকে মিনিংফুল করতে চেয়েছি। কিন্তু কীসে যে নিজেকে মিনিংফুল মনে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। কোনো গাইডেন্সও ছিল না। চেয়েছি নিজের ভালো-না-লাগা বিষয় থেকে মুক্ত থাকতে। আমাদের বাড়িতে বইপড়া অনেকটা বাঙালির ভাত খাওয়ার মতোনই স্বাভাবিক সহজ একটা ব্যাপার ছিল। বই পড়তাম। সাহিত্যই মূলত। বইপড়া কর্মসূচি শেষেও যে কেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করি নাই তার কারণ ওই বইপড়ার সুযোগ। আর সেই কারণেই তখন রাইসু-সাজ্জাদ ভাইয়ের সাথে কিঞ্চিৎ বন্ধুত্ব। আমাদের পাঠ নিশ্চিতভাবেই আলাদা ছিল, আমার বুদ্ধির ঝলকও ওদের মতোন ধারালো নয় — তবুও তখন রাইসু-সাজ্জাদ ভাইয়ের সাথে নিয়মিত আড্ডা হতো। সেইসব আড্ডা কেন্দ্রের ছাদ থেকে শাহবাগ, এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর, ধানমণ্ডির দুই নম্বর সড়কে জার্মান কালচারাল সেন্টারের মিলনায়তনে গিয়েও ঠেকত। অনেক দিন এমন হয়েছে, বাংলামটর থেকে এক রিকশায় আমি রাইসু সাজ্জাদ ভাই ছবি দেখতে জার্মান কালচারাল সেন্টারে গেছি। রিকশায় হেলান দেওয়ার চিকন পিঠ-দেয়ালের উপরে রাইসু বসেছে আর একপাশে আমি অন্যপাশে সাজ্জাদ ভাই। ফিল্ম দেখা শেষে সরব সতেজ আড্ডা সেরে যে যার বাড়িতে ফিরেছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমাদের ব্যাচের বইপড়া কর্মসূচির অন্যরা তখন সেই সব আড্ডায় আর নেই।

আমাদের ছাত্রবেলায় মঈন ভাই (কবি মঈন চৌধুরী) ছোট কাগজ ‘প্রান্ত’ করবেন। সালটা সম্ভবত ১৯৮৯/৯০/৯১ সাল হবে। সম্পাদনায় রাইসু। রাইসু ‘প্রান্ত’-এর জন্য গুন্টার গ্রাস-এর ‘দ্য টিন ড্রাম’ নামে একটি লেখা আমাকে অনুবাদ করতে দেয়! আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। ইংরেজি তেমন জানি না। মূল লেখাটি জার্মান ভাষায় লেখা; ওটা ইংরেজি থেকে বাংলা করতে গিয়ে আমি বাংলার ঢঙে অনুবাদ করেছিলাম। ‘প্রান্ত’ প্রেসে পাঠাবার আগে সম্পাদক রাইসু লেখাগুলো নিয়ে বসেছিল মঈন ভাইয়ের বাসায়। সেখানে ইংরেজির সাথে মিলিয়ে পড়তে গিয়ে দেখা গেল অনুবাদে আমি গুন্টার গ্রাস-এর বেশ কিছু বাক্যের অর্থ একশো আশি ডিগ্রি বদলে দিয়েছি! (ইংরেজি ঠিকঠাক না জানায় এমন বিপত্তি ঘটিয়েছিলাম।)

ওই একই প্রকাশনার জন্য প্রিসিলা (প্রিসিলা রাজ) করেছিল জাঁক দেরিদার বিশাল এক প্রবন্ধের অনুবাদ। প্রিসিলা ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী। ইংরেজি ওর সমস্যা নয়। প্রিসিলা অনূদিত বাংলা লেখাটিও সম্পাদক রাইসু আরো ঘষামাজা করেছিল। মঈন ভাইয়ের বাড়ি তখন শান্তিনগর। ওখানেই নিচতলার বসার ঘরে রাইসু ‘প্রান্ত’ সম্পাদনার কাজ করেছিল। জাঁক দেরিদার লেখা নিয়ে প্রিসিলার সাথে রাইসু আর গুন্টার গ্রাসকে ঘষামাজা করার জন্য আমার সাথে বসেছিলেন জুয়েল ভাই (কবি, সাংবাদিক জুয়েল মাজহার)। আমি আর প্রিসিলা তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী- ক্লাশ শেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে শান্তিনগর চলে যেতাম। সেখানে দলে বলে সদানন্দে বিনে পয়সার কাজ শেষে বাড়ি ফিরতাম। কোনো কোনো দিন অফিস শেষে সাজ্জাদ ভাই (তিনি তখন জীবন বীমা কর্পোরেশনে কাজ করেন) আসতেন, মঈন ভাইও উপর থেকে নেমে আসতেন। যতদূর মনে পড়ে, রাজু আলাউদ্দিন, আয়শা ঝর্নাও মাঝেমধ্যে যোগ দিত। তুমুল তুখোড় আড্ডা শেষে হাঁটাপ্রিয় আমি আর প্রিসিলা রমনা পার্কের পাশের ফুটপাথ ধরে সড়কবাতির ফিঁকে আলোয় কথা বলতে বলতে একসাথে শাহবাগ পর্যন্ত আসতাম। তারপর রিকশায় যে যার বাড়ি। তখন — ‘প্রান্ত’-এর কাজ করতে গিয়েই বুঝেছিলাম, রাইসু ব্যাকরণের সূত্র মুখস্থ বলে না — কিন্তু খুব সুন্দর এক্কেবারে নিজের মতোন বাংলা লিখতে পারে! সেই লেখালেখি রাইসু এখনও জারি রেখেছে। সম্পাদনার কাজটাও এখনও সে নিজের মতোন করেই করে চলেছে।

তো ব্রাত্য রাইসুই আমার প্রথম সম্পাদক। ও চেয়েছিল বলেই পত্রিকার জন্য লিখতে শুরু করেছিলাম। লেখক হওয়া, লেখালেখি করে নাম করার ইচ্ছে স্বপ্ন বা কল্পনা কিছুই ছিল না আমার। কিন্তু ছোট থেকেই স্কুলের খাতার সাথে আলাদা একটা খাতা ছিল। কিছু মিছু লিখতাম। কাউকে দেখাতাম না। সেসব ছিল একান্ত নিজের সাথে নিজের কনভারসেশন। আজিমপুর কলোনিতে আমাদের ছোট্ট বাসায় পড়ার টেবিলে রাখা থাকত। আমরা ভাই-বোনেরা ঘর-টেবিল শেয়ার করতাম। বাড়িতে কোনো তালাচাবি ছিল না। সবকিছু খোলা থাকত। কিন্তু আমরা কেউ কারোর জিনিস হাতাতাম না! আমাদের গোপনীয়তা থাকত। ছাপার আগে বাড়ির কেউ জানতে পারে নি আমার সেইসব লেখালেখির কথা।

কী লিখতাম তখন? গল্প বা কবিতা? তখনও কোনো ফর্মের নাম জানি না। মনে আসত এমন সবকিছুই সেই খাতায় লিখে রাখতাম। এমনকি কোনো বই পড়ে ভালো লাগলে ভালো লাগা কথাগুলোও টুকে রাখতাম। কিন্তু সবই ছিল একান্ত সংগোপন — আমার নিজের। তো বন্ধুবেশি সম্পাদক রাইসু না বললে ‘প্রান্ত’-র প্রথম সংখ্যায় ওই অনুবাদ করা হতো না — নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার আরামও হতো না! ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার সেই আরাম, শাহবাগকেন্দ্রিক লেখক মহলে গুন্টার গ্রাস-এর লেখা অনুবাদে কিঞ্চিৎ প্রস্বস্তি — নবীন বয়সে হয়তো আনন্দই দিয়েছিল! নইলে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই এখনও কেন আর কিছু না হোক যা ইচ্ছে তা-ই লিখে রাখতে চাই?

আমার ভেতরে খুব একলা একজন মানুষ আছে। একলা দুখি এক মানুষ। এক হাট মানুষের মধ্যে থেকেও তার একলা ভাব কাটে না। হা হা করা হাসিতেও বুকের মধ্যিখানের অবিরল কান্না থামে না। কারণে-অকারণে ভেতরের মন খারাপ করা চিনচিনে কান্না আপাত স্থির আমাকে খুব অস্থির করে রাখে। যেখানেই যাই মনে হয় হেথা নয় — অন্য কোথাও দূর কোনো অজানায় গিয়ে শান্তি হবে। তো তখনও জানি না — এর নাম বিষণ্ণতা। ভেতরে হাঙরের মতোন ক্ষুধার্ত একলা আমিটার চিনচিনে কান্না সামলাবার জন্য সেই ছোট্টবেলা থেকে সবসময় নিজেকে নানান কিছুতে ব্যস্ত রাখতে চাইতাম। বুঝতাম না প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কী — কিন্তু বিনা প্রশ্নে প্রচলে চলায় অনীহা ছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য পুস্তক যেভাবে পড়ানো হতো সেটা পছন্দ ছিল না। কিন্তু তার বিকল্প কী — বা কীভাবে পড়লে সেই বিষয়গুলোকে নিজের মতোন করে বুঝে নিয়ে নিজের মত তৈরি করতে পারব সেটা তখন বুঝি নাই। স্কুল-কলেজে ভালো ফল টার্গেট ছিল না — আমি বুঝতে চাইতাম, অনুধাবন করতে চাইতাম। কিন্তু মনের মতোন গাইডেন্স তখন পাই নাই। মুখস্থ করার অভ্যাস ছিল না। ফলে মোটামুটি মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও মুখস্থ-নির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতিতে আমার ফল সবসময় মাঝারি মানের। এই ফল নিয়ে অবশ্য অসন্তুষ্টি নেই। কিন্তু ভেতরের মননশীল আমিটা সব সময় অতৃপ্ত থেকেছে। আমি তাই আশ্রয় খুঁজে নিতাম আমার গোপন লেখার খাতায়, পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইয়ে, চিত্রকলার প্রদর্শনীতে, বিনে পয়সায় দেখতে পাওয়া চলচ্চিত্রের শোগুলোতে। আর ছিল দলে-বলে আড্ডা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা শহরময় হেঁটে হেঁটে অকারণ ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু বিষাদময় মন তারপরও কামড়ে খেত আমাকে। বিষণ্ণ মনের চিকন কান্না থামানোর জন্য আমার তাই দরকার ছিল আরও ব্যস্ততা। আবার নারীবাদী কোনো লেখা না পড়েও মেয়েজীবনে পরাধীনতার প্রধান কারণ তখন মনে হয়েছিল বাবার কাছ থেকে টাকা নেওয়া। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর থেকেই আমি তাই কিছু করার চেষ্টা করেছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নামমাত্র বেতনে কাজ করেছি। পরে পত্রিকায় কাজ শুরু করি। তখন ‘মাটি’ (শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ক মাসিক পত্রিকা, প্রেরণা প্রকাশনী), ‘অবয়ব’ (জাপান প্রবাসী বাঙালিদের মাসিক পত্রিকা, ঢাকা থেকে ছাপা হতো) এবং ‘দৈনিক লালসবুজ’ পত্রিকায় কাজ করেছি।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছি। ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে আড্ডা তখন হাকিম চত্বরে। আর বন্ধু বলতে তখন কে নয়? বাংলা বিভাগের বন্ধুরা তো ছিলই। অর্থনীতির মাহফুজ, ইংরেজির মামুন, তাপস, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পার্থ — আমরা তখন দলের মধ্যে আলাদা দল। আর সব দল একাকার হয়ে যাওয়া আমাদের সেই আড্ডায় আরো যে কতজন আসত! বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, শাহবাগ, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া — আরো কত জায়গা থেকে কত যে মানুষ আসত। তখন অবলীলায় এক জনের বন্ধু আর সবার বন্ধু হয়ে যেতাম! বয়সে বড়রাও আসতেন। আসত ছোটদেরও কেউ কেউ। নানান বিষয়ে কত যে কী নিয়ে কথা আমরা বলেছি! সেইসব দিনে দু’একবার রাইসু-সাজ্জাদ ভাইও এসেছেন আমার হাকিম চত্বরের সেই আড্ডায়।

হাকিমে তখন নেশার আড্ডাও হতো। সিগারেট গাঁজা তো নস্যি। ঢাকায় তখন নেশার জগতে প্রতাপ চলছে হিরোইন, পেথেড্রিন, ফেনসিডিলের। এই সবকিছুরই সমজদার আড্ডায় বন্ধুদের কেউ কেউ। আমার কোনো নেশা নেই। নেশা করতাম না, কারোর সঙ্গে প্রেমও করি না। আজব যে, ক্লাশ ছাড়া বাকিটা সময় ওদের সাথেই কাটিয়েছি! আড্ডাই ছিল আমার নেশা। বোধহয় হাকিমের আড্ডাতেই পরিচয় হয়েছিল মোস্তফা আব্বাস (সাংবাদিকতা করতেন) ভাইয়ের সাথে। তিনিই আড্ডা থেকে ধরে নিয়ে ‘দৈনিক লালসবুজ’ পত্রিকার সাব এডিটর বানিয়ে দেন আমাকে আর মামুনকে (মামুনুল হক)। পত্রিকাটি প্রকাশনার দায়িত্ব তখন নতুন একদল সাংবাদিক নিয়েছেন। সম্ভবত বোরহান কবীর এবং নঈম নিজাম মূল দায়িত্বে ছিলেন। আমি, মামুন দুজনেই আন্তর্জাতিক পাতায় ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের কাজ করতাম। আমার অফিস দুপুর থেকে সন্ধ্যা, মামুনের রাতের শিফট। ওখানে প্রতিদিন বসনিয়া-হার্জেগোবেনিয়া আর ফিলিস্তিনের মানুষের মৃত্যুর খবর তৈরি করতে খুব চাপ বোধ করতাম। ব্যাপারটা শিফট ইনচার্জ মোস্তফা আব্বাস আর আমিরুল বারী ভাই জানতে পেরেছিলেন। তারা দু’জনেই চেষ্টা করতেন আমাকে অন্যরকম খবর অনুবাদের কাজ দিতে। একটি দৈনিক পত্রিকায় যুদ্ধ, হানাহানি, মৃত্যু, দুর্ঘটনার বাইরে খবর তো খুব বেশি থাকে না। ফলে কাজটা করে আমি তেমন আনন্দ পেতাম না। আরও কী একটা কারণে যেন তখন ওই পত্রিকার কাজটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি বাড়ি থেকে টাকা নেই না, আবার সারাক্ষণ গুমড়ে কাঁদতে থাকা ভেতরের আমিটাকেও তো ব্যস্ত রাখতে হবে। আমার তাই বেকার হওয়া চলবে না। তো সেই সময় রাইসু আবারও পত্রিকাতেই কাজ পাইয়ে দেয়।

রাইসু তখন ‘দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা’য় কাজ করে। ‘বাংলাবাজারে’র সাহিত্য সম্পাদক নামে ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। রাইসু কাগজেপত্রে সম্ভবত সহকারি সাহিত্য সম্পাদক ছিল। কিন্তু বাস্তবে রাইসুই ছিল সাহিত্য সম্পাদক। তারেই আমি করতে দেখেছি সবকিছু। গুণদা কেবল পেজমেকাপের দিন অফিস আসতেন। আমি তখন হাকিমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যায় শাহবাগ যাই। সেখানে রাইসু, সাজ্জাদ ভাইসহ অন্যদের সঙ্গেও অকারণ আড্ডা শেষে বাসায় ফিরি। শাহবাগেই বোধহয় রাইসুকে বলেছিলাম — আমার কাজ দরকার। তো রাইসু আমারে ওদের অফিসে যেতে বলল। গেলাম। মহাখালিতে নাবিস্কোর পাশে তিব্বত ভবনেই বোধহয় তখন ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’র অফিস। সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। রাইসু আমাকে সম্পাদকের ঘরে নিয়ে গেল। বলল, আমার এই বন্ধুর কাজ দরকার। মতিউর রহমান চৌধুরী আমি বাংলায় পড়ি শুনলেন। দুপুরের পর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অফিস করতে পারব জেনে আমাকে সরাসরি প্রুফ রিডিং বিভাগে জয়েন করতে বললেন! আমি দৈনিকে আন্তর্জাতিক পাতায় সাব এডিটর হিসেবে কাজ করেছি, কিছুমিছু লেখালেখিও করি। তো প্রুফ রিডারের অফার পেয়ে একটু অপমানিতই বোধ করলাম। দৈনিক পত্রিকায় প্রুফ সংশোধন করিয়েরাই সবচে অবহেলিত, ক্ষমতায় কমজোরি। বেতনও সম্ভবত কম। আমি প্রুফ রিডারের অফার নিতে ইতস্তত করছিলাম। রাইসুই আমার দ্বিধা সরাতে হেল্প করল। বলল, করো। অসুবিধা কী? ঢাকা শহরে থাকা এবং খাওয়ার কোনো অনিশ্চয়তা আমার ছিল না। আমার দরকার নিজেকে ব্যস্ত রাখা। এখানে ব্যস্ততার বিনিময়ে টাকা পাব। সেই টাকায় হাত খরচ চলবে। সাংবাদিক হব এমন কোনো ভাবনাও তখন নেই। তো এক অর্থে ডিমোশন হলেও প্রুফ সেকশনেই জয়েন করলাম। প্রুফ সেকশনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ুয়া শহর ঢাকার কোনো মেয়ে বোধহয় তখন কাজ করত না। ব্যাপারটায় প্রুফ সেকশনে আমার সহকর্মীরা বোধহয় একটু অস্বস্তিই বোধ করতেন। অস্বস্তি বোধ করলেও তারা আমাকে খুব যত্ন করতেন, সহযোগিতা করতেন। অবাক হয়ে দেখলাম, পদমর্যাদায় প্রুফ সেকশনের কর্মীরা কমজোরি হলেও ভাষাজ্ঞানে তাদের উপরের পদধারী অনেকের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এটা ‘মাটি’ পত্রিকায় কাজ করার সময়ও দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকে সেখানে প্রবন্ধ লিখতেন। সেসব লেখার কপি পড়তে গিয়ে কারোর কারোর লেখায় বানান আর বাক্যের গঠনে এত ভুল পেতাম যে কী বলব ভেবে না পাই! আর কেবল ভাষাজ্ঞানেই নয় — ভাবনা, বোধে, আচরণেও বাংলাবাজার পত্রিকার অন্য বিভাগের অনেকের চেয়ে বেশি ঋদ্ধ ছিলেন প্রুফ সেকশনের কর্মীরা। তবে বেশিদিন ওখানে আমার কাজ করা হয় নি। জয়েন করার মাস দুই/তিনের মধ্যে ভারত সরকারের স্কলারশিপ পাই, পুনায় পড়তে চলে যাই। তো ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’য় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সেখানকার দারওয়ান, পিয়ন, পেস্টার, কম্পোজার সকলের সাথেই রাইসুর বেশ সহজ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। রাইসু পত্রিকাটির সম্পাদকের সঙ্গে যেমন সহজ ভঙ্গিতে কথা বলে ঠিক সেইভাবেই সে অন্যদের সাথেও কথা বলে।

তো তখন ‘বাংলাবাজারে’ থাকাকালেই রাইসু সাহিত্যপাতার জন্য এস. এম. সুলতানরে নিয়ে লিখতে বলে। সুলতান মারা যাবার পরে কি? মনে নাই। রাইসুই বলতে পারবে। ওর আমলেই দৈনিকের পাতায় আমার প্রথম কবিতাও ছাপা হয়। দু’চারজন আবার সেই কবিতা পড়ে প্রশংসাও করেন! তারপর অনলাইনে রাইসু ‘কবিতা সঞ্চালন’ নামে একটা পাতা খোলে। সেখানেও লেখা চায়। এবং আজব যে আমি আমার সেই গোপন খাতায় লেখা দু’একটা কবিতা দেই। ছাপাও হয়। আজব যে তুখোড় কবিদের কেউ কেউ অকবি আমারে তখন কবি হিসেবে চেনেন — ইমেইল পাঠিয়ে প্রশংসাও করেন! পরে রাইসু যখন বিডিনিউজ২৪-এর আর্টস পাতা চালায় সেখানেও মাঝেমধ্যেই তাগাদা দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে নানান কিছু। আমি না কবি, না প্রাবন্ধিক। ইচ্ছে যা হয় লিখি তাই-ই। এর যে কোনো সাহিত্যমূল্য আছে সেটা নিয়ে ভাবি নাই কখনও। তবে এটা ঠিক সম্পাদক ব্রাত্য রাইসু তাড়া দিয়ে লেখা না চাইলে আমার অনেক লেখাই হতো না হয়তো। আবার আমার পাঠানো দু’একটা লেখা বিশেষত কবিতারূপী কোনো লেখা মানে ঋদ্ধ না হলে বাতিলও করেছে। আজব যে তাতে আমি মাইন্ড খাই নি। জানতে চাইলে বলত, এটা ছাপা হলে পরে তোমারই আর ভালো লাগবে না। সম্পাদক রাইসুর উপর অনুচ্চারিত এক আস্থা ছিল, এখনও আছে। এখনও মনে হয়, যেকোনো ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রু অপিনিয়ন রাইসুই বলবে — সে ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হউক না কেন।

১৯৯৫-এর পর আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রবেলা শেষ হয়। আমি অবশ্য তখনও পুনায় (ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া, পুনে) পড়ছি। সেখান থেকে ১৯৯৭-এর মার্চে ঢাকায় যখন ফিরলাম তখন কোনোকিছুই আর আগের মতোন নেই। মানে আমাদের ছাত্রবেলার মতোন নেই। নানান খানে তৈরি হওয়া বন্ধুরা (বেশির ভাগ) পূর্ণকালীন কাজে ঢুকে গেছে। কাজের সূত্রেই আমাদের সামাজিক অবস্থান বদলে গেছে। সময়ও কমেছে, বেতনের টাকায় অর্থশক্তি অনেকের অনেক বেশি বেড়েছে — ফলে অবধারিতভাবেই আমাদের আড্ডার সঙ্গীরাও পাল্টে গেছে। বদলে গেছে আমাদের সম্পর্কের ধরন। কোনো কোনো সম্পর্ক পুরোপুরি নাই হয়ে গেছে!

বদলই সমাজের নিয়ম। ফলে আগে যাদের সাথে যোগাযোগ ছিল প্রতিদিনকার ঘটনা সেসব আর থাকল না। তবে কেমন করে যেন রাইসুর সঙ্গে যোগাযোগটা রয়ে গেছে। আমার সেন্স অব হিউমার রাইসুর মতোন প্রখর নয়। আমি বুদ্ধিতেও ওর মতোন তুখোড় নই। তবুও সেই ১৯৮৮ সাল থেকে আমাদের যোগাযোগটা থেকে গেছে। সেই থাকাটা এই এখন রাইসুর যখন পঞ্চাশ হচ্ছে — আমার হবে আর আড়াই বছর পর, তখনও আছে। আছে বলেই এখন লিখছি এই লেখা ব্রাত্য রাইসুকে নিয়ে। লেখা ক্রমশ লম্বা হয়ে চলেছে! বন্ধু রাইসুকে নিয়ে লেখা মানে কিছুটা নিজেকে নিয়েও লেখা। আমাদের তারুণ্যের কিছু সময় ঘটনা ও মানুষকে ফিরে দেখা!

তো পাঠক, এই আমার বন্ধু রাইসু। যার সাথে ভার্চুয়ালিটির বাইরে যোগাযোগ নেই অনেকদিন। যোগাযোগ না থাকলেও রাইসুকে দূরের মনে হয় না। আবার এটাও জানি আমরা খুব কাছেরও নই। না দূর-না নিকট; অথচ নির্ভার আস্থার বন্ধু আমার, রাইসু। এখন এই ভার্চুয়াল উঠানেই কেবল আমাদের দেখা হয়। কথাও তো ভার্চুয়াল উঠানেই ওর ওয়ালে দেওয়া স্ট্যাটাস পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কদিচ কদাচিৎ কখনো এখানে সেখানে টুকরো টাকরা দেখা যখন হয় তখন কথা বলতে হাসি বিনিময় — বড়জোর ‘কেমন আছো’ জানতে চাওয়া। তারই মধ্যে যতটুকু ওকে দেখি — দেখি রাইসু আগের মতোনই আছে।

আগের মতোন? সেই তিরিশ বছর আগে দেখা হওয়া বিশ বছরের তরুণ? তরুণই হয়তো। পঞ্চাশে লোকে যেমন ভারি হয় দেখতে, চলনে, বলনে — রাইসু তেমন হয় নাই। কিন্তু আমার কাছে রাইসুকে আগের মতোনই লাগে। কারণ ও দেখি আগের মতোন ওরই মতোন করে আছে। জীবনের গতিপ্রবাহ সময়ের বাঁক বিভঙ্গ মানুষ রাইসুকে অন্য এক মানুষ বানিয়ে ফেলে নি। আগের মতোনই ওরে অকপট, আড়ম্ভরহীন মনে হয়। সমাজের প্রচলকে ভাঙার প্রতিবাদী কোনো ঘোষণার আড়ম্বর না করেও রাইসু ওর মতোন করেই জীবনটাকে যাপন করে চলেছে। এইজন্য রাইসুকে আমি বন্ধু বিবেচনা করি। স্বভাবে, গুণে আমার চাইতে ভীষণ রকম আলাদা মানুষ হলেও রাইসু আমার বন্ধু।

তবে আমি ওর বন্ধু কি? না, জানি না! এই নিয়ে কথা বলি নাই আমরা। কখনো। প্রয়োজন হয় নাই বলার।

ডিসেম্বর, ২০১৭

 

Facebook Comments

জন্ম: ১৯৭০ সালে ৭ মার্চ, ঢাকা জেলার সদুরবাড়ি গ্রামে নানাবাড়িতে। পড়াশুনা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ইন সিনেমা করেছেন ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া, পুনে থেকে। সেখানে স্পেশালাইজেশন করেছেন চলচ্চিত্র সম্পাদনা বিষয়ে। এযাবত নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের কয়েকটি:

তাসের ঘর (২০১৭),
রাখব বহমান (২০১৫),
যে গল্পের শেষ নেই (২০১৩),
কোথায় পাবো তারে (২০১০),
সে কথা বলে যাই (২০০৯),
আলোয় ভুবন ভরা (২০০৮),
গঠিত হই শূন্যে মিলাই (২০০৭),
আমাকে বলতে দাও (২০০৬),
ওরা ফুটন্ত কুঁড়ি (২০০৪),
যেতে হবে দূর, বহুদূর (২০০৩)
অপরাজিত (২০০২) ।

টেলিভিশনে প্রচারিত ধারাবাহিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দুটির নাম উল্লেখযোগ্য :
কান্দে আমার মা (বিষয় মুক্তিযুদ্ধ, বছর জুড়ে প্রতিদিন এটিএন বাংলায় প্রচারিত, ২০০৯-২০১০),
আমাদের মন (বিষয় মন ও মানসিক স্বাস্থ্য, বিটিভিতে প্রচারিত, ২০০৮)

মন ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রকাশিত সংকলন বই: অন্তর্দৃষ্টি (মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৬) । সাক্ষাৎকার বই (অভিনেত্রী শিমূল ইউসুফ-এর সাক্ষাৎকার) : যে আমি গঠিত হই শূন্যে মিলাই (বিভাস প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৭)।
বর্তমানে চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষকতা, লেখালেখি এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও সম্পাদনায় রত। এখন বানাচ্ছেন ‘কারো দানে পাওয়া নয়’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র। এছাড়া বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত ষান্মাসিক পত্রিকা শিল্প ও শিল্পী-এর চলচ্চিত্র বিভাগের সম্পাদনা করে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *