ব্যক্তিগত ব্রাত্য রাইসু

ব্লগিং করতে করতে ব্রাত্য রাইসুর লেখা পড়তে থাকি। আমি দেখলাম রাইসু একটা অশান্তি।

আমার বড় চাচা সেলিম আল দীনের সাথে তার কিম্বা বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে আমার দিক থেকে আলোচনার প্রস্তাব আমি তেমন রাখি নাই। মাঝে মাঝে হয়ত জানতে চাইতাম অমুক ভাল বা তমুক কেমন। আমি তখন মূলত রাজনীতি করতাম। আমি মনে করতাম, উনি ‘বুর্জোয়া ঘরের লেখক’। মনে হয় লিও ট্রটস্কি পড়ে এমন একটা থিওরি মাথায় জাঁইকা বসছিল।

কিন্তু চাচা স্নেহবশত আমার লগে বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যের আলাপ পাড়তেন। ওনারে আমি না পড়লেও তখন অবজারভ করতাম। ওনার একটা নাটক ‘নিমজ্জন’ লেখার পর দেখলাম খুব অস্থির। আমারে বার বার বলতেছিলেন, মানুষ বলে আমার সাহিত্যে রাজনীতি নাই। কিন্তু ‘নিমজ্জন’ পড়ে তাদের ভুল ভাঙবে। এই বই লেখার পর হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা হয়। সেলিম আল দীন আমারে বলতেন, দ্যাখ আমার নিমজ্জনে অধ্যাপক মারার ঘটনা আছে। আমারে এও বলতেন যে, তোদের মার্ক্সবাদকে কীভাবে ব্যঙ্গ করেছি পড়ে দেখিস।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

কিন্তু উনি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি ওনার কোনো লেখা পড়ি নাই। সেলিম আল দীন আমারে বিভিন্ন সময়ে তার পছন্দের কবি, বুদ্ধিজীবীদের নাম বলতেন। যেমন আহমদ ছফা, মনে হয় ওনার ‘কেরামতমঙ্গল’ দেখতে বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চে গেছিলেন। বের হওয়ার সময় খুব প্রশংসা করছিলেন। চাচা আমাকে ফরহাদ মজহারের বিষয়েও তার উচ্চম্মন্যতার কথা জানাইছিলেন। একদিন কী কারণে যেন ব্রাত্য রাইসুর নামও বলছিলেন আর সেটা ভাল অর্থে। হয়ত কেউ তারে জিজ্ঞেস করছিল, বা আমিই, এখন ঠিক মনে নাই।

সেটাও প্রায় দুই হাজার ছয়-সাত এর দিকে। তারপর আর বেশিদিন সেলিম আল দীন বাঁচেন নাই। উনি চলে যাওয়ার পর যেটা ঘটল আমার মধ্যে, আমি উনি যাদের গুরুত্ব দিতেন তাদের বিষয়ে ভাবতে ও পড়তে থাকলাম। ওনারেও। এর মধ্যে আমার যেমন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্‌, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমার কিছু কিছু পড়া ছিল আগেই। আহমদ ছফা বা ফরহাদ মজহারও। ব্রাত্য রাইসুর নামটা আমি তার লেখা পড়েই নিশ্চয় জানি। ছাপার হরফে তার কবিতা পড়েই বোধহয়। কিন্তু চাচার মৃত্যুপরবর্তী প্রতিক্রিয়া হিসাবে এই কয়টা নাম আমার চিন্তার মধ্যে ছিল। যদিও উনি, ব্রেখট, মায়াকোভস্কি, গ্যাটে, দান্তে, দস্তয়ভস্কি, ফেরদৌসি এদের নামও বলছিলেন। কিন্তু এসব কমবেশি আমি পরেও খুব একটা পড়ি নাই। এর কারণ আমার আগে থেকেই ‘বিদেশী’ সাহিত্য পড়ার বিষয়ে একটা রাজনৈতিক আপত্তি। যদিও আমার পূর্বাবস্থার একটা আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সেখানে ব্রাত্য রাইসু কীভাবে ইফেক্ট করছেন তা বলতে এই লেখাটা লেখতে বসলাম।

আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে বেকার। বাসায় বসে বসে দিনরাত ব্লগিং করি, ঘুমাই আর বাপের প্যানপ্যানানি শুনি। বাসা মিরপুর। হাতে কিছু খ্যাপের টাকা আসলে বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটাই। আমার মধ্যে লেখালেখির বিষয়টা তখন পোক্ত। ব্লগিং করতে করতে ব্রাত্য রাইসুর লেখা পড়তে থাকি। আমি দেখলাম রাইসু একটা অশান্তি। উনি এমন একটা চিন্তা হাজির করেন ব্লগারদের সামনে যেটা হয়ত তাদের একটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয়, তারা ফাঁপা একটা অনুভূতি ফিরা পান। আমার ক্ষেত্রে যদিও এমনটা ঘটে নাই। আমি হয়ত তার মধ্যে দিশা খুঁজে পাইছি বা উৎসাহ পাইছি।

তবে রাইসুর লগে আমি জড়ায়ে গেলাম প্রথম আলো ব্লগে চাকরি করতে এসে। আমি মাঝে মাঝে রাইসুর লেখা স্টিকি করতাম। সেটা সবার শুরুতে ঝুলে থাকত। আর ব্লগারদের উষ্মার মধ্যে পড়তে হইত আমারে। একবার রাইসু কী যেন একটা সাক্ষাৎকারের বই করবে। বইমেলার আগে আগে, আমি সেটাও স্টিকি করলাম, যেহেতু আমি অন্যদের বইও স্টিকি করতেছি। তো ব্লগারদের সেটা পছন্দ হইল না, আমি যুক্তি দিলাম, আপনাদের বইও তো করি।

আমার দিক থিকা সমাজ ভাঙার জন্য রাইসুরে ব্যবহার করতে চাইতেছিলাম আর কি। হয়ত সেই বছর বা পরের বছর রাইসু ভাইয়ের লগে আমার প্রথম পরিচয়—সেটা ঠিক মনে নাই। ২০১৩ সালের কথা মনে আছে। আমি, আমার তখনকার সহকর্মী শাম্মী হক, পরে বড় নেতা আর তার এক বান্ধবী ঘুরতেছিলাম বইমেলায়। বহেরা তলায় রাইসু ভাই দেখি একা বইসা আছেন। আমার লগে দুইটা মাইয়া দেইখা মনে হয় ডাক দিলেন, এই আপনে সালাহ উদ্দিন শুভ্র না। আমি বললাম, হুঁ। কী ফাঁসি ফাঁসি করতে আসছেন। আমি বললাম, না আমি জিয়া হাশানের লগে আসছি। এরপর শাম্মীগো লগে তার পরিচয় হইল। শাম্মীর লগে রাইসু ভাইয়ের ফাঁসি-সংক্রান্ত কী একটা বাজিও ধরাধরি হইছিল। এরপর আমাদের আড্ডায় আরও কারা কারা জানি আসল, মনে হয় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও, মাহবুব মোর্শেদ, সাখাওয়াত টিপু।

ব্রাত্য রাইসুর প্রতি আমার শুরুর দিকে একরকম আগ্রহ, কৌতূহল, রাজনৈতিক ঐক্য টের পাইতাম। আমি তার ফলোয়ারে পরিণত হইছিলাম। তার লগে পরিচয়েরও আগে বাংলা সাহিত্যে আমি তার লোক হয়ে গেছিলাম। সেগুলা অনেক আগের কথা। তখন মনের মধ্যে রাইসুবিষযক একটা উত্তেজনা ছিল। উনি আমাদের সময়ের মিথ। তারে নিয়া নানা মুখে সদা নানা আলোচনা।

প্রথম সাক্ষাতের পর রাইসু ভাইয়ের লগে আরও অনেক দেখা হইছে। সেটা পরের আলাপ। প্রথম দেখার আগ পর্যন্ত সবকিছু ভিন্নই থাকে সব সময়!

Facebook Comments
More from সালাহ উদ্দিন শুভ্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *