আমি ব্রাত্য রাইসুকে ভালা পাই

ব্রাত্য রাইসু একটা শিল্পের মাল্টিমিডিয়া।

কবি, বুদ্ধিজীবি ব্রাত্য রাইসু পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করলেন আজ । তাকে শুভেচ্ছা।

স্পিরুলিনা, আলস্য আর গন্তব্যহীনতার কল্যাণে তিনি যে দীর্ঘায়ু হবেন, এইটা ধারণা করা যায়।

কবি-বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য রাইসুর চিন্তাপদ্ধতির যে বৈশিষ্টগুলো আমার চোখে লাগে—

ক. মতামতসমৃদ্ধ অথচ মতবাদমুক্ত।
খ. অতিআধুনিক অথচ অপ্রাতিষ্ঠানিক; এবং
গ. তার বায়োলজিক তথা আধিভৌতিক অথচ পরস্পরবিরোধী চিন্তাপদ্ধতি।

রাইসুর সংলাপধর্মীতা আমার সবচাইতে ভাল লাগে। দিনভর ফেসবুকে পাবলিক আলাপচারিতার মধ্য দিয়া রাইসু সচল থাকেন। অপরাপর বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞান-বুদ্ধির ওজনে যেখানে ভারি আর গম্ভীর হইয়া বইসা আছেন, রাইসু সেখানে ব্যতিক্রম। এইটা তার বুদ্ধিবৃত্ত্বিক ঔদার্য্য।

আসাদুজ্জামান মিলন

চলৎসুবিধাহীন ঢাকা শহরে প্রাত্যহিক আলাপচারিতায় ফেসবুক সবচাইতে স্বচ্ছন্দ ও আরামদায়ক মাধ্যম। তাই ফেসবুকনির্ভর বুদ্ধিজীবিতাকে খাটো দেখবার সুযোগ নাই। যেহেতু, মানুষ বই পড়ে না বা পড়বার সময় পায় না। গত এক দশকে পাবলিক রাজনৈতিক-সামাজিক তর্কগুলো ফেসবুকেই হইছে মূলত।

একমুখী চিন্তা আর একগামী সম্পর্কের বিপরীতে বহুমুখী চিন্তা ও সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করাই রাইসু’র সাধারণ অবস্থান বলে মনে হতে পারে। অনলাইনে সামাজিক তর্কগুলোর যে অনিবার্য পরিণতি গিয়া দাঁড়ায়, হয় পক্ষে নয় বিপক্ষে—রাইসু সেখানে তর্কের মধ্য দিয়া ঘটনাটি বিচারের বা ঘটনাকেন্দ্রিক মতামতের তৃতীয় কিংবা ততধিক বিকল্প হাজির করেন, স্ববিরোধী হইতেও পিছপা হন না। সেখানে মৌলবাদী তার্কিকরা পিছলাইতে বাধ্য।

মজার বিষয় হইল, পরমত-অসহিষ্নু জনপ্রিয় ধারার মিডিয়া আর চেনা কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীকুল পাবলিক ফোরামে রাইসুকে যথাসম্ভব এড়ায়ে চলেন অথবা বয়কট করেন। ফলে রাইসু ব্রাত্য হইয়াই থাকেন। …বইলা, নিজের ঢোলক নিজে না বাজিয়ে তার উপায় থাকে না।

বাস্তবে কেমন জানি না, তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তার লজ্জাহীন, প্রেমময়, আমুদে ও বদরসিক চরিত্র আমার খুব পছন্দ।

ব্রাত্য রাইসু একটা শিল্পের মাল্টিমিডিয়া। রাইসু গদ্যে শক্তিশালী—ভাষা, শৈলী ও অভিপ্রায়ের দিক দিয়ে (গদ্য বলতে তার ফেসবুক স্ট্যাটাস আর কু-তর্কের দোকানের বিবিধ তর্ক-সামগ্রী বুঝি)।

রাইসুর কবিতা মুগ্ধ করে; একই সাথে পাঠককে অস্বস্তিতেও ফেলে দেয়। মনে হতে থাকে—এটা কবিতা হইল কি? বা কবিতা কি এমনও হয়! অামার কবিতা বিষয়ক ব্যাকরণের মুখস্থ সংজ্ঞা ভ্রান্ত লাগতে থাকে। এইটা অদরকারি তুলনা, ভুলও হবে হয়ত, তবু বলে ফেলি—জীবনানন্দের কবিতা যদি ‘মায়া’র অভিনিবেশ হয়, তবে ব্রাত্য রাইসুর কবিতা ‘মায়া’ বিদীর্ণ করে চলছে। রাইসুর কবিতা ভীষণ শক্তিশালী।  কিন্তু মনে হয় কবিতায় নতুন ‘আঙ্গিক’ নির্মাণেই তার আগ্রহ বেশি, এইটা আমার কাছে ‘ভারি প্রতিভার হালকা কাজে নিয়োগ’ বইলা মনে হয়।

রাইসুর সাক্ষাৎকার চিত্তাকর্ষক, তার সম্পাদিত ‘সাম্প্রতিক’ বাংলা ভাষায় সবচাইতে আধুনিক পোর্টাল মানি। রাইসুর আঁকা পেন্সিলের পেইন্টিং-এ ঠমক আছে, কিন্তু তত আগ্রহ পাই না, মন অতটা পশ্চিম দেশীয় ‘অ্যাবসট্রাক্ট’ মানে ‘বিষাদগ্রস্ত’ হইয়া ওঠে নাই এখনও হয়ত!

আমি ব্রাত্য রাইসুকে ভালা পাই। ব্রাত্য রাইসুকে ভাল লাগা মানে তার চিন্তাপদ্ধতি ভাল লাগা এবং এই সমজাতীয় চিন্তাপদ্ধতির কারণে আমিও রাইসুর মতই হইতে থাকি।

এই যে এমনটা ঘটতেছে, এর আংশিক কৃতিত্ব ব্রাত্য রাইসুর, বাকিটা আমার নিজস্ব সামর্থ্য।

বর্তমান সমাজের একজন অগ্রসর চিন্তক ব্রাত্য রাইসু, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

১৯/১১/২০১৭

Facebook Comments
More from আসাদুজ্জামান মিলন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *