নটঙ্কি রাইসু!

আমার সম্পর্ক ভাবনায় রাইসু একটা ক্যাটাগরি তৈরিতে সাহায্য করছে—নির্মোহ, ভণিতাহীন, কিন্তু মায়াময়, টানের সম্পর্ক।

রাইসুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা গোলাম ফারুক ভাইয়ের শেখের টেকের বাসার দাওয়াতে, সেটা ২০০৩ সালের দিকে কোনো এক মাসে, ঠিক মনে নাই। আমি বরাবর বিজ্ঞজনদের ভয় পাই, বিশেষত শাহবাগ কেন্দ্রিক জ্ঞানীদের আরো। বয়স কম ছিল, এদের অধিকাংশের তেজ নেবার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে তখন দিয়ে উঠতে পারেন নাই। জ্ঞান এবং পৌরুষ মিলেমিশে একেকটা তেজস্ক্রিয় বেটা। কিন্তু এদের আপ্রাণ মিঠা আর প্রেমময় হবার বিষক্রিয়া দেখতে দেখতে আমার যৌবন পার হইছে।

আমার মতো নাদান ওই বিজ্ঞজন সভায় কেমনে হাজির হইলাম সেটা ঠিক মনে নাই। আদিত্য (কবির) আর পাপ্পুর (অমিতাভ রেজা চৌধুরী) সঙ্গে পেলা দিতেই যেয়ে থাকবো। আহাম্মকের মতো শাড়ি পরছিলাম আর ষাঁড়ের মাথাওয়ালা ডোকরার মালা। রাইসু মিয়া খানিক পান করছেন ততক্ষণে, সে ঘরভর্তি মানুষের সামনে আমার বেশ নিয়ে কতক্ষণ নটঙ্কি করলেন। ততক্ষণে আমার যাবার সময় হয়ে আসছে, ফলে তেজী পুরুষকুলের মাঝে রাইসুর এই সরল কৌতূহল বা চাপল্য কোনোটাই বাড়তি আগ্রহ তৈরি করতে পারে নাই।

ক’দিন পরে রাইসু দেখি তালপাতার দুইটা পাখি নিয়ে লাফায় লাফায় শাহবাগে ঘুরতেছে এক মুখ হাসি নিয়ে, বাস এই শেষ দেখা আমি জাপান যাবার আগে। তার পরে আর মনে নাই কেমনে আমি কবিসভার চিঠি পাইতে শুরু করলাম।

সিউতি সবুর

আমার কোনো এক বন্ধু জানাইছিল রাইসুর ঈদসংখ্যায় কবিতা বের হইছে, সেইখানে আমার নামের উল্লেখ আছে। খুব ভালো কথা। আমার আপ্লুত হবার কথা, কিন্তু সেইটা তো হইল না। ধন্যবাদ দিতে গিয়ে যোগাযোগ হইল। খুচরা যোগাযোগ আমার একদা গুরু এবং জাপানের বছর খানিক সার্বক্ষণিক সঙ্গী মানসের কল্যাণে বেশি কাজের যোগাযোগে পরিণত হয়। মানসের ঠেলা গুতায় আমার বাংলা লেখালিখি খানিক শুরু হয় এককালে। সেটা বিজয়  কাল, অভ্র তখন জন্মায় নাই। আমার একটা লেখা সমকালে ছাপা হয় বন্ধু বরাতেই। রাইসুর গুতাগুতিতে আমার বিডি নিউজ আর্টস পাতায় লেখা শুরু হয়।  দুটা গল্প আর এবাদের বইয়ের রিভিউ এই হলো আমার সাকুল্যে লেখালিখি।

রাইসুর মতো নাছোড়বান্দা সম্পাদক ছাড়া আর কারো পক্ষেই আমাকে দিয়ে লেখানো সম্ভব ছিল না। এসব ২০০৭ এর দিকে হবে হয়ত। ‘পান্নালালের বাস্তু‘  নিয়ে অনেক আলাপ হৈছিল। রাইসু আমারে নিজ নামে লিখতে পীড়াপীড়ি করছে অনেক। আমিও ঢিট বিশটা লিখলে নিজ নামে লিখব এইসব ধুনফুন করছি। এবাদের লেখা নিয়ে ঠাণ্ডা তর্ক হইছে, রাইসুর আমার লেখা অনেক পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও লেখাটা ছাপছে। ও যখন বিডিনিউজ ছাড়ে তখন আসলেই আমি ভীষণ মন খারাপ করছিলাম। আমার বাংলা লেখালিখি যে রাইসুর কারণেই আর হবে না এইটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। হইছেও তাই। রাইসু বা আমি সচেতন ভাবে সম্মিলিত সাহিত্য করি নাই কখনো। আমার বুদ্ধিজীবিতা নিয়ে ব্যাপক অস্বস্তি আছে। আমি জ্ঞান জাহিরি বা বাতেনি কোনো খাতায় নাম লিখাইতে ইহকালে প্রস্তুত হবো বইলা আমার মনে হয় না।

রাইসু আমার পেশার সঙ্গে যে বুদ্ধিজীবিতাই আসে সেইটা সারাক্ষণ মনে করায় গেছে। আমরা দুইজনে দুইজনের কথা মন দিয়া শুনছি ওই পর্যন্তই। আমরা দুইজনেই কাউরে বিচারের মাপদণ্ডে বসাই নাই।

পিএইচডি গবেষণার কাজে আমি দেশে ছিলাম প্রায় বছর খানেক। আমি তদ্দিনে ঢাকাই বন্ধু সংসর্গ ও তাহা হইতে উৎপাদিত মনোবৈকল্য এবং পেনপেনানি প্রেম নিয়ে প্রায় একটা মীমাংসায় পৌঁছাইছি। আমি ভাইয়া বা সাইয়ার বা রাজনৈতিক সহকর্মীর বাইরে রক্তীয় বা বিবাহ বহির্ভূত নারীপুরুষের সম্পর্কের ধরন কী হইতে পারে বঙ্গু সমাজের প্রেক্ষাপটে সেইটা নিয়ে ব্যাপক ভাবছি। যেইটা পরবর্তী কালে আমার গবেষণার অংশ হয়ে দাঁড়াইছে। মাস্টারি আর গবেষণা ভিন্ন আমার জীবনে যে আর কিছু নাই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না সেইটা বুইঝা ফালাইছিলাম ততদিনে, ফলে মগজ ও কাজের প্রতি হানিকারক সকল আড্ডা সংসর্গ আমি সতর্কতার সঙ্গে এড়ায় চলছি।

আমি সেকাল থেকে একালে একটা ঘাপটি মারা জীবন নির্মাণ করে গেছি। এই কালে যে দু একজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার মধ্যে রাইসু একজন। রাইসুর আর আমার যোগাযোগের ভাষা তৈরি হয়ে গেছিল। আমি যে কোনো রকম প্রেম সম্পর্ক ছাড়াই ওর সঙ্গে থাকতে পছন্দ  করি সে সেইটা বুঝতে খানিক সময় নিছে। কিন্তু আমরা বন্ধুত্বের দাবিও সচেতন ভাবে করি নাই কখনো। আমাদের আগ্রহ নানা ধারায় আলাপে  ছড়াইছে।  রাইসুর প্রতি আমার ভালো লাগার  জায়গা ওর অকপটতা, সাবলীল প্রকাশ। আমাদের কাছে জগতের সকল কিছুই স্বাভাবিক মনে হইত।

রাইসুর মধ্যে পৌরুষের তেজ নাই, আছে তারল্য, খানিকটা সখীভাব, ঐটা আমার আগ্রহের জায়গা। নারীবাদীরা এইটা দেখতে চান না। আমি সকল নারী-পুরুষের মধ্যেই দুইটা সত্তাই খুঁজি, কুইয়ারনেস খুঁজি, কারণ আমার নিজের নারীত্ব নিয়া আমার ঠমক নাই, প্রমাণের কিছু নাই। আমাদের দুইজনেরই কারো কাছে কিছু প্রমাণের তাগাদা ছিল না, এখনো নাই।

স্বামী ইমতিয়াজ ইলাহি ও পুত্র রূহ কায়হানের সঙ্গে সিউতি সবুর, ২০১৭

আমাদের গল্পে নানা জনের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্কের ইতিহাস, ধারণা, মানুষের প্রতি আগ্রহ এবং অনাগ্রহ সমান্তরালে আগাইছে। আমাদের জগতের প্রতি নির্মোহ কৌতূহল হয়ত সম্পর্কের  একমাত্র মিলের জায়গা ছিল। রাইসুর ভাষায় আমি সকল সম্পর্ককে ‘বাৎসল্যে’ নিয়ে যাই, সেইখান থেইকা বেশি দূর আগানো যায় না। অথচ আমরা দুজনেই রঙ্গ করে গেছি  সারাক্ষণ, ঐটাই আমাদের সম্পর্কের ভাষায় রূপ নিছে। আপনি থেকে তুমিতে গেছে সম্বোধন। রিক্সায় ঘুর ঘুর, বেঙ্গল, ম্যাংগোর আড্ডা, বিডিনিউজ, পাঠশালা শেষে রাইসুর ডেরায় হানা দেয়া এক বা দোকা। আমাদের দুজনের ভিন্ন স্বভাব এবং প্রকৃতি একটা আরামদায়ক জায়গা তৈরি করছিল। এইটা গতানুগতিক প্রেম বা বন্ধুত্বের দাবিদাওয়ার সম্পর্ক না, কিন্তু আমরা তো সম্পর্কিত গত চৌদ্দ বছর ধইরা।

আমার সম্পর্ক ভাবনায় রাইসু একটা ক্যাটাগরি তৈরিতে সাহায্য করছে—নির্মোহ, ভণিতাহীন, কিন্তু মায়াময়, টানের সম্পর্ক। রাইসু আমার জন্য একটা আস্থার জায়গা ওর সকল ত্যাড়ামি সমেত, যেইটা আমি এখনো ধারণ করি। রাইসু আমার শ্রেণী নিয়ে, নারীবাদীতা নিয়া নানা রকম খোঁচাখুঁচি করে গেছে। কিন্তু এইটাই রাইসু। খোঁচাখুঁচি করে ওর সারাক্ষণ কৌতূহলের কারণে। সব কিছু আউলায়া বুঝতে যাবার এই নিরন্তর প্রচেষ্টা আমি অনেককে করতে দেখি নাই। ক্ষান্ত  হয় না। অনুভূতির সততা অনেক সহজ না। রাইসু সহজ মানুষ, অন্তত আমার জন্য।

গত ছয় বছরে রাইসুর সঙ্গে আমার দেখা ছয় বার হইছে কিনা সন্দেহ আছে, অথচ একই শহরে থাকি। মাঝে মধ্যে মনে হয়, শরীর নিয়ে চিন্তা হয় কিন্তু যোগাযোগ করা হয় না। রাইসু নিজেকে গুটায় রাখার কারণে না আমার জীবন নিয়ে বুদ্ হয়ে থাকার কারণে সেটা ভাবার অবকাশ হয় না। আমি ছয় বছরে অন্য একটা মানুষ হৈছি, রাইসুও নিশ্চই। তবে রাইসুর কিছু হইলে আমার কসমিক ব্যালান্স এ ঝামেলা হবে এইটা নিশ্চিত।

বি. দ্র: আমি যেকালে সপ্তাহে সাতটা ক্লাস, থেইসেস লেখা নিয়ে দিনরাত এক করে ফেলতেছি, দিনে তিন ঘণ্টা ঘুমাই কিনা সন্দেহ আছে তখন রাইসু আমার ভার্চুয়াল বাকবাকুম দেইখা একটা বেমক্কা কবিতা লিখছিল ‘সিস’ নামে, সেইটাও যোগ করলাম:

কুশল যেন বা তার কাছে এসে একটি অধিক কাজ
-এ পরিণত
এমন মুগ্ধতায়
থাকে যে মেয়েটি সে রাশহালকা জগজ্জটিলা এখন সিঙ্গাপুরে
সকলে যা করে ঠিক তাই তাই করে।

(কভার ছবি.  গুলশান ২ এর বিটার সুইটে . ছবি তীব্র আলী, জুলাই ২০১১)

Facebook Comments
More from সিউতি সবুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *