এই নভেম্বরে

মনে হয়েছে লোকটার বিস্তার-ক্ষমতা অনেক কিন্তু প্রকাশ কম।

ব্রাত্য রাইসুর কথা লিখতে গিয়ে আমার মনে পড়ছে বছর পনের আগের কিছু বিকেলের কথা। কলেজছাত্র আমি; লিখতে শুরু করেছি একটু-আধটু আর শুক্রবার এলে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যসাময়িকীগুলো এক করে রাখতাম। বাসার সবার পত্রিকা পড়া শেষ হলে বিকেলের দিকে সাহিত্যপাতাগুলো নিয়ে বসতাম। গোগ্রাসে সবই পড়া হতো। এর মধ্যে প্রথম আলোতে ব্রাত্য রাইসুর নেয়া কবি-লেখকদের কিছু সাক্ষাৎকার আমাকে চমকে দিয়েছিল।

কবি আবুল হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রাইসু; শিরোনাম ছিল ‘আমি যেটারে ডরাই সেটা হচ্ছে ভাবালুতা।’ শিরোনামের মতো সাক্ষাৎকারের ভেতরভাগও চমকে উঠার মতোই ছিল। ‘আপনি কীভাবে সাহিত্যে এলেন’ জাতীয় জিজ্ঞাসার বদলে নানাভাবে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ভেতর থেকে নতুন কিছু বের করে আনার বৈশিষ্ট্যে রাইসুর গৃহীত সাক্ষাৎকারগুলো অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আর কবিদের স্বহস্তে লেখা একটি প্রেমের কবিতার সংকলনে ‘কুহু’ কবিতাটি পড়ে আমি আকর্ষণ বোধ করেছি ব্রাত্য রাইসুর কবিতার প্রতি—

কী কোকিল ডাকলো রে সই আমি যাই কুলগোত্র বান্ধব ছাড়িয়া
যাই কদম্বেরও ডাল
বড়ো আহ্বানিছে
প্রাণসখি রহিতে পারি না ঘরে সহিতে পারি না
মম পোড়া অঙ্গ জর জর এ তনু ত্যাজিব
যাব যমুনা যমুনা

এমন কুহুস্বর ভালো না লেগে উপায় ছিল না। এর পরপর মাতাল মানচিত্র নামে প্রথম আলোর একটি অনুবাদ কবিতাসংখ্যায় একজন জাপানি কবির কবিতার রাইসুকৃত প্রাণছোঁয়া অনুবাদ পড়েও মুগ্ধ হয়েছি, মনে হয়েছে লোকটার বিস্তার-ক্ষমতা অনেক কিন্তু প্রকাশ কম।

পিয়াস মজিদ

বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হয়েছি তখনই চৌত্রিশ বছর বয়সে প্রকাশিত রাইসুর প্রথম কবিতার বই আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি (২০০১) নিয়ে হৈচৈ চলছে বলা চলে। বাঙালি কবির পক্ষে একটু বেশি বয়সে প্রথম বই বের করেও যে তুমুল আলোচনার কেন্দ্র তৈরি করা যায় এই বইটি তা প্রমাণ করলো। পড়লাম সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের লেখা ‘আকাশে রাইসুর লগে’ শীর্ষক সুদীর্ঘ গ্রন্থালোচনা। বইয়ের মতো এই আলোচনাটিও ছিল ব্যতিক্রম। এই এক বই দিয়েই রাইসু তার কবিতার প্রভাবজাল বিস্তার করেন সমসাময়িক থেকে পরের প্রজন্মের অনেকের কবিতাকাঠামোয়; যদিও এদের অনেকের প্রচেষ্টাই কৃত্রিমতায় পর্যবসিত।

রাইসুর কবিতা নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, প্রশংসা ও নিন্দামন্দ হয়েছে। আমার মনে হয় প্রচল নন্দনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া বাংলা কবিতা ব্রাত্য রাইসুতে এসে যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচার পরিসর পায়। তাই মার্কিন মুল্লুক থেকে শহীদ কাদরী ফোন করে জানতে চাইতেন “ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে কি দেখা হয়, ও কি নতুন কিছু লিখছে?” ১৯৯৫-এ লতিফ সিদ্দিকী সম্পাদিত লিটলম্যাগ রোদ্দুর-এর কবিতা আড্ডায় শামসুর রাহমানের সঙ্গে ছিলেন আবু কায়সার, আলতাফ হোসেন, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির, হুমায়ূন রেজা। রাহমান সে সাক্ষাৎকারে একবার বলেন ‘আমি হয়তো ব্রাত্য রাইসুর মতো জীবন যাপন করতে পারতাম—” আর একবার বলেন, “আমি ব্রাত্য রাইসুর মতো হতে চাইলে হতে পারব না…।” জয় গোস্বামী ঢাকায় এলেন, জয়ের পিছু নিয়েছিলেন আমাদের অনেক মান্য অগ্রজ আর আমরা দেখলাম জয় বলেছেন “আমি ব্রাত্য রাইসুর কবিতার অনুরাগী।” ঢাকায় বসে শুধু কবিতা দিয়ে এভাবে রাইসু তার প্রভাবী ঘোড়ার ডানা ছড়িয়ে দেন দিগ্বিদিক।

কবিতার মতো জীবনযাপনেও ভনিতাহীনতায় রাইসু আকৃষ্ট করেছেন প্রবীণ-নবীন সবাইকে। বেশ কয়েক বছর আগে একদিন আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায় বসে চা খাচ্ছি। পাশেই বসা ব্রাত্য রাইসু; তিনি কোনো বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিলেন, হঠাৎ ফোন এলো কার যেন। রাইসুর ফোনালাপ শেষই হচ্ছে না, পাশে বসা বন্ধুটিও উঠে চলে গেছেন ততক্ষণে। অনেকক্ষণ পর ফোন রেখে রাইসু বললেন ফয়েজ আহমেদের ফোন ছিল। আমরা বুঝলাম পড়ন্ত বিকেলে ফয়েজ আহমেদ ফোনেই প্রাণের আড্ডা সেরে নিচ্ছিলেন রাইসুর সঙ্গে। বেঙ্গল ক্যাফেতে কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানকে ভিড়ভাট্টার মধ্যে রাইসুকে খুঁজে মাতৃমমতায় তার পারিবারিক খোঁজখবর নিতে দেখেছি, আলিয়াস ফ্রঁসেজে আবদুল মান্নান সৈয়দকে দেখেছি রাইসুর সঙ্গে দুদণ্ড আড্ডার ব্যাগ্রতায়। বলতেন তিনি, আরাম পান রাইসুর সঙ্গে কবিতা বা যে কোনো বিষয়ে কথা বলতে। সমকালীন সাহিত্যের অনিবার্য অংশ বলেই ব্রাত্য রাইসুকে চরিত্র হিসেবে পেয়ে যাই রশীদ হায়দারের এক গল্পে।

রাইসুর চরিত্রের একটি দিক জানি। আজ বলি। রাইসুর পেছনে অনেক প্রকাশককে ঘুরতে দেখেছি তার বই করার জন্য। রাইসু তাদের বই দেবেন বলে ঘুরান আর মাঝখান থেকে ঐ প্রকাশকদের বলেন “বস অমুকের কাছে একটা ভালো পাণ্ডুলিপি আছে। সেটা বই করেন।” এভাবে অনেক লেখকের বই বেরিয়েছে যাদের বই হয়ে ওঠার পেছনে রাইসুর নেপথ্য-ভূমিকা তারা হয়তো কখনো জানতেও পারবেন না। কারণ কারো জন্য কিছু করে সেটা বলে বেড়ানোর স্বভাব রাইসুর ধাঁতে নেই। মানুষটাকে এ জন্যই ফিরে ফিরে ভালো লাগে আমার।

কবিতার মতো জীবনের সুর্বণলগ্নটাকে রাইসু অদ্বিতীয় করে রাখলেন। নিজের পঞ্চাশপূর্তির মাহেন্দ্রমুহূর্তটি বিপুলভাবে উদ্যাপন করলেন স্রেফ অন্তর্জালে বসে। আমাদের সাহিত্যের ঘরবাড়িতে জন্মদিন পালনটা এখন অনেকক্ষেত্রে নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে, কবি-লেখক নামধারী অনেকে নিজেই বিনিয়োগ করে অনুষ্ঠান করেন, ঢাউস ঢাউস সংকলন করেন আর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে লগ্নিকৃত অর্থে পুষ্পভারাতুর হয়ে বলেন, “আমি এগুলোর কিছুই জানতাম না। আমাকে যে আপনারা সবাই এতটা ভালোবাসেন এটা এই অনুষ্ঠানে এসে টের পেলাম।” আর বাধ্যগত শ্রোতা-দর্শকরা মুখ টিপে হাসেন।

রাইসু এইরকম জন্মদিন-সংস্কৃতির যুগে একটা বিস্ফোরণ ঘটালেন। কোনো রাখঢাক না রেখে, কোনো মুখপত্র নিয়োগ না করে, নিজেই নিজের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সবার কাছে লেখা চাইলেন। অবাক ব্যাপার তার জন্মদিনের তারিখটি থেকে এই পড়ন্ত নভেম্বরে প্রতিদিনই এত এত লেখা পড়ছি রাইসুকে নিয়ে, এমন এমন মানুষেরও স্বতঃস্ফূর্ত স্মৃতিচারণ পড়ে উঠছি যাদের কেউ কেউ শত অনুরোধেও হয়তো এইসব পার্বণে লিখতে বসেন না। তবে বিষয়টা যেহেতু ‘ব্রাত্য রাইসু’ তাই যেন সবাই বলতে ব্যগ্র যে তারা তাদের মতো করে রাইসুকে ভালোবাসে। কথাটা বলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। রাইসু নিজেই সুযোগটা করে দিলেন, সেজন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর হালিকের দিন-এর পর নতুন বইয়ের প্রত্যাশায় এই নভেম্বরে আসুন পাঠ করি ব্রাত্য রাইসুরই ‘নভেম্বর’—

এই প্রেম ডাকে কি আমাকে আজ ভোরবেলা
সূর্য দেখি—
তুমি কি দেখার চোখ আরো কিছু পেয়ে যাচ্ছো?
আমাকে কি ভালো লাগছো? তোমার কথাই তবু
মনে রাখি, তমি কোন কোথায় কী করতে থাকছো
ভাবছি না মোটেও
তুমি প্রেম দিচ্ছো ভোরবেলা, নতমুখে
সূর্য নিচ্ছে প্রেম—

আমি ভেসেছি বাতাসে।

Facebook Comments
More from পিয়াস মজিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *