ব্রাত্য রাইসুর রাজনৈতিক গুরুত্ব

রাইসুকে আমি সব সময় সমর্থন করি, তার বিষয়ে পক্ষপাত করি মূলত মানুষের অধিকার প্রশ্নে তার মধ্যে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা, অস্বচ্ছতা ও কাপুরুষতা দেখি নি বলে।

কবি ব্রাত্য রাইসু পঞ্চাশ বছরে পা রাখতে যাচ্ছেন। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝলে বাংলাদেশে রাইসুর রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে।

অনেক বৃদ্ধ প্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের মধ্যেই দেখা যায় ব্যাপারটা, তারা ব্রাত্য রাইসুকে একজন ইয়ং বা তরুণ মনে করে তার চিন্তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করেন। এখন রাইসুর বয়স পঞ্চাশ হয়ে যাওয়ায় তাদের চালাকিটা ভালো মতোই ধরা খাবে।

মানে আমাদের সময়ের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীকে তরুণ সাব্যস্ত করে তার চিন্তার গুরুত্বকে লঘু করে দেওয়ার আলগা ব্যাপারটার প্রতি অনেকটা কম নির্ভরশীল থাকবেন কায়েমি স্বার্থবাদীরা।

খোমেনী ইহসান

এটাও এদের চালাকিই বটে। কারণ তারা এমন কিছু করতে চান না যাতে অন্ধ তরুণ অনুসারীদের মনে তাদের বিবেচনার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হয়। বরং সব সময় ঠিক কথা বলেন, এই ভঙ্গিটা ধরে রাখতে তারা এখন রাইসুর চিন্তার বিষয়ে কিছুটা সমীহ বরাদ্দ করবেন।

এতটুকুতেও আমি আশাবাদী। এবার অন্ততঃ বয়সের কারণে হলেও লোকজন রাইসুর চিন্তার গুরুত্ব স্বীকার করুক। বিশেষ করে তরুণরা ভাবুক, পঞ্চাশে পা রাখতে যাওয়া রাইসু আরও অনেক বছর আগে থেকেই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য জরুরি সব দরকারি চিন্তা করছেন।

২.
রাইসু ভাইয়ের তিনটা ব্যাপার রাজনৈতিকভাবে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

এক. বিদ্যমান সমাজের নৈতিকতা, ভদ্রতা, ঔচিত্যবোধের বাটপারিকে প্রশ্ন করা।

দুই. প্রমিত বাংলার নামে ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা।

তিন. মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতাসহ মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে আপসহীন দৃঢ় অবস্থান।

আমাদের সমাজে প্রচুর ভালো মানুষ, ভদ্রলোক, নীতিবানদের দেখা যায়। সমাজের কায়েমি স্বার্থবাদী চিন্তা, বোধবুদ্ধি, সংস্কৃতি নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন নাই। তারা বেইনসাফি, জুলুম আর শোষণের মধ্যেও নৈতিকতা, ভদ্রতা, ঔচিত্যবোধের মিথ্যা কথাগুলান বলে যান অবলীলায়। এর মধ্য দিয়ে এই বাটপাররা প্রকৃত প্রস্তাবে বেইনসাফি, জুলুম আর শোষণকেই সমর্থন করেন। রাইসু তার অসাধারণ বুদ্ধিজীবিতা দিয়ে এই সব বাটপারিকে এতটা সরাসরি কুপোকাত করেন, যা তুলনা বিরল।

এদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেই যে ব্রিটিশের হাত ধরে ঔপনিবেশিকতার দালালেরা আমাদের ভাষা তথা চিন্তার ওপর যে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য তৈরি করেছে তার থেকে মুক্তির বিষয়ে এখানে কোনো আলাপ নেই। উল্টা প্রমিত ভাষা অনুসরণে মানুষকে বাধ্য করতে পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলা একাডেমি, পাঠ্যপুস্তকবোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদ মাধ্যম ও দালাল শিক্ষাবিদেরা ক্রমাগত ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে রাখতে চেষ্টা করছেন। এর মধ্যেই সবচেয়ে জোরালো ভাবে ব্রাত্য রাইসুই ভাষার প্রশ্নকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রশ্ন করে তুলেছেন। এ প্রশ্নকে তিনি দার্শনিকভাবে এতটা প্রবল করেছেন যে এটি এখন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য অনুপেক্ষণীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে বলা যায়।

দেখা যাচ্ছে রাইসুর ভাষা প্রশ্নকে ঘিরে আমাদের এতদিনকার সাহিত্য, উপনিবেশবাদী বুদ্ধিবৃত্তির গোমর নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

রাইসুকে আমি সব সময় সমর্থন করি, তার বিষয়ে পক্ষপাত করি মূলত মানুষের অধিকার প্রশ্নে তার মধ্যে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা, অস্বচ্ছতা ও কাপুরুষতা দেখি নি বলে।

সম্ভবত বাংলাদেশ তার সবচেয়ে বড় সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে একুশ শতকের প্রথম দুই দশকে। এই সময়ে আমাদের সমাজে যেভাবে বিরোধী মতের মানুষদের প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে ঘৃণা ও নির্যাতন করা হয় তা এই জাতির মধ্যে আগে এতটা বিস্তৃতি লাভ করেছে কি না সন্দেহ রয়েছে। এখানে অপছন্দের লোকদের বিরোধিতাই না শুধু তাদের সামাজিক-ব্যক্তিগতভাবে বর্জন থেকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়। ফলে বাংলাদেশে মানবাধিকার হরণের ঘটনা সমাজের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো যারা পেশাদার মানবাধিকার কর্মী, যারা নিরপেক্ষ ও সাহসী বুদ্ধিজীবী, তাদের পর্যন্ত মানবাধিকার প্রশ্নে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রে দলমতের বিচার করতে দেখা যায়। কিন্তু ব্রাত্য রাইসু মানবাধিকার প্রশ্নে সব সময় আপসহীন দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন।

৩.
রাইসুকে বিচার করতে হলে আমাদের দুইটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে:

ক.বাংলাদেশ গণতন্ত্রের জন্য এত লড়াই সংগ্রাম সত্ত্বেও এখানে নয়া ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে মূলত স্বাধীন মত প্রকাশের প্লাটফর্ম ব্লগকে কেন্দ্র করে।

একদল শিক্ষিত তরুণ, যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, চিকিৎসা, গান, শিল্পকর্ম, বিজ্ঞান চর্চা ইত্যাদি সফট কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষ ব্লগিং করতে এসে বিরোধী মতাদর্শ, দর্শন, রাজনীতি বা সংস্কৃতির লোকদের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। দলবদ্ধভাবে একেকটা মানুষের ওপর হামলে পড়তেন তারা। তখন যেসব মানুষ এই ফ্যাসিস্ট খাসিলতকে প্রশ্ন করেছেন এবং ভিক্টিমদের সাহস যুগিয়েছেন, বন্ধুত্বের দৃঢ় বন্ধন প্রসারিত করেছেন তাদের মধ্যে প্রধানতম হলেন ব্রাত্য রাইসু।

খ. শাহবাগে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্তদের ফাঁসি দাবির আন্দোলনের বিরুদ্ধে হেফাজতে আন্দোলন বা আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কথা বলেছেন বলে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নাই যে তারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেছেন। তারা বরং ধর্ম ও রাজনীতির প্রশ্নে শাহবাগ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তাদের প্রশ্ন ছিল না।

এই যে ফরহাদ মজহার, বদরুদ্দিন উমর বা নুরুল কবিরের মতো বুদ্ধিজীবীরা রয়েছেন, তারা পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে একটা শব্দ বলতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কিন্তু এই সময়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন মরহুম ড. পিয়াস করিম ভাই, ব্রাত্য রাইসু, মাহবুব মোর্শেদ ও সালাহ উদ্দিন শুভ্র। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি, বড় বড় মিডিয়া, প্রভাবশালী নাগরিক সমাজ বা আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকারের মতো মানবাধিকার সংস্থাও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বললো না, তখনও মৃত্যুদণ্ডবিরোধিতা বজায় রাখা মানবাধিকারের প্রশ্নে সবচেয়ে ঐতিহাসিক সাহসের পরিচায়ক। আর এই অবস্থান বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতাকে অবশ্যই এমন এক মানদণ্ডে হাজির করে, সময় মতো যার মাপে এ কয়জন ছাড়া বাকিরা ফেল মারছে।

এখন কথা হলো কিছু শব্দ আর বাক্য মিলিয়ে ফটর ফটর করার বুদ্ধিজীবিতা-দার্শনিকতা-ভাবুকতা আর একটা মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ফ্যাসিস্ট খুনে কারবারের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষের অধিকার মর্যাদার পক্ষ নেয়া কাজ এক নয়। বরং আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের ক্রিটিকাল সময়ে রাইসু ভাই তার পক্ষপাতকে যেভাবে তার ইউনিক চিন্তা ও দর্শন দিয়ে হাজির করেছেন তা অসামান্য।

৪.
মজার ব্যাপার হলো, নিরপেক্ষতার ভাণ না করে সবচেয়ে জটিল সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে থাকার চাপ উপেক্ষা করেও এই সমাজ-রাষ্ট্রে ব্রাত্যদের অধিকারের পক্ষে কথা বললেও ব্রাত্য রাইসুই এখন পর্যন্ত সেই সব বিরল বাংলাদেশীদের একজন যিনি সত্যিকারের নির্দলীয়, রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত!

৫.
ব্রাত্য রাইসু যেসব প্রশ্ন রাখছেন তা আমাদের সমাজের লাখো কোটি মানুষেরই প্রশ্ন। কিন্তু তারা জানেন না কীভাবে প্রশ্নটি হাজির করবেন এবং ছুড়ে মারবেন। রাইসু এর পথ বাতলে দিচ্ছেন। তিনি দেখিয়েছেন এই সমাজ-এই বিদ্যমানতা-এই কায়েমি স্বার্থবাদকে কীভাবে গভীর গোপন জায়গায় গিয়ে প্রশ্ন করে উপড়ে ফেলতে হয়।

৬.
ব্রাত্য রাইসুর চিন্তা পরিপক্ক ও সবল। ফলে রাইসুকে তরুণ বলার সুযোগ নাই। আবার সমাজ যদি তার প্রশ্নগুলোকে অতিক্রম করে যেতে পারে, তখনই হয়তো তার চিন্তা বুড়িয়ে গেছে বলা যেতে পারে। তার আগে পর্যন্ত রাইসু আমাদের সময়ে প্রাজ্ঞতায় সবচেয়ে পরিপূর্ণ চিন্তক হিসেবে হাজির আছেন। ফলে তারমধ্যে একটা চিরকালীন তারুণ্য আমরা দেখছি।

৭.
শুভ জন্মদিন রাইসু ভাই, ভালোবাসা!

১৩ নভেম্বর ২০১৭
Facebook Comments
More from খোমেনী ইহসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *