কবিতার বাইরে যে ভাবে দেখেছি রাইসুকে

সে সময়ে রাইসুর কনসেপ্টে করা ‘সব কিছু বদলে দিতে নেই’ বেশ আলোচিত হয়েছিল।

রাইসুর সাথে আমার প্রথম দেখা ২০০৭ সালের দিকে, একুশে টেলিভিশনে। তখন তার থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট চপ্পল পায়ে অফিসে আসা নিয়ে তোলপাড়। তার কবিতার সাথে তারও আগে পরিচয়, পত্রিকায় তার নেয়া ইন্টারভিউ পড়েছি। রাইসু আর ফাকরুল (ইসলাম চৌধুরী) ভাই মিলে একুশের চারবেলার ডিজাইন করছে। অল্প কথা হয়।

একুশের চারবেলা শেইপ নিতে শুরু করেছে, আমাদের আলাপ বাড়ছে। অফিসের প্রয়োজনীয়তার বাইরে একটু আধটু কথা হয় সহিত্য, ব্লগ নিয়ে। তখন সামহোয়্যার ইন ব্লগ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রাইসু ভাই সামুতে লিখছেন। সেটা ছিল কম্যুনিটি ব্লগের সাথে আমার প্রথম পরিচয়।

তারও অনেক পরে সামুর অফিসে রাইসু ভাইর সাথে গিয়ে আরও অনেক ব্লগারের সাথে পরিচয়। তাদের কয়েকজনের সাথে বন্ধুত্ব অটুট আছে এখনও।

বেশ কয়েক মাস বিরতির পর রাইসুর সাখে দেখা বিডিনিউজ টোয়োন্টিফোর ডটকমের অফিসের রিসেপশনে। রাইসু ভাই বিডিনিউজের আর্টস এডিটর। আমি ইন্টারভিউয়ের জন্য অপেক্ষা করছি, রাইসু ভাই মুচকি হাসির অভিবাদন ছাড়া অল্পই কথা বললেন।

বিডিনিউজে জয়েন করার পর রাইসুর ব্যক্তিত্বের সাথে আমার পরিচয়। বিডিনিউজ একসাথে অনেক কিছুই আমরা করেছি। কনটেন্ট ডিজাইন, প্রমোশন, সাইট ডিজাইন।

রাশেদ আহসান

সে সময়ে রাইসুর কনসেপ্টে করা ‘সব কিছু বদলে দিতে নেই’ বেশ আলোচিত হয়েছিল। কয়েকটি দৈনিক গুরুত্ব সহকারে ফিচার করেছিল, বাংলাদেশ প্রতিদিনে সেটা ছিল সম্ভবত ব্যাক পেইজে। কাজটা চ্যালেনজিং ছিল, আমাদের বাজেট কম, কোনো প্রফেশনাল অ্যাড এজেন্সি নাই, আমরা একসাথে অনেক কাজ করছি।

সে সময় বিডিনিউজে নিউ মিডিয়া বলে নতুন একটা ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে। তাদের কাজ মোবাইল ফোনের জন্য নিউজ কনটেন্ট তৈরি করা। আমরা সেই কনটেন্ট মার্কেট করতে নানা ফন্দি করছি। এমনিতে মোবাইল মেসেজ, ওয়েবে ইন্টার অ্যাকটিভ ব্যানার ভাল কাজ করত। কিন্তু আমরা ফিজিকাল কিছু করতে চাইলাম, যাতে টপ অফ মাইন্ডে থাকতে পারি।

সে সময় আরো একটা ঘটনা ঘটল। এমনিতে কনটেন্ট বিক্রি ছিল আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস। আমরা দেশের প্রায় সব দৈনিকের কাছে কনটেন্ট বিক্রি করি। একটা নামি জাতীয় দৈনিক আমাদের নিউজের সাবস্ক্রাইবার—কনটেন্ট ছাপে কিন্তু নাম দেয় না। আমরা চাইতাম তারা এট্রিবিউট করুক। আমাদের মনিটরিং ছিল। আমরা দাড়ি কমা সহ অনেক প্রমাণ জোগার করলাম। সেইটা যেহেতু নামি প্রতিষ্ঠান, মানুষরে নসিহত করে, আমরা ভাবলাম চুরি ধরিয়ে দিলে তাদেরও উপকার হবে। কিন্তু তারা মাইন্ড করল। অমাদের কনট্রাক্ট বাতিল করল।

সেই সময় সেই দৈনিকটি অনেক টাকা খরচ করে ক্যাম্পেইন করছে। আমাদের যেহেতু বাজেট কম, তাই রাইসু ভাই খোঁচা দিয়া কিছু একটা করতে চাইলেন। তাতে বড় ক্যাম্পেইনের মাইলেজ নেয়া যাবে।

একদিন দুপুরে ‘সব কিছু বদলে দিতে নেই’ নিয়ে হাজির হলেন। সম্পাদক সাহেব পছন্দ করলেন। আমরা কাজে নামলাম, রাইসু ভাই একাধারে কপি রাইটার, আর্ট ডিরেকটর, আবার রাস্তায় ঘুরে মেগা সাইন, বিলবোর্ড খুঁজছেন। এক দিন আমি রাইসু ভাই আর আমাদের হেড অফ অপারেশন সৌরিণদা বনানীর রাস্তায় বিলর্বোডের খোঁজে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সামনে রাস্তা পাড় হচ্ছিল এক তরুণী—সৌরিণদাকে জোরে ব্রেক কষতে হল। তিনি মহা বিরক্ত, রাইসু ভাই তা নিয়ে দু’লাইনে কবিতা বানালেন—”এসডির গাড়ি যে কারণে থেমে গেল… / নিতম্ব থামিয়ে দিল গাড়ি!” সৌরিণদা মহা ক্ষেপলেন, আমি মোবাইলে লিখে রাখলাম। পুরানো মোবাইল সেটে সে কবিতা এখনও আছে।

‘সব কিছু বদলে দিতে নেই’

বনানীতে একটা লোকেশন পেলাম সেই দৈনিকটির বিলবোর্ডের পাশে। আমরা ডিজাইন তোলার কয়েকদিন পরে ক্যাম্পেইন বেশ প্রশংসা পেয়েছে। বনানীর সেই লোকেশন থেকে দৈনিকটি তাদের ক্যাম্পেইন তুলে নিল। রাইসু ভাইর বিজয়—তিনি মুচকি হাসলেন, তেমন কিছু বললেন না।

বিডিনিউজের দিনগুলো ছিল মজার। রাইসু ভাই অনেক প্রজেক্টে কাজ করছেন। সম্পাদক সাহেবও তাকে পছন্দ করেন। হঠাৎ একদিন দেখলাম অনেক বই নিয়ে কয়েকজন কম্পোজারকে নিয়ে ই-বইয়ের প্রজেক্ট শুরু করেছেন। কাজটা আমার পছন্দ ছিল না, ভাবলাম এসব থেকে রেভিনিউ আসবে না। তবে সেগুলিই ছিল সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের প্রথম ই-বুক। ‘পাগলা দাশু’, ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘রূপসী বাংলা’ এ রকম ১০/১২টা বই সেই প্রজেক্ট থেকে বেরিয়েছিল। তারও আগে আর্টস পেইজে ডিজিটাল আর্ট গ্যালারি করেছিলেন। সেখানে সব একজিবিশনের ছবি থাকত।

অনেক আগেই রাইসুর কবিতার সাথে আমার পরিচয়, যতটা মনে পড়ে কবি শহীদুল্লাহ সিরাজীর সুবাদে। তার কবিতা তখন থেকেই আমার প্রিয় ছিল, তবে তার সাথে পরিচয় হবার পর আমাকে আলোড়িত করেছে তার চিন্তা করার পদ্ধতি।

বিকল্প চিন্তার তার ক্ষমতা ছিল সহজাত। যুক্তিবিদ্যার ছাত্র হিসেবে আমার বিশ্বাস ছিল প্রত্যেক বস্তু, দৃশ্য, জ্ঞান বুঝবার, জানবার, উপলব্ধি করবার বিকল্প উপায় আছে। রাইসু তা সহজেই বুঝতে পারে। তার বিকল্প চিন্তাপদ্ধতি ছিল যৌক্তিক, নিঁখুত এবং অর্থডক্স। পাঠ্যবইয়ের চিন্তাপদ্ধতির মতই তা লজিক্যালি প্রমাণ করা যায়।

রাইসু আমার চিন্তার শৃঙ্খলমুক্তির কাজ করেছেন। বাংলা জ্ঞানচর্চার ইতিহাস রাইসুকে বাদ দিয়ে করা যাবে না। বাংলায় যুক্তিবিদ্যা চর্চায় সে পথপ্রদর্শক। তার বিকল্প চিন্তাপদ্ধতি কিন্তু অ্যান্টিলজিক নয়, তা আসলে লজিকই। আজকের উত্তর অাধুনিক দর্শনে সত্যের বহুত্বের যে ধারণা তাই রাইসুর বিকল্প চিন্তা।

রাইসুর সাথে প্রতিদিন দেখা হয়। কাজের ফাঁকে আড্ডা দেই, কখনও কাজ আর কাজ। প্রাত্যহিক মেলামেশায় জানতে পারি একান্ত রাইসুকে। তার ব্যক্তিত্ব দৃঢ় এবং সাহসী। সত্য বলাটা তার মত সহজাত আর কারও কাছে দেখি নি। তার বিশ্বাসে সে অকপট। ফলে রাইসুর কোনো মুখোশ নেই, ভেতরে-বাইরে সমান। বিডিনিউজের ব্লগ সাইট তৈরির সময় দৃকের সাথে কাজ করতে গিয় আমি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। সহজ ভঙিমায় নাকচ করে দিয়েছেন অনেককে।

আজকাল রাইসুর সাথে আর দেখা হয় না, ফেসবুকে তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হই। বিডিনিউজে পাঠ চুকালে তার বাসায় একদিন গিয়েছিলাম, ডার্ক চকলেট দিয়ে আপ্যায়িত করেছিলেন। তিনিও বিডিনিউজ ছেড়েছেন তারও আগে। বলছিলেন তার ঘর-গৃহস্থালির কথা, কী ভাবে রান্না হয় সে সব।

আরও পরে ফোনে একদিন তাকে চাকরির অফার দিয়েছিলাম, তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও তার অর্থকষ্ট ছিল। তার অর্থকষ্ট আছে কিন্তু চিন্তার দীনতা নাই।

Facebook Comments
More from রাশেদ আহসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *