নিঃসংকোচে কথা বলা সহজ নয়

তিনি জানেন ভিন্নমতকে কীভাবে উসকে দিতে হয় আর তা থেকে কীভাবে শিক্ষা নিতে হয়।

রাইসুর সাথে আমার পরিচয় হয় শাহবাগে, আজিজ সুপার মার্কেটে। বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করতেন তখন। ওঁর লম্বা লম্বা দাঁত, তারমধ্যে দুটো আবার একে অপরের উপর চড়ে বসেছে। হাসলে বেশ সুন্দর দেখায়। গালে টোল খাওয়ার ব্যাপারটা ওঁর হাসির সাথে দারুণ মানায়। আমি আকৃষ্ট হই। তবে তা মেয়েদের মতো করে নয়। সাধারণত প্রথম দর্শনে ভালো না লাগলে আমি কারও সাথে মিশতে চাই না। রাইসু এক্ষেত্রে আমার উপর দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে বসে।

তারপর দেখা হয়েছে শাহবাগে, একুশের বইমেলায়, প্রথম আলো অফিসে আর রাইসুর বাসায়। আমার কবিতাও ছাপিয়েছেন বাংলাবাজার আর প্রথম আলো পত্রিকায়। সম্পাদক হিসেবে ওঁর জুড়ি মেলা ভার। তাই সে আমার কোনো কবিতা ছাপলে আমি খুশী হতাম।

আবদুর রব

২০০৩ সালে রাইসু কবিসভা চালু করলে তাঁকে চিনি অন্য এক মানুষ হিসেবে যিনি সমালোচনাকে করেছেন মহান। তাঁর সাথে তো বটেই, সুমন রহমান, ইমরুল হাসান, মজনু শাহ, সেজান মাহমুদসহ আরও অনেকের সাথে আমার প্রায়ই তর্ক বেঁধে যেত। অবারিত সমালোচনার পর শাহবাগে দেখা হলে সেই হাসিমুখ আর আন্তরিকতা। যেন কিছুই হয় নি। তিনি জানেন ভিন্নমতকে কীভাবে উসকে দিতে হয় আর তা থেকে কীভাবে শিক্ষা নিতে হয়। রাইসুকে যারা সমালোচনা করেন তারা যদি এই কথাটা বুঝতেন তবে তাঁকে ফরহাদ মজহারের চেলা কিংবা জামাতী বলে গাল শুনতে হত না ।

আজকের সমাজে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তার গায়ে একটা লেবেল মেরে দেওয়া হয়। তারপর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা যায় তাকে। শারীরিক মানসিক নির্যাতন করা যায়। রাইসু যেন এরকম একটি অধঃপতিত সমাজের কথা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। কবিসভাকে তাই তিনি যেন সমালোচনাসভা করে তুলেছিলেন।

নিঃসংকোচে কথা বলা সহজ নয়। রাইসুর কাছে এটা কোনো ব্যাপারই না। আমি যখন অনলাইন পত্রিকা সাহিত্য ক্যাফে চালু করি তখন ওঁকে লিখতে বলায় আমার মুখের পরে বলে দিল এই পত্রিকার মান ওঁর কবিতা ছাপার উপযোগী নয়। আমার রাগ হয়েছে আবার তা মিটেও গেছে। আমিই তাতে জল ঢেলেছি।

আমার লেখালেখি সম্পর্কে একবার বলে বসল, “আপনি লিখে আগে পরিচিত হতে চান তারপর প্রথাবিরোধী লেখা লিখতে চান—এটা ঠিক না।” রাগে আমার গা-পিত্তি জ্বলে গেলেও বন্ধুত্ব ত্যাগ করার কথা ভাবি নি কখনও।

তো এই আমাদের রাইসু। ওঁর ভাষাজ্ঞান দেখলে অবাক হতে হয়। সবাই যখন অপ্রমিত থেকে প্রমিত ভাষার দিকে যাত্রা করেন ওঁর তখন উল্টোযাত্রা। প্রমিত থেকে অপ্রমিতের দিকে।

ওঁর কবিতা ব্লেডের মতো ধারালো। নিকানোর পাররার মতো স্বচ্ছ এন্টি কবিতা। নতুন কবিতা। ধ্বনিময়। গীতল গদ্যভাষায় লেখা। সে ভাষা অনেক পড়তে পারে না । তাতে ওঁর কী যায় আসে?

 

(কভারের ছবি. স্ত্রী রওশন আরার সঙ্গে কানাডার নায়াগ্রায়।)

Facebook Comments
More from আবদুর রব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *