ব্রাত্য রাইসু, গুছিয়ে এলোমেলো চিন্তা করা একজন দার্শনিক অক্টোপাস

ব্রাত্য রাইসুকে যারা অনুসরণ করে তাদের মধ্যে আমি যা দেখি—এক, নিজেদের আপেক্ষিকভাবে বুদ্ধিমান মনে করা; দুই, নিজেকে অ্যানার্কিস্ট ভাবা।

যদি এমন হতো কোনো বই নিয়ে লিখছি, খুব সহজেই লিখে ফেলা যেত মুখস্থ কথা আর ইজমের ধোঁয়াশা যুক্তি। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে লিখতে যাই, মনে হয় একটা অক্টোপাসকে নিয়ে লিখছি যার কেবল মাথাতেই বুদ্ধি থাকে না, বরঞ্চ থাকে সমস্ত শরীরে। এমনকি যে রঙ সৃষ্টি করে নিজেই হারিয়ে যায় রঙিন মানুষের মতন। রঙিন মানুষ মানে যে সব রঙ ও রঙ্গ চেনে কিন্তু নিজে সম্পূর্ণ সাদা কালো।

আমার কাছে ব্রাত্য রাইসু এরকম রঙ আর রঙ্গ চেনা একজন নিপাট সাদা কালো মানুষ।

দুই থেকে তিন বছর আগে আমি মানুষের মধ্যে ডেঞ্জার জোন খুঁজতাম। যাদের মধ্যে পেতাম না, মনে হতো ওদের মধ্যে কোনো গল্প নেই।

তাসনুভা অরিন

আমি সব সময় ট্রাপিজিয়াম প্রকৃতির মানুষ পছন্দ করি। ব্রাত্য রাইসু আর যাই হোক বর্গ অথবা আয়তক্ষেত্র না আর এই জন্যই লিখছি।

জ্যামিতিতে আটকে পড়লে মানুষ আর মানষ থাকে না, হয়ে যায় সামাজিক, সাংসারিক আর রাজনৈতিক। ব্রাত্য রাইসু এরকম জ্যামিতিক মানুষ না বলেই আমি তাকে নিয়ে লিখছি। ব্রাত্য রাইসু সবচেয়ে বেশি সাংসারিক, সামাজিকও আর রাজনৈতিকও।

তা না হলে তার সাথে মিশে যাওয়া যেত না। সে সহজে সহজ, কঠিনে কঠিন। তাকে বুঝতে চাইলে বোঝা যায় সহজে, আর না বুঝতে চাইলে তর্কে তর্কে তাকে কঠিন করে ফেলা যায়ও সহজে।

সে নিজেকে যা বোঝায় বা যেভাবে বোঝায় তা কিন্তু সবসময় সে না কারণ ব্রাত্য রাইসু নিজেকে বোঝে, আর এইজন্যই নিজেকে বিভিন্নরূপ প্রকাশের ভিতর দিয়ে নিজেকে এবং অন্যদেরকে একই খেলায় একই সাথে দর্শক এবং খেলোয়াড় হয়ে মাঠে খেলাতে পারে। নিজের কেন্দ্রকে আড়ালে রেখে এই বৃত্তগঠন সহজ না। আর কেন্দ্র ছাড়া তো বৃত্তই হয় না। তাহলে ব্রাত্য রাইসুর চিন্তার কেন্দ্র কী?

এ রকম মনে হতেই পারে তার কোনো চিন্তার কেন্দ্রই নাই। যদি তা নাই থাকে তাহলে তার বৃত্ত তৈরি হয় কেন? বৃত্ত মানে, আমি বা আপনি তাকে নিয়ে ভাবছি কেন? অবশ্যই তার চিন্তার তরঙ্গে আপনি দুলছেন, কিন্তু জানতে পারছেন না বা জানাতে পারছেন না এটা কত হার্জ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ।

এই জন্যই ব্রাত্য রাইসু সহজে সহজ এবং কঠিনে কঠিন।

ব্রাত্য রাইসু তাকে নিয়ে ভাবার এই স্পেসটা মানুষকে দেয়, যেখানে মানুষ তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় ভাবতে শুরু করবে নিজেকে নিয়ে।

কিন্তু কেন? তাকে নিয়ে কেন? তাহলে কি সে অন্যদের থেকে আলাদা?

আমি যখন তাকে নিয়ে লিখছি এই প্রশ্নগুলোই মাথায় আসছে। সে তাকে নিয়ে বা তার চিন্তাকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবলীল হওয়া সত্ত্বেও তাকে সাবলীল মনে হয় না। এখানেই সমস্ত প্রশ্নের প্রশমন। কারণ সে সমস্ত কিছুকে প্রশ্ন করছে। কারণ সে এমন একটা সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে যেখানে সৃষ্টি করার চেয়ে সৃষ্ট সমস্ত কিছুকে নতুন করে দেখার দরকার আছে। এটা ইজমের চর্চা না, বরঞ্চ ইজম ভাঙার চর্চা। আর ভাঙতে গেলেই বোঝা যায় নির্মাণের দুর্বলতা। ব্রাত্য রাইসু একজন চিন্তক হিসাবে এই জন্যই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাকে সব সময় সেইসব মানুষ টানে যাদের মধ্যে গল্প পাই। কিন্তু ব্রাত্য রাইসুর মধ্যে আমি কোনো গল্প না বরঞ্চ গল্পের কোথাও না যাওয়াকে পাই।

যেহেতু মানুষের স্বাভাবিক ঝোঁক কেন্দ্রের দিকে তাই বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। ব্রাত্য রাইসুর ঝোঁক বিকেন্দ্রীকরণের দিকে। কারণ তা না হলে ভারসাম্য থাকে না। রাইসু সচেতন ভাবে এই ভারসাম্য রক্ষা করে।

মানুষ ততদিনই মানুষের কাছে আশ্চর্য যতদিন তাকে সম্পূর্ণভাবে চেনা যায় না। মানুষ তাই নিজেকে নিজের প্রিজমে আটকে রেখে অপরের কাছে নিজের ফলস ইমেজ বা ইম্প্রেশন তৈরি করে যা তার সোশ্যাল ট্যাবু বা ব্যক্তিত্ব বোধ থেকে তৈরি হয়। কিন্তু ব্রাত্য রাইসুকে আমার এ রকম আটকানো মানুষ মনে হয় না, কিন্তু যারা তাকে অনুসরণ করে তাদের মনে হয়। ব্রাত্য রাইসুকে যারা অনুসরণ করে তাদের মধ্যে আমি যা দেখি—এক, নিজেদের আপেক্ষিকভাবে বুদ্ধিমান মনে করা; দুই, নিজেকে অ্যানার্কিস্ট ভাবা।

ব্রাত্য রাইসুর সাথে কথা হবার আগে আমি তাকে লোকমুখে শুনেছি বেশি। যেমন একজন কবি ও ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফারের কাছে।

কবি ভাই এর মতে:
১. ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি ‘কবিতার চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন।
২. রাইসুর চিন্তাভাবনা অন্যকে খারিজ করার ভিতর দিয়ে নিজের চিন্তাকে স্বতন্ত্র রূপ দেয়।
৩. রাইসুর ব্যাপক পড়াশোনা ও জানাশোনা আছে।
৪. রাইসু তার মেধাকে অপচয় করছে অহেতুক কিছু কাজের ভিতর দিয়ে।

এরপর ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফারের সাথে আমার পরিচয় হলে এবং আমি কবিতা লিখি শুনে তিনি জানতে চান আমি ব্রাত্য রাইসুকে চিনি কিনা? আমি তাকে জানাই, আমি তার নাম জানলেও তাকে আমি জানি না বা তার বই পড়ি নি।

তখন সে আমাকে বলে ব্রাত্য রাইসুর জীবনযাপন সম্পর্কে এবং মেয়েদের তার প্রতি আগ্রহ আর মেয়েদের প্রতি তার আগ্রহ সম্পর্কে। আমি তাকে আবারও জানাই যে আমি তার জীবনযাপন সম্পর্কেও জানি না। তখন ফটোগ্রাফার ভাই আমাকে জানান যে রাইসু একজন বহুগামি পুরুষ যার কোনো সামাজিক যাপন নাই।

এই সামাজিক যাপন নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে, কারণ মানুষ যা যাপন করে তা ব্যক্তিগত আর এই ব্যক্তিগত রূপকে সামাজিক রূপ দেবার চেষ্টাটাই আমার কাছে অসামাজিক মনে হয়।

যেহেতু আমি মানুষের মধ্যে ডেঞ্জার জোন খুঁজি আর রাইসু সম্পর্কিত তথ্যগুলো চাইনিজ হুইস্পার হওয়ায় আমি বেশ কৌতূহল অনুভব করি, বিশেষ করে ২০১৬ এর পর থেকে যখন পরিচিত তরুণ কবিদের সাথে দেখা হলেই তারা আমাকে একবার হলেও জিজ্ঞেস করে যে, ব্রাত্য রাইসুর সাথে আমার দেখা হয়েছে কিনা বা আমি তাকে পার্সোনালি চিনি কিনা?

বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। আমার আরও অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে অথবা হয় নি। কিন্তু কেউ তাদের কথা জানতে চাইলো না, কেবল রাইসুকে নিয়েই প্রশ্ন? যেন রাইসুর সাথে সাক্ষাৎ হওয়া আর না হওয়াটাও একটা প্রশ্নবোধক বিষয়?

আসলে আমি কাউকেই চিনি না। মিশলেও মিশতে পারি না আবার কোথাও কোথাও না মিশেও মিশতে পারি। সবসময় চিন্তার মিলই যে মানুষকে মানুষের সাথে এক করে রাখে তা না, কখনো কখনো চিন্তার অমিলটাই বেশি জরুরি হয়।

ব্রাত্য রাইসুর সাথে আচমকা দেখা হয়ে যায় বইমেলায়। ডলফিনের মত আন্তরিক মানুষ। ব্রাত্য রাইসু হাসতে পারে।

তো, তার এই স্বাভাবিক আন্তরিকতা আমার ভাল লাগে। মনে হয় সে সহজ মানুষ। আর এও মনে হয় বই না, বরঞ্চ মানুষ পড়ে পড়েই সে অভ্যস্ত। ব্রাত্য রাইস‌ু মানুষের সাথে মিশতে পারে তা না হলে ব্রাত্য রাইসুকেও আমার মনে হত মুখস্থ চিন্তাবিদের মতন যাদের সামনে গেলে আমাকে তাকে মান্য করার জন্য আদবকায়দা জানা মানুষের মতন প্লাস্টিক কথাবার্তা বলতে হত। অথবা কথা বলতে হতো আমি কতটা জানি অথবা জানি না তার পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যাপকের মুখের সিজিপিএ সুলভ গাম্ভীর্যে বিদ্যা যখন পালাই পালাই সেখানে ব্রাত্য রাইসু এক ধরনের স্বস্তি।

অধ্যাপক একটি লেয়ারে অর্থাৎ ক্লাস কনফ্লিক্টে আটকানো এবং সেই জায়গা থেকে লাস্ট বেঞ্চের চিন্তাকে তারা দেখতে এবং শুনতে পায় না বা চায় না, রাইসু সেখানে অনায়াসে পৌঁছে যায় এবং অন্যকে শুনতে পায়। এই শোনাটা জরুরি।

মধ্যবিত্তের হীনম্মন্যতা নিয়ে তার সচেতন চিন্তা আমার অনেক প্রশ্নেরই উত্তর। যেখানে সবাই মধ্যবিত্তকে মহান সেক্রিফাইজের প্রতীক রূপে ভাবছে সেখানে সেক্রিফাইজের পেছনে কোন হীনম্মন্যতা দায়ী অথবা হীনম্মন্যতাকে সেক্রিফাইজের পোশাক পরানো হচ্ছে কি’না সেটা নিয়ে ভাবতে পারা যায়।

রাইসু কোনো ফিক্সড আইডিনটিটিতে আটকে নাই।

যখন কেউ এই আইডিনটিটিতে আটকে যায়, তার সাথে কথা বলতে গিয়ে মনে হয় আমরা ইউনিফর্ম এর ভিতর থেকে কথা বলছি আর সেলফি মুডে হাসছি।

ভাষা বিষয়ে ব্রাত্য রাইসুর চিন্তা ভাবনা দারুণ লাগে। মনে হয় ভাষার সাথে সাইকোলজির সম্পর্ক সেটাই সে লিখছে এমনকি লেখাচ্ছে। এখন মানুষ যেহেতু কৌতূহল আর কৌতুকপ্রবণ তার ভাষার ধরন অবশ্যই ভিন্ন আর ইন্টারেস্টিং হওয়া দরকার।

বাংলাদেশকে আমার মনে হয় অসংখ্য চিন্তকের দেশ। আর অসংখ্য চিন্তকের দেশে চিন্তার জন্যই লোকে চিন্তা করে। এখানে চিন্তাই বিনোদন। সময়ের এই চরিত্রকে চিনে ফেলার পর মাত্র দুইটা কাজই সম্ভব। এক, চুপ করে যাওয়া; দুই, চিন্তাকে এলোমেলো করে দেয়া।

এই দ্বিতীয় খেলাটা জরুরি এবং মজারও। গুছিয়ে চিন্তা সবাই করছে, কিন্তু গুছিয়ে এলোমেলো চিন্তা করা সহজ না। ব্রাত্য রাইসু গুছিয়ে এলোমেলো চিন্তা করা একজন দার্শনিক অক্টোপাস।

Facebook Comments
More from তাসনুভা অরিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *