রাইসুর টিজ

টরেন্টোতে এক মদের আসরে এক কবি আমারে বলতেছিলেন, বুঝলেন জিবরান, রাইসুরে সিআইএ টেকা দেয় বাঙ্গালা ভাষারে নষ্ট করার জন্য।

শুধু, শুধুমাত্র কবি হওয়ার জন্য নব্বয়ের শুরুর দিকে আমি আর মুজিব ইরম ঢাকায় আসছিলাম। আইসা উঠছিলাম ফকিরাপুলের এক মেসে। এই শহরের কেউই প্রায় চিনতো না আমরারে। কিন্তু আমরা অনেককে চিনতাম, কমরেড মনে করতাম।

বলাবাহুল্য, জেলা শহরে যেহেতু লিটল ম্যাগাজিন করতাম তাই লিটল ম্যাগাজিন করেন অমন যে কাউরেই বন্ধু, কমরেড মনে হইত। পরিচয় থাক বা না থাক।

সে সময় মঈন চৌধুরী ‘প্রান্ত’ নামে একটা সিরিয়াস লিটল ম্যাগাজিন বাইর করতেন। ব্রাত্য রাইসু সম্ভবত সেটার সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি আজিজের প্রান্তে প্রান্তে সে উপলক্ষে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। আখচার তাঁরে দেখা যাইত আজিজে। শাহবাগ উল্টাইয়া বেড়াইতেন।

শোয়াইব জিবরান

মাঝে মাঝে আড্ডা দিতেন পাঠক সমাবেশের সামনে। সেখানে আমরা—মানে ‘সূচক’ গ্রুপের সাইমুম রাজু, মোমিন রহমান, কবির হুমায়ুন, মুজিব ইরম, আতিক রহমান এঁরা। তো আমাদের মধ্যে দেখাদেখি হইত।

‘প্রান্ত’রে আমরা সিরিয়াস লিটলম্যাগ মনে করতাম। ফলত একদিন তারে আমি একটা কবিতা দিই। তিনি সেখানেই সেটারে রিজেক্ট করে বলেন, এইটা আমরার টেম্পোর লগে যায় না।

আমি ফিরায়া নিয়া বলি, আইচ্ছা।

মনে মনে বলি, খাড়ান টেম্পোর চেহারা বদলাইতেছি। তার ছোট্ট এই মন্তব্য আমারে এক ধরনের জেদ মনে ধরায়া দেয়। এর পরেই ‘সূচকে’র পাশাপাশি নিজেই লিটল ম্যাগাজিন ‘শব্দপাঠ’ প্রকাশ করি। বন্ধুরা প্রকাশ করে ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’, ‘কিউপিড’, ‘উত্তর অাধুনিক’, ‘স্বাতন্ত্র্য’। ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’ অবশ্য একটু আগে থেকেই প্রকাশ হইত। এগুলো মিলাইয়া আমরা শাহবাগে নতুন আলাদা টেম্পোর সাহিত্যবৃত্ত তৈয়ার করি। পরে সরকার আমিন তার আত্মজীবনীতে লেখেন, সে সময় আমরা শাহবাগ শাসন করতাম!

‘প্রান্ত’ বেশি দিন বের হয় নাই, আমার ‘শব্দপাঠ’ও। পরে অবশ্য বিলাত থাইকা ‘শব্দপাঠ’ নামে আরেকটা সাহিত্য পত্রিকা বের হইছিল। সেটা ভিন্ন কাহিনী।

আমরার লিটলম্যাগগুলো বন্ধ হইলেও শাহবাগে আমরার গতায়াত বন্ধ হয় নাই। সে উপলক্ষে রাইসুর সাথে দেখাদেখিও। একদিন কী একটা ভারি বই নিয়া রাইসু শাহবাগে ঘুরতেছেন। আমি বললাম, দেখি তো। হাতে নিয়া নাড়াচাড়া কইরা খানিকটা ঠাট্টা কইরাই কইলাম, এই সব পণ্ডিতি বই আমরা বুঝবো না।

রাইসু একটুও ঘাবড়ালেন না। স্বাভাবিকভাবেই চইলা গেলেন। কিছুক্ষণ পরে ফিইরা আইসা কইলেন, শুনেন, মূর্খ হওয়া ভাল, কিন্তু মূর্খতা নিয়া অহংকার করার কিছু নাই!

আমি অপমানিত হবো কী, তার টিজ করার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়া গেলাম।

রাইসুর টিজ আর ব্যঙ্গ করার ক্ষমতা অসাধারণ। টরেন্টোতে এক মদের আসরে এক কবি আমারে বলতেছিলেন, বুঝলেন জিবরান, রাইসুরে সিআইএ টেকা দেয় বাঙ্গালা ভাষারে নষ্ট করার জন্য। ও ভাষারেও টিজ করে। তবে ওর সে ক্ষমতা অসাধারণ।

রাইসু অখনো সব কিছু নিয়া অসাধারণ ভাষায়, ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ করেন। তার সে ক্ষমতা অসাধারণ। অন্যরা কেমনভাবে নেন আমি জানি না, কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হন দেখতে পাই। আমি মুগ্ধ হই অপমানিত হওয়ার বদলে, আগের মতই।

শুভ হাফ সেঞ্চুরি রাইসু, ভালবাসা জানিবেন।

Facebook Comments
More from শোয়াইব জিবরান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *