রহস্য-অরহস্যের ব্রাত্য রাইসু

এমনকি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো নিয়ে তার খোলামেলা মতামত কিছু নির্মম সত্য তুলে আনে।

ব্রাত্য রাইসুর সাথে পরিচয় হয় শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। মাস, সাল এখন আর মনে নেই। শুধু মনে আছে মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ধাঁচের চেহারা আর অতি সাধারণ ঢোলা-ঢালা প্যান্ট-শার্ট পরা হাসি-খুশি একজন যুবক।

তাকে ঘিরে থাকত আমার মত নবীন সাহিত্য করতে আসা অনেকে। সে সময় লেখালেখির বেশ ঝোঁক ছিল আমার। একটা গল্প লেখা শেষ হলে যে তৃপ্তি পেতাম, পত্রিকার পাতায় নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখে সে তৃপ্তি দ্বিগুণ হত, কত সব স্বপ্ন বড় লেখক হবার! সুযোগ পেলেই শিল্প-সাহিত্য-নাটকের আড্ডায়, বেইলি রোডের নাটক পাড়া, ঢাকা ইউনিতে আর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট সাহিত্য বৈঠকে, আর প্রতি বছর একুশের বইমেলা তো ছিলই।

মোহাম্মদ আসিফ

তো ছেলেদের মাথাভর্তি চুল আমার খুব ভাল লাগে, সে কারণে হোক বা সেই বয়সে বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার আকর্ষণেই হোক, রাইসু ভাইয়ের সঙ্গ ভাল লাগত। আড্ডা হত বইয়ের দোকানে, রাস্তার পাশে ফুটপাতে, চায়ের দোকানে আর মাঝে মাঝে দোতালায় সাহিত্যসভায় যেখানে প্রতিষ্ঠিত কবি, ঔপন্যাসিকরা আসতেন। অন্য নব্য কবিদের মত তাকে কখনো কবিতায় জরাগ্রস্ত, কবি কবি ভাবের আত্মমগ্নতায় দেখতাম না। তিনি বরং সদা উচ্ছ্বল, সপ্রতিভ নিরেট কৌতূহলী একজন।

ব্রাত্য রাইসু ও মোহাম্মদ আসিফ

তার প্রথম ও বিখ্যাত কবিতার বই ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ কবিতার বইটির আমি প্রথম দিককার পাঠক। বইটি এখনো আমার সংগ্রহে আছে।

রাইসু ভাইয়ের নেয়া কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকের মত বড় লেখকদের সাক্ষাৎকারগুলো পত্রিকায় দেখলেই পড়ে ফেলতাম। রাইসুর সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্যের দর্শন সম্পূর্ণ অন্যরকম—ভীষণ স্পষ্টভাষী, প্রতিবাদী, অভয় কণ্ঠ। এমনকি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো নিয়ে তার খোলামেলা মতামত কিছু নির্মম সত্য তুলে আনে। প্রচলিত ও প্রথাগত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি বর্তমানকে তুলে ধরেন বলেই, প্রায়শই সমালোচকদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েন, নিন্দুকেরা তার প্রতি কঠিন বাক্য প্রয়োগে দ্বিধা করেন না।

বহুমাত্রিক প্রতিভার রাইসুর ছবি আঁকার দিকটি আমার বেশি পছন্দ। চিত্রকলা আমি ভাল বুঝি না, অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট বোঝা তো আরও দুরূহ। তবু তার পেন্সিলে আঁকা কিছু কিছু ছবি ত্রিশ-চল্লিশ সেকেন্ড মনোযোগ দিয়ে দেখতেই হয়। এই মুহূর্তে ‘Confusion of an Obsessed Circle’ এর কথা মনে পড়ছে। বোঝার চেষ্টা করলে, তার চিত্রকর্মের মধ্যে মানবচরিত্রের কোনো না কোনো আবেগের একরকম বক্র প্রকাশ আছে বলে মনে হয়।

‘Confusion of an Obsessed Circle’, কাগজে পেন্সিল, ১৯৯১

রাইসু ভাই তার নিজের ছবির মতই অ্যাবস্ট্রাক্ট আর রহস্যময় বলেই হয়ত, তার প্রতি প্রচুর মানুষের কৌতূহল দিনে দিনে বাড়ছে। তার নারী ভক্ত, বিশেষ করে তরুণী ফ্যানের সংখ্যা তো রীতিমত ঈর্ষণীয়।

রাইসু ভাইয়ের শৈল্পিক বোধ, জীবনদর্শন বা সাহিত্যকর্ম নিয়ে কথা বলার মত যোগ্যতা বা সাহস আমার নেই। সেই ভয়ে আমি নিজের লেখা গল্প, নিবন্ধ ওনার পত্রিকায় বা অনলাইন পেজে ছাপার জন্য দেই না। একবার বাংলাবাজার পত্রিকায় হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে আমার একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল। তখন প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ ও রাইসু ভাই দু’জনেই পত্রিকার সাহিত্য পাতা দেখতেন। দু’জনের কে যে আমার লেখাটি পছন্দ করে ছেপে দিয়েছিলেন, তা আজও আমার কাছে রহস্য।

তবে তাতে কিছু যায় আসে না, জগতের অনেক রহস্যের মত রাইসু ভাই আরও রহস্যময় হয়ে উঠুন, সমাজ-সংসার ঘিরে তার কবিতা, ছবি, লেখা বাঙালীর ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক, এই শুভ কামনা ও ভালোবাসা চিরযুবা এই মানুষটির পঞ্চাশতম জন্মদিনে।

Facebook Comments
More from মোহাম্মদ আসিফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *