তার অংশুমালা ও মূলভূমির ভূভাগ

ব্রাত্য রাইসুর মত আরও কেউ কেউ ছিলেন ও আছেন—প্রিয় সম্পাদক, সে-কারণে আমি নিরুদ্দেশ ও বেপাত্তা হয়ে যাই নি সাহিত্য জগৎ থেকে।

ব্রাত্য রাইসুর ছবিটা চোখের সামনে ভাসলে, তা এক মিষ্টি হাসিমুখের উজ্জ্বলতা নিয়ে উপস্থিত হয়। এটা কেন হয়, সেটার অনেক ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যাবে বা অনেক ক্ষেত্রে যাবেও না! আমার সাথে হয়তো সেভাবে তার মাখামাখি নেই, তবু তার রূপমাধুর্য আমাকে টানে, গভীরভাবে টানে।

আমার চেয়ে বয়সে দশ-পনেরও বছরের মত কম বয়সীদের মধ্যে ব্রাত্য রাইসু দূরবর্তী থেকেও বেশ কাছের মনে হয়, আপন মনে হয়, স্বজন মনে হয়।

এইযে ভালো লাগার সৌন্দর্য কারো কারো জন্য সংরক্ষিত থেকে যায়, সেই জন্য মনে হয়—এই আমি বেঁচে আছি সামাজিক, আরও একটু টেনে নিয়ে বলি এই যে সাহিত্যজগৎ, আর এই জগতের অনেকের সাথে একধরনের সম্পর্কজাত জীবন, তা অনেকটা জীবনেরই আকর্ষণও ধরে রাখে! অনেকের মত আমারও।

গোলাম কিবরিয়া পিনু

ব্রাত্য রাইসুর সাথে অনেক দিন আগেই সাহিত্যের সেলাই করা সুতো দিয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তিনি যখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, তখন সেই দৈনিকটিও ছিল বেশ দীপ্ত, সাহিত্যের পাতাও ছিল সমৃদ্ধ। সেভাবে তেমন পরিচয় নেই তার সাথে তখন, যোগাযোগও নেই, পোস্টে কবিতা পাঠাই, তিনি ছাপেন এবং নিয়মিতভাবে ছাপেন, যতদিন তিনি সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন সেখানে, ধারাবাহিকভাবে আমার কবিতা তিনি ছাপিয়েছেন। পরবর্তীতে প্রথম আলোর সাহিত্য সম্পাদক থাকাকালীন নিয়মিত আমার কবিতা ছাপিয়েছেন মর্যাদার সাথে, তা কীভাবে ভুলি! বিডিনিউজে যখন ছিলেন, তখনও আমার কবিতা ছাপিয়েছেন। এই যে বিভিন্ন বাঁকে ও দীর্ঘ সময়ে আমার কবিতার প্রতি সম্পাদক হিসেবে তার সমর্থন ও ভালোবাসা, সেই কৃতজ্ঞতার ঝাঁপি থেকে আমার এই কিছু অনুভব তার জন্য ও পাঠকের জন্য উন্মোচন করা সমীচীন বলেই মনে করি। জানি, তার সাথে অন্য কোনো সম্পর্ক হেতু আমার কবিতা তিনি ছাপেন নি, এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সৎ ও নির্ভীক।

ব্রাত্য রাইসুর মত আরও কেউ কেউ ছিলেন ও আছেন—প্রিয় সম্পাদক, সে-কারণে আমি নিরুদ্দেশ ও বেপাত্তা হয়ে যাই নি সাহিত্য জগৎ থেকে। সে কারণে ধারাবাহিক ভাবে দীর্ঘদিন ধরে কলমের নিবে আমার কালিও আছে। এই যে ছুটছি , এই যে চলমানতা, এই যে গতিশক্তি—স্থান ত্যাগ করি নি এবং সাহিত্য-ভ্রমণের নামে অর্ধপথে অর্ধনিদ্রা বা পুরোনিদ্রা যাই নি, তা কিন্তু এমন সব প্রিয়জনের কারণেই অনেকটা হয়েছে!

তারই এক সংশ্লিষ্ট পাতায় ব্রাত্য রাইসু তার পরিচয় দিয়েছেন ‘কবি, বুদ্ধিজীবী, চিত্রশিল্পী, সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ও বিদূষক’ হিসেবে। এসব পরিচয়ের মধ্যে ‘সম্পাদক’ পরিচয়টি পরোক্ষভাবে আমরা অনেকে অনুধাবন করতে পারলেও আমি মনে করি ‘সম্পাদক’ হিসেবে তার একটি বিশেষ পরিচয় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। সম্পাদনায় তিনি এখনো সচল ও সৃজনশীল।

কৃতজ্ঞতার গাড়ি থেকে বের হয়ে আর এক পথে গিয়ে ব্রাত্য রাইসুর পরিচয় পাই, তা হলো তার কবিতা। তার কবিতা পড়েছি এবং তা মনোযোগের সাথে পড়েছি। আমার বাসার একটা সেলফে সুনির্বাচিত কিছু কবিতার বই রাখা আছে, শুধু মাঝে মাঝে নয়, সেইসব কবিতার বই আমি নিয়মিত টেনে নিয়ে পড়ি, তার কবিতার বইও আমার সেই সেলফে রাখা। সেখান থেকে তার কবিতার অংশুমালা দেখি, পুষ্পপত্র ও বীজতলাও দেখি, সৌন্দর্যও দেখি!

আমার মনে পড়ে, এ দেশে কবি-লেখকদের মধ্যে ইন্টারনেটভিত্তিক আধুনিক যোগাযোগ, সেটা ধরি ফেসবুক ও অন্যান্য, সে ক্ষেত্রে ব্রাত্য রাইসু অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ও আছেন। এদেশে যখন কম্পিউটার ব্যবহার ও ইমেইলের প্রচলন শুরু হয়, সেই প্রথম দিককার জমানায় দেখেছি ব্রাত্য রাইসু আমাদের সাথে শুধু এই নতুন মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেন নি, ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে অংশ নেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ইমেইলে সূত্র দিয়ে তাতে অংশ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। এভাবে তিনি কবি-লেখকদের আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে এক ধরনের পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

দূরবর্তী থেকেও তার প্রতি আমার মুগ্ধতা আছে ও তার কাজের প্রতিও আমার পর্যবেক্ষণ আছে। এই লেখায় তার মূলভূমির কিছু বিচ্ছিন্ন ভূভাগ উন্মোচিত করা হলো মাত্র। না, আমার এখনো বিশ্বাস হয় না, তিনি ৫০ বছর বয়সে উপস্থিত! আগামীতে তিনি তার সৃজনশীলতার পরিধি আরও বিস্তৃত করবেন, সংহত করবেন—এই আশাটুকু শুধু হৃদয়ে নয়, মস্তিষ্কের নিউরণেও পুষে রাখি।

Facebook Comments

গোলাম কিবরিয়া পিনু, মূলত কবি। প্রবন্ধ, ছড়া ও অন্যান্য লেখাও লিখে থাকেন। গবেষণামূলক কাজেও যুক্ত। ইতোমধ্যে তাঁর ২৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গোলাম কিবরিয়া পিনু-এর জন্ম ১৬ চৈত্র ১৩৬২ : ৩০মার্চ ১৯৫৬ গাইবান্ধায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা : স্নাতক সম্মান (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) এবং স্নাতকোত্তর; পিএইচ.ডি. ।
শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর-সহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর সদস্যসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি। দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। পেশাগতভাবে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, কলামলেখা, সম্পাদনা ও এডভোকেসি বিষয়ক কর্মকা-ে যুক্ত থেকেছেন। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিষয়ক সংস্থার সাথে যুক্ত আছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ
১. এখন সাইরেন বাজানোর সময় (কবিতা), ১৯৮৪
২. খাজনা দিলাম রক্তপাতে (ছড়া), ১৯৮৬
৩. সোনামুখ স্বাধীনতা (কবিতা), ১৯৮৯
৪. পোট্রেট কবিতা (কবিতা), ১৯৯০
৫. ঝুমঝুমি (ছড়া), ১৯৯৪
৬. সূর্য পুড়ে গেল (কবিতা), ১৯৯৫
৭. জামাতের মসজিদ টার্গেট ও বাউরী বাতাস (প্রবন্ধ), ১৯৯৫
৮. কে কাকে পৌঁছে দেবে দিনাজপুরে (কবিতা), ১৯৯৭
৯. এক কান থেকে পাঁচকান (ছড়া), ১৯৯৮
১০. দৌলতননেছা খাতুন (প্রবন্ধ), ১৯৯৯
১১. আমরা জোংরাখোটা (কবিতা), ২০০১
১২. সুধাসমুদ্র (কবিতা), ২০০৮
১৩. আমি আমার পতাকাবাহী (কবিতা), ২০০৯
১৪. মুক্তিযুদ্ধের ছড়া ও কবিতা (ছড়া ও কবিতা), ২০১০
১৫. বাংলা কথাসাহিত্য : নির্বাচিত মুসলিম নারী লেখক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (গবেষণা), ২০১০
১৬. ও বৃষ্টিপাত ও ধারাপাত (কবিতা), ২০১১
১৭. ফসিলফুয়েল হয়ে জ্বলি (কবিতা), ২০১১
১৮. মুক্তিযুদ্ধের কবিতা (কবিতা), ২০১২
১৯. ফুসলানো অন্ধকার (কবিতা), ২০১৪
২০. উদরপূর্তিতে নদীও মরে যাচ্ছে (কবিতা), ২০১৪
২১. নিরঙ্কুশ ভালোবাসা বলে কিছু নেই (কবিতা), ২০১৫
২২. ছুঁ মন্তর ছুঁ (ছড়া), ২০১৬
২৩. কবন্ধ পুতুল নাচে(কবিতা), ২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *