ভার্চুয়ালি দেখা রাইসু

তবে এইটা স্বীকার করব, তার উপর আমার সন্দেহপ্রবণতা যাইতে সময় লাগছে।

রাইসুকে নিয়ে লেখার জন্য একটা চাপ ফিল করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এটা একটা বড় ঘটনা ঘটতেছে, যেহেতু রাইসু আমার কাছে একজন বড় ফিগার, আমারও যুক্ত থাকা প্রয়োজন।

কিন্ত লেখা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ আমি না হয় আমার স্বার্থে লিখব, কিন্ত যারা এই লেখা পড়বে তাদের কী জানাব লেখার মাধ্যমে?

পুরা ব্যাপারটা রাইসু সহজ করে দিলেন যখন উনি বললেন লেখা প্রশংসামূলক হতে হবে, কী থাকবে, কী থাকবে না।

এই যে একটা সমস্যাকে জায়গা মত চিহ্নিত করতে পারা—এ কারণে রাইসু পরামর্শদাতা হিসেবে অতি উচ্চ মানের।

মনে আছে, আমি তাকে ফেবুতে ফলো করার কিছু দিন পরে তার ফেবু স্ট্যাটাসের মাধ্যমে টাকা ধার চাওয়ার ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করছিলাম এবং ওটা একটা বিশাল ধাক্কার ব্যাপার ছিল। এর পরবর্তী সময়ে তিনি টাকা ধার দেয়ার কিছু জেনারেল রুলস এর কথা বলছিলেন। যেমন, টাকা ধার দিলে সেটা পাওয়ার আশা না করে ধার দিতে।

আমিন আল রাজী

আমি বুঝতে পারলাম, নিকটজনকে টাকা ধার দেয়া এবং ফেরত নেয়ার মত একটা জটিল এবং মানসিক পীড়নের কাজ সহজ হয়ে যায় এই নিয়ম ফলো করলে।

রাইসুর বিচার-বুদ্ধির প্রতি শ্রদ্ধা চলে আসে। উনাকে দেখি সর্বদা নতুন জিনিস চেষ্টা করেন।

দেখছিলাম ভার্চুয়াল স্ফেয়ারকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে যেমন কারো কাজ প্রয়োজন হইলে উনার ওয়াল অন্যদের কাজ পাওয়ার জন্য বুলেটিন বক্স হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া, অনলাইনে নিলাম করে পেইন্টিং বেচা, কবিতার বই বেচা। এগুলা সব অভূতপূর্ব ঘটনা আমার ফেসবুক দুনিয়ায়।

এই যে চিন্তাতে সর্বদা সক্রিয় থাকা এবং আইডিয়াগুলা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা এ কারণে রাইসুর সাহচর্য এত ইন্টারেস্টিং। এ কারণে তিনি ফেবুতে বার বার ঠিকানা পাল্টাইলেও প্রত্যেকবার তার সাথে যুক্ত হইছি।

রাইসুর কাছে আরেকটা নতুন জিনিস দেখছি, কম্পালসিভ স্ট্যাটাস পোস্টিং। একই বিষয়ের উপর তিনি একটার পর একটা স্ট্যাটাস দিতেই থাকেন। এ কারণে আপনি ঐ টপিকে নিতান্ত বাধ্য হবেন কিছু না কিছু চিন্তা করার। এই যে নন স্টপ থট প্রভোকেশন করেন তিনি এটা অনেককে বিরক্ত করবে সেটা জাইনাই তিনি এমন করেন বলে আমার মনে হয়। এর ফলাফল যে এগুলা সহ্য করতে করতে পারবে না সে চইলা যাবে আর যে থাকার সে ভালো মত জুইড়া থাকবে। অনলাইনে যারা নিমভাবে যুক্ত আছেন তাদের ফিল্টার করার কাজও হয়ে যায় এটাতে।

রাইসুতে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হইছিলাম, সেটা উনার জাজমেন্টাল ওয়ান লাইনার পোস্টগুলার জন্য। সামাজিক বা ব্যক্তি আচরণের কোনো বিষয়ে উনি কোনো ভূমিকা ছাড়াই এক বাক্যে কোনো অবস্থান বা কাজকে ঠিক বা বাতিল বলে একটা জাজমেন্ট দেন। ফেবুতে এটা নতুন বিষয় ছিল আমার জন্য।

অন্য ফেবু একটিভিস্টরা বিরাট ব্যাখা দিয়া তাদের বক্তব্য ভারাক্রান্ত করে ফেলেন, রাইসু এটা বাদ দিছেন। এ ধরনের বোল্ড অ্যান্ড লাউড স্টেটমেন্ট দেয়ার বিষয়টা অস্কার ওয়াইল্ডের লেখার মধ্যে পাইছিলাম। আমি নিজেও এতে প্রভাবিত হয়ে গেছি, এ টাইপের পোস্ট আমিও তখন করা শুরু করছি। আমি পরবর্তীতে অন্য অনেককেই এই ধরনের লেখা পোস্ট করতে দেখেছি, তার মানে সোশাল কমেন্টেটর হিসেবে তিনি অন্যদের অনুপ্রেরিত করতে পেরেছেন। এটা রাইসুর গুরুত্বপূর্ণ অবদান বলে আমার মনে হয়।

তবে এইটা স্বীকার করব, তার উপর আমার সন্দেহপ্রবণতা যাইতে সময় লাগছে। তাকে নিছক নার্সিসিস্ট মনে হইত, অন্য নার্সিসিস্টদের মতন। কিন্ত তিনি যেদিন টাকা ধার চাইবার পোস্ট দিলেন, সেদিন আমি তার ব্যাপারে নিঃসংশয় হইতে পারলাম যে রাইসু একজন নির্লোভ নার্সিসিস্ট। টাকা পয়সা বা সন্মান-পদ এর প্রতি তার লোভ নাই। যিনি লোভ করেন তিনি নিশ্চয়ই ভিক্ষা করেন না, অর্থাৎ রাইসু এ সবের মোহের ঊর্ধ্বে থাকেন। একজনের ব্যাপারে যখন আপনি এই সিদ্ধান্তে আসতে পারেন তখন তার সদিচ্ছা সম্বন্ধে একটা নিশ্চয়তা লাভ করেন এবং আপনি তার প্রতি সহজে বিশ্বাস আনতে পারেন।

আমার মনে আছে রাইসুর একটা লেখা পড়ছিলাম, নাদিয়া ইসলামকে উদ্দেশ্য করে লিখছিলেন। নাদিয়াকে উনি স্বার্থপর হইতে বলছিলেন, তার স্ট্রাগলের উদাহরণ দিয়া। এত র’ ইমোশনে ছিল, সেই লেখা স্তব্ধ হইয়া গেছিলাম পড়ে। ঐ দিন থেকে রাইসুকে ভালবাসছিলাম। তার পর উনার ভাত খাওয়া এবং আত্মহত্যা বিষয়ক রিসেন্ট লেখাটা—এগুলা পড়লে রাইসুকে ভাল না বাইসা পারা যায় না।

জীবদ্দশায় উনাকে তিন-চার বার নক করেছি ইনবক্সে, ইগনোর না করলেও পাত্তাও দেন নাই বিশেষ। এ সকল মুহূর্তে নারীদের প্রতি হিংসা হইতে থাকে।

মনে মনে ইচ্ছা করি যে আমাদের সামনা-সামনি দেখা এবং বাতচিত হবে, সেটা হওয়ার আগে কেউ একজন মরে গেলে বা দেশান্তরী হলে এই দুঃখ আমৃত্যু সাথে থাকবে। তবে প্রোগ্রাম করে দেখা করতে চাই না। দৈবচক্রে আমাদের স্পেস আর টাইম মিলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।

Facebook Comments
More from আমিন আল রাজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *