জার্নি টু দ্যা লাস্ট পোয়েট

আমি বুইঝা গেছিলাম আমি সময়ের সব থেকে গ্ল্যামারাস, ক্যারিশমাটিক ম্যানিপুলেটরকে দেখতেছি।

রাইসুর সাথে পরিচয়ের অনেক আগে, আমি যখন রংপুরে আমার বাম রাজনীতির লেফট রাইট আর সাহিত্য অনুশীলন করতেছিলাম, রংপুরের টাউন হলে কয়েকটা গোষ্ঠীর কাছে উদীয়মান প্রগতিশীল তরুণ হিসেবে দলে টানার জন্য বেশ কয়জন সাহিত্য/রাজনীতির আঞ্চলিক কুতুবের সাথে পরিচয় হয়।

আমার স্কলার হবার প্রতি মধ্যবিত্ত অ্যাট্রাকশন তখন থেকেই ছিল। আর ছিল তীব্র নারীলোলুপতা। এই জায়গায় ছিল টানপোড়েনটা। ঐ বয়সে মেয়েরা পাণ্ডিত্যের থিকা শিল্পের প্রতি বেশি পক্ষপাত রাখে। তখন আমার কাজ হইল ‘গুরুত্বপূর্ণ’ লোকজনের কাছে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হওয়া। তো বাংলার শাশ্বত স্যার (ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য)—যারে গুরুত্বপূর্ণ লাগছিল, তিনি আমারে প্রশ্রয় দিছিলেন, ঐ মাস এক দুইয়ের সম্পর্ক আর কি।

রাইসুর কবিতার বইয়ের নাম শুইনা মনে হইছিল এ তো সাহিত্যের নামে ফাইজলামি। আমি তখন কডওয়েল—সাহিত্য আমার কাছে সমাজ বদলের হাতিয়ার। আর হ্যাঁ ঐসময়, কামরুজ্জামান কামু ভাই ছিলেন রংপুরের বিস্ময়। কামু ভাই এর প্রভাব এখন রংপুর টাউনহল এখনো কি কাটাইতে পারছে? প্রায় এক দশক আগে চইলা আসছি, তবে তা লঘু হইলেও হইতে পারে, কিন্তু প্রভাব যে না রইয়া থাকতে পারে না।

ফারুক আব্দুল্লাহ

মফস্বল শহরগুলোতে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করে—যেমন জেমসের বেশ কিছু গানের গীতিকার আসাদ দেহলভী, আমার নানাবাড়ি সূত্রে পরিচিত—তাকে নিয়ে নজরুল সুলভ কন্সপায়রেসি থিওরি অনেক। তো শাশ্বত স্যার কথায় কথায় বললেন, রাইসুরটা হয় না, কামু হইতে চাইলেই হওয়া যায় না। এটা সম্ভবত কামু ভাইয়ের প্রতি তীব্র ভালোবাসায় বলা—এবং মফস্বলের নিজের সন্তানকে আন্ডাররেটেড দেখার ক্ষোভ থিকাও বইলা থাকতে পারেন।

শাশ্বতরে আমার অনেক পছন্দ ছিল, পছন্দ থাকাথাকি অবস্থায় যেহেতু যোগাযোগ বন্ধ হইছে, তাই উনার শত্রুপক্ষ উনার শান্তিনিকেতনের স্ক্যান্ডাল নিয়া আমারে অনেক কিছু কইলেও কান ভারি হয় নাই আর। সুতরাং রাইসু সম্পর্কে শিল্পের জন্য শিল্পের বিরোধী মার্ক্স এবং ফ্রয়েড স্বাক্ষর ফারুক আব্দুল্লাহ রাইসু নিয়া আর অবকাশ পায় নাই।

আমার সাহিত্যিক সম্ভাবনার অবনমন ঘটে বাংলা ব্লগ টাইমে। আমি সহলেখকদের—কন্টেন্টের না—জেশ্চারের সাথে তাল মিলায় গেলাম। মফস্বলের সাহিত্য হীনম্মন্যতার কারণেই ব্লগে আশ্রয়। নর্থ সাউথ থিকা সাহিত্য কেবলা যানজটের কারণে ক্রমশ দূরে সইরা যাইতে থাকলে যা হয়ই। পরে ব্লগ ক্লান্তিকর লাগতেছিল।

সেই সময় আমি রাইসুকে তার পত্রিকায় অনুবাদ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে ইনবক্স করছিলাম। ঐ সূত্রেই পরে সাক্ষাৎ।

উনি তখন স্কয়ার হাসপাতালের সাথে লাগোয়া একটা উঁচা বিল্ডিংয়ে থাকেন। উনার একটা কবিতা ছিল, রাতের বেলায় স্কয়ার হাসপাতালে সব মৃত্যু রাতে হয় আর একদিন একটা লোক “মা” “মা” কইরা কানতেছে—ঐ বারান্দায় দাঁড়ায় আমার মনে হইছিল আমি যেন দৃশ্যটা চিনি। আমি সিগারেট খাইতে চাইলে অন্য একটা বারান্দা দেখায় দিলেন, আমি সিগারেট ধরাইছি, উনি আইসা বললেন আশেপাশের ফ্ল্যাটে মেয়ে-টেয়ে থাকলে ইশারা-টিশারা কইরেন না। আমি একটু অপ্রতিভ হইয়া পড়লে কিছু একটা এক্সপ্লেইন করলেন।

ঐদিন উনার মামার গল্প করছিলেন। রাজনৈতিক মামা। তার মামার রাজনৈতিক শিষ্য মিছিলের সামনের লাইনে আসতে তার মামার বুদ্ধিতে কেমনে পোলাপাইন ভাড়া কইরা অন্য নেতাদের স্যান্ডেল পিছনে পাড়া দিয়া আটকায় কীভাবে নেতাদের পিছায় যাইতে বাধ্য করছিলেন, এবং মিডিয়ার সামনে মিছিলের প্রথম সারিতে জায়গা পাইছিলেন।

ব্যাপারটা তিনি তার আগের দিন শুনছিলেন। এক লোকের সাথে কথাপ্রসঙ্গে পরিচিত হইতে কালে এই কথায় সেই কথায় তিনি এইটা জানছিলেন। আমরা কী খাব এটা নিয়া উনি উনার রান্নার তদারককারির সাথে একটা মিটিং ডাকলেন (উনি স্টেক হোল্ডারদের সাথে সবসময় আলোচনা করেন)। আমি আর কতিপয় অতিথিও সেই মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করছিলাম। এই মিটিংটার ঢংয়ে  কোথায় জানি তার মামা ছিলেন। এত ন্যাচারালি ক্যারেক্টারে উনি ঢুকে যাইতে পারেন! বিস্ময়কর।

‘ইয়ং’দের যেইটা সমস্যা আর কী—দুনিয়ার তাবৎ প্রগতিশীলতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত কবি-লেখকদের ঘায়েল করার চেষ্টা—সেই চেষ্টা রাইসুর সাথে আমার ইনবক্স কিংবা কমেন্ট ঘরে দুই তিনবার কইরাই থাইমা যাইতে হইছে। আমি বুইঝা গেছিলাম আমি সময়ের সব থেকে গ্ল্যামারাস, ক্যারিশমাটিক ম্যানিপুলেটরকে দেখতেছি। আর হ্যাঁ, আমার লেখালেখির জীবনে বিপর্যয় তৈরি কইরা দিছেন উনি।

১৭-১৮ বছর বয়সে যেমন সংবেদনে তিনি লিখছেন তারপর বাংলা সাহিত্যে তেড়ে আসা ‘সতের আঠার’ কনসেপ্টের মায়েরে খালা কইরা ছাড়ছেন। বলা যায় বাংলা সাহিত্যে সুকান্তের ‘আঠার বছর বয়সের’ সমাপ্তি ঘটছে রাইসুতেই, এমনকি আবুল হাসানের আঠাইশও রাইসুর আঠাইশে আইসা সংক্রমণের যৌক্তিকতা হারায় ফেলছে।

রাইসুর আমার লেখার ভাষা নিয়া পর্যবেক্ষণ আমি মৃত ভাষায় লিখি—আমি অভিযোগটা সিরিয়াসলিই নিছি।

রাইসু তীব্রভাবে নাগরিক, শহুরে। তার সামনে বসলে আপনি ঠিকঠাক আপনার এক দুই প্রজন্ম আগের মফস্বলরে নিজের ভেতর আবিষ্কার না কইরা পারবেন না। এইটার সাথে ডিল করাটা মনে হয় ডিফিকাল্ট। অন্তত আমার কাছে তাই লাগছে। তারে বুঝতে চেষ্টা করাটা, তারে ডিফাইন করাটা, তার টেক কেয়ার করাটা উনি নেন না। বিরক্ত হন যথেষ্ট।

পড়ুন: ফারুক আব্দুল্লাহর আরো লেখা

রাইসুর ব্যাপারে আঠারো থেকে একুশের মেয়েদের থিকা ছেলেদের বেশি পজেসিভ মনে হইছে। ব্যাপারটা অনেক মজার। সময়ে সময়ে উনি ভাল কাউন্সিলর। মানুষের কথা মন দিয়া শোনেন।

তিনি সম্পাদক হিসেবে দুর্দান্ত। প্রথম প্রথম আমার মনে হইতো বেশি খুঁতখুঁতে উনি, কিন্তু কাজ শেষ কইরা পরে বুঝতাম এইটা ভাল। আলি মেসের উদ্যোক্তাদের নিয়া একটা লেখা অনুবাদ করছিলাম আমি সাম্প্রতিকে, ইনফরমাল ইংলিশরে কোনো রকম ব্যাখ্যামূলকতা বাদ দিয়াই যে হাজির করা যায় বাংলায়—সেইটা উনার সম্পাদনায় থাইকা ফিল করছি।

আমি সরাসরি “না” বলতে পারতাম না, এইটা নিয়া উনার অবজারভেশন আমারে উপকৃত করছে।

ব্রাত্য রাইসুরে ৫০ এর শুভেচ্ছা। লং লিভ দ্যা গ্রেট রাইসু।

১৪ নভেম্বর ২০১৭

Facebook Comments
More from ফারুক আব্দুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *