রাইসুর বিচিত্র কাণ্ডকারখানা

গল্প—সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ (২০০৪) / মাইয়া তো শক্‌ট্— ‘সে কি, রাইসু! মাত্র দু’দিন আগে তোমার সঙ্গে পরিচয় হ’ল, হ’ল শাহবাগে, কচি পরিচয় করিয়ে দিল।’ ‘একটু-একটু মনে পড়ার মতো হইতেছে মনে হয়,’ রাইসু কয়। ‘কিন্তু কচি কে? আর, সে-ই তোমারে আমার লগে পরিচয় করাইছে, নাকি তুমি তারে?’ আমি নাক গলাই— ‘ভদ্রে, সেই সাক্ষাৎকার সময়ে আমিও ছিলাম। এই আমি।

Till human voices wake us, and we drown.


রাইসুর লগে রাস্তাহাঁটা একটা মনোজ্ঞ ব্যাপার। যেন ধুলাবালিলোকাকীর্ণ ঢাকার রাস্তা এইটা না। যেন এই ধুলাবালিলোকময়তা, মায় এই ঢাকাত্ব, রাস্তাত্ব, এই সবই কামুফ্লাজ—যেন টাবু, চুলে চুন দিয়া, সাদা শাড়িতে বুড়ির রোল করতেছে, আর আমরা তা ই ধইরা নিয়া পদে পদে অপদস্থ হইতেছি, কইতেছি—এই যে সঞ্জয় দত্তের বুড়ি মা, যে কিনা আসলে বুড়ি না…। যেন বাইস্যার ভরা ইছামতি, ধুমধাড়াক্কা কচুরিপানা লোকজনেরে ভাসাইয়া নিয়া যাইতেছে। বহুমাত্রিক এই পথ। বহুযাত্রিকও। মানে বহুরকমের যাত্রা এই পথে নিরন্তর চলতেছে। বহুযাত্রা।

আমি রাইসুর হাত ধরতে চাইলাম, গতবারের মতো। সে কইল, ‘মিঞা, করেন কী? সমস্যা হবে।’

‘ও আচ্ছা, নিয়ম মনে হয় পাল্টাইছে এই দুইবারের মধ্যে, টের পাই নাই।’

আমার টের পাওয়ার আড়ালেই তাবৎ নিয়ম তৈরি হয়, ভাঙ্গে, বদলায়। আমি এক-এক সময়ে এক-এক নিয়মে গিয়া পড়ি।


গল্প


‘তবে কি বেবাকই পাল্টাইল, রাইসু? তবে কি আজকার রাস্তাহাঁটা রাস্তাহাঁটা না?’

‘হবে হবে,’ রাইসু ফিক হাসে। ‘সব পাল্টায় নাই, এখনও হয়।’

‘হইলে ভালো,’ আমি কই। ‘না-হইলে কী হয় তা তো না-হওয়া পর্যন্ত জানা যাইতেছে না, না-হইয়া না-হওয়া পর্যন্ত।’

এবং, হয়। যথাপূর্বক। যথাবিহিত। ভিড়ের ভিতর থিকা মাইয়া হাত নাড়ে। আমি প্রতি-হাত নাড়তে গিয়া সংযত হই, কেননা, হাতনাড়া খাওয়ার কথা তো রাইসুর। সে কিন্তু হাত নাড়ে না। আমার পানে বাঁকা তাকায়। আমি কই, ‘কই, হাত নাড়লা না? মাইন্ড করবে তো—মেয়েমানুষ।’

রাইসু কয়, ‘হাতনাড়া দ্বিপাক্ষিক হইলে সেইটা হয় বিদায়ব্যঞ্জক। এখন, যে হাত নাড়ছে সে তার জবাব না-পাইলে, সেই না-পাওয়া তারে টাইনা আনবে। তবে আপনে চাইলে নাড়তে পারেন—তাতে ইতরবিশেষ হইব না।’

আমি, টু ওয়েভ অর নট টু ওয়েভ করতে-করতে মাইয়া আইয়া যায়। আইলে পরে আমি হাত নাড়ি, বলি, ‘হাই!’

মাইয়া চোখে ভ্যাবাচ্যাকা ও মুখে থতমত ফলাও কইরা কয়, ‘আমাকে বলছেন?’

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

আমি ঐসা এক মুচকি বাইর করি যাতে জগতের যাবতীয় ভাব-অনুভাব-বিভাব-অভাব, এবং তা-সবের সকলপ্রকার সম্ভবপর রকমের মিশ্রণ, একযোগে আভাসিত হয়। তবে, তবু, অবশ্য, বলতেকি, এই হাসি হাসতে আমার বাড়তি কোনো প্রয়াস লাগে না। কেননা, বিশেষতঃ রাইসুর বিবেচনায়, নামান্তরে, ইহা হাবাহাসি, আমার যা কিনা ন্যাচারেলিই আসে। এর ব্যঞ্জনা বরং, অবস্থাগতিকে, খানিক কমাইতে কি বদলাইতে গেলেই আমার বারোটা, আর হাসির সাড়ে বারো।

‘রাইসু…!’ মাইয়া এক্সক্লেম করে।

নামটা কওয়ার পর, মনে হয়, একাধিক বাক্য বা বাক্যাংশ তার মনে আসছিল, যথা, “কেমন আছ”, “কী খবর”, “কতদিন পর” বা নিদেনপক্ষে “তুমি”, কিন্তু প্রায়োরিটাইজ করতে না-পাইরা শুধু আশ্চর্যচিহ্নের শারীরিক রূপ দিয়া কাম সারছে। মাইয়াগো শারীরিক ক্ষমতা ও শারীরিক বুদ্ধি পুরুষগো চে’ এত বেশি যে তাগো, পুরুষগোরে মানুষ না-ভাবা পুরাপুরি জায়েজ।

‘তুমি কেটা?’ রাইসু বলে।

আমি গরলনয়নে তাকে তাকাই, মনে-মনে কই, “রাইসুর হারামজাদা বাচ্চার বাপ! মাইয়া ভাগাইতেছ, শালা!” মনে মনে শুনি, সে বলতেছে, “ঘাবড়াইয়েন না, হাসন রাজার ভাষায় এর নাম খেইড়। দেইখা যান।”

মাইয়া তো শক্‌ট্— ‘সে কি, রাইসু! মাত্র দু’দিন আগে তোমার সঙ্গে পরিচয় হ’ল, হ’ল শাহবাগে, কচি পরিচয় করিয়ে দিল।’

‘একটু-একটু মনে পড়ার মতো হইতেছে মনে হয়,’ রাইসু কয়। ‘কিন্তু কচি কে? আর, সে-ই তোমারে আমার লগে পরিচয় করাইছে, নাকি তুমি তারে?’

আমি নাক গলাই— ‘ভদ্রে, সেই সাক্ষাৎকার সময়ে আমিও ছিলাম। এই আমি। আমার সাথে অবশ্য কেউ কারো পরিচয় করায় নাই, একটু তফাতে খাড়া ছিলাম। আপনি, শ্রীষু না?’

‘শ্রীষু না, সুশ্রী,’ সে কয়।

‘তাইলে ঠিকই আছে,’ রাইসু বলে, ‘রাসু দা-র মেমারি ফেল করে নাই যখন, বুঝতে হবে…। আর, শ্রীষু-ও ঠিক আছে, হেগোর সুসানজিফ্রো রাজ্যে উল্টা কথার নিয়ম, হেরা আমারে ডাকে সাইরু।’

‘তা-ই-ই! মজার তো!’

আমি সতর্ক (বা তর্কাতীত)। সুন্দরী কন্যারা কোনোকিছুরে “মজার” কইলে খবর হ্যাজ। সেই বিষয়টা টানাটানি করাটা নিরাপদ্ না আর। মজার জিনিসে তারা সচরাচর বেজার হয়। রাইসুর অভিজ্ঞতা বলে, আমার না। কাজেই হাবাহাসি, আবার।

রিট্রাই।

এইসময়ের আশেপাশে আসমানে কিছুএকটা হয়, আর মাইয়ার একনম্বর ভেজাল খাঁটি গাওয়া ঘি “বদন” (হিন্দিতে, সংস্কৃতে না) ডালডা মতো হয়। আমি সেইটা পুঙ্খানুপুঙ্খ অ্যাপ্রিশিয়েট করতে গিয়া দেখি কি, সে প্রায় রাইসুর সমান লম্বা, একটা রঙবেরঙ আল্লা-না-মালুম জিনিস পইরা আছে, যারে কিনা স্কার্ট্-ব্লাউজ, ঘাঘরা-লেহেঙ্গা, যা-খুশি কওয়া যায়— মানে, যে যাতে অভ্যস্ত সে সেইটা কইতে পারে আরকি। আর, মেডুসা যদি সুন্দরী হইতেন, তাইলে বলা যাইত তার মাথায় মেডুসার মতো চুল— দূর, মেডুসার চুলের মতো চুল, হিলহিল কিলবিল করতেছে (আহা, আমি মাসুদ খান হইলে বলতাম “মাথাভর্তি ঝিলিমিলি হিলিয়াম”!) আর, তার চোখ থিকা মেশিনগানের তোড়ে লেজারের ছিটাগুলি বাইর হয়। আমি এমনিতে যথেষ্ট নিরঞ্জন না-হইলে, এতক্ষণে তা-ই হইয়া যাইতাম। আমি বলি, ‘হাঁটা মুশকিল, যে ভিড়! রাইসু, একটা বেবি নে’য়া যাক, কী বলো?’

‘আমি কী বলব,’ রাইসু বিরক্তে বলে। ‘আপনার বিষয়, আপনে ক’ন।’

‘আমার বিষয় মানে? যাইতেছি তোমার বাসায়—’

‘যাইতেছেন তো আপনে, আমি তো না। আমি ফিরতেছি। ফিরা তো যাওয়া না। যাওয়া হইল একটা স্বাধীন কর্ম, আর ফিরা পরাধীন, বা ঘরাধীন। আমগো প্রত্যেকের সাথে, ঘরের লগে একটা রাবারব্যান্ড বান্ধা থাকে। আমরা যেহানেই যাই— আলাস্কা বা অস্ট্রেলিয়া— এই ব্যান্ড আবার আমগোরে টাইনা ঘরে নিয়া যায়। যাওয়ার আবেগ যত, ফিরার বেগও তত। ধরেন ঘরের উপ্রে তেরিমেরি বিলা হইয়া আজকা আপনে গেলেন গিয়া চৌমুহনি, ঢাকায় ফিরা আইলেন গতকাল।’

‘পেট আর ট্যাঁক খালি থাকলেই এইসকল উচ্চমার্গের ফিলসফি হয়,’ মাইয়া বলে।

‘খুলি খালি থাকলেও হয়,’ রাইসু কয়।


বেবি এক যান বটেন! তার তর্জন-গর্জন-ঝঞ্ঝন-কম্পনে মনে হয় যুদ্ধে যাইতেছি। তাও এক মহাজাগতিক যুদ্ধে, আকাশপথে। যাইতে-যাইতে কত-যে গ্রহনক্ষত্র তার ল্যাজের বাড়ি খাইয়া দুদ্দাড় মিসমার নোভা-সুপারনোভা হইয়া দুই দিকে ছিটকাইয়া যাইতেছে তার ইয়ত্তা নাই। আর এই হুহুঙ্কৃত রংহ সত্ত্বেও যখন দেখি যে মোটরকারগুলি হুশহুশাইয়া আমগো ছাড়াইয়া যাইতেছে তো বুঝি যে তা-সব আসলে বেবির জানলার অদৃশ্য পর্দায় অনর্থক (বা নঞর্থক) ছায়াবাজি। তারা আর বেবি একই পথে, একই সময়ে চলতেছে না। ভিন্নমাত্রিক তারা, ভিন্নযাত্রিক। যদিস্যাৎ হাত বাড়াইয়া আমি তাগো ছুঁইতে যাই, দেখমু কিছুই ছোঁয়া গেল নাই— বা, ছুঁইলেও, আমার এই হাতটা(ই) ছুঁইল নাই। হাতের মাত্রাবদল হইয়া সে বেগানা হাত হইয়া গেল। তাছাড়া তা-সব না-ঘটলেও, হাতের, বেহাত হওনের ঝক্কি তো থাকেই। তাইতে হস্তদমন।

সাইলেন্সার ফাটানো গর্জনের খেসারত দিতে অবশ্য বেবির মাঝে-মাঝে লাগে। ফি-ফার্লং তিনবারমতো স্টার্ট বন্ধ তার হয়। আমগোর তো তাতে প্রব্লেম নাই। যতক্ষণ চইড়া থাকা যায়। মাইয়া মধ্যে বইয়া ভুরু কোঁচকায়। কিন্তু হেরা তো খুশিতেও উশখুশ। অর্গাজমানন্দে তাগোর গলা(?) থিকা যে অর্গানিক আর্তনাদ বাইর হয়, কোনো নাদান শুনলে ভাবব কাউরে কোপানো হইতেছে। অবশ্য তেমন ভাবনায়ও দোষ নাই।

‘হউরের পুত, এই গলিতে হান্দালি ক্যান?’ রাইসু বেবিঅলারে পুছে। সামনে-পিছে কয়েক-কোটি রিকশা দিন সাতেক্কের মতো নিশ্চিন্ত হাই তুলতেছে, তাগোর প্যাসেঞ্জারেরা বাজার-সদা করতেছে, চা-বিস্কুট উড়াইতেছে, আর বেবিঅলা বিনাশব্দব্যয়ে রাস্তায় নাইমা যায়, বলে, ‘নামেন!’

‘নামেন মানে?’

‘আপনেগো লমু না, আমার বাপের খুশি।’

মাইয়া বলে, ‘ভাইয়া, রাইসুর মুখ খারাপ, কিন্তু লোক ভালো।’

রাইসু কয়, ‘তর আবিয়াত বইন থাকলে এখনই নিকা করতে পারি। নির্যৌতুক।’

এই কথা শুইনা বেবিঅলার খোমা যা হয়, দেইখা আর ভরসা পাই না, নাইমা যাই। হেরা শ্রমজীবী মানুষ। বেবির হ্যান্ডেলও নিশ্চয় কলমের চেয়ে ঢের বেশি শক্ত, পোক্ত। আমরা রিকশা ডিঙ্গাইয়া চইলা যাই। বেবিঅলা ফিরাও চায় না, ভাড়াও চায় না। রাইসু কয়, ‘ভালোই হইছে। বাসা আর একমিনিট। আপনের পঞ্চাশ ট্যাকা বাঁচল। এখন কোক পিলান।’

রাইসুর বাসা চৌদ্দ তালায়। তায় লিফট নাই। সে বাইছা-বাইছা নিছে। বাধ্যতামূলক ব্যায়ামের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। তার বৌ তাইজন্য মাসে তিরিশ দিন বাপের বাড়ি। আমার কিন্তু উঠতে ত-ত-তকলিফ হয় না। পিছে মাইয়া, তার পিছে রাইসু। যেন অরা, বিশেষ মাইয়া, ঠেইলা তুইলা দিল। কিন্তু, যেহেতু উদয়ে পতনায়েতি, আমি ফ্ল্যাটের ভিত্রে ঢুইকা ফ্ল্যাট। মোজেইক মার্জিত মেঝেয় গড়াগড়ি পাইড়া কই— ‘কিন্তু তোমার বাসায় কেন আসা লাগে? রাস্তায় কী সমস্যা হইতেছিল?’

কাইটা দিয়া মাইয়া কয়, ‘রাইসুর বাসা তো কোনোদিন দেখি নাই। এক ঢিলে দুই কাক। রথ বেচা ও কলা দেখা।’

‘কলাবতী গো!’ রাইসু ভনে।

আমার গান আহে— “সবে মাত্র তুমি যন্ত্রী, আমরা তোমার যন্ত্রে চলি, ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুণ্ডমালা কোথা পেলি?”, কিন্তু গলা দিয়া ঠেইলা বাইর করতে পারি না। বুকের পাম্প কিছু কমজোর হইছে।

পাতাল থিকা এক মাতালের “রাইসু”ৎকার চিল্লায়। রাইসু কয়, ‘হালার এবাদুর।’ এবং জানলা দিয়া কল্লা বাড়ায়া— ‘নীচের চাবি হারাইছে। পাইপ বাইয়া ওঠ্।’

নীচ নীরব হয়। তাতে অবশ্য মনে করার কারণ নাই যে হেয় চেইতামেইতা গেছে গিয়া। বরং পাইপ বাইতে লাগছে ধারণা করা-ই সঙ্গত হয়। যে লোক সাত বচ্ছর নক্তন্দিব যুদ্ধ কইরা, “জাত” আর “জাতি” এই দুই পুঁচকা শব্দের ব্যঞ্জনাগত অর্থপার্থক্য লইয়া সাতশ’ পাতার থিসিস লিখছে, সে যে চৌদ্দ বচ্ছর মেহনত কইরা চৌদ্দ তালায় উঠব না তা হলফ কইরা বলাটা মুমকিন হয় না। তবে আমার (বা/এবং তার) জীবৎকালে আমাদের মোলাকাতের সম্ভাবনা যেহেতু প্রায় নিল্, তার কথা আমি ভুইলা যাবার চাই।

রাইসু, ঘরের অবশিষ্ট জনতার উদ্দেশে, ছাড়ে— ‘ঐক্যবদ্ধ না একক?’

আমি দ্বিধা হই। এই দ্বিধা একার আমার না, গোটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের। আমরা সাম্যবাদ ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, আর বিশ্বব্যাপী এই দুইয়ের খামচাখামচিতে ক্ষতবিক্ষত হই। আমরা বাঞ্ছা করি কোনো মেসায়া, কোনো একটা “ডাস” যুক্ত বই লিখা, এই দুইয়ের আভ্যন্তরিক গোলমালগুলি মিটাইয়া ফেলবেন কোনোদিন; ফেইলা, গণতান্ত্রিক সাম্যবাদ বা সাম্যবাদী গণতন্ত্রের প্রপাগান্ডা/প্রতিষ্ঠা করবেন, আর সেই গণসাম্যবাদ আবার আমগোর রুহুর জুলমতেরও একটা ইতিবাচক ব্যাখ্যা দিব— যারে আজকা অন্ধকার জাইনা শরম পাই, তারেই কালকা আলো জাইনা গরম আমরা হ’ব (হায়, মৌলবাদীরা এই বিষয়ে আমগোর থেনে কত আগাইয়া আছে!)।

আমি বলি, ‘একটু চা খাই আগে বরং?’

‘এহানে চা’র জোগাড় নাই। আপনে নীচে গিয়া কিনা আনেন গা।’

‘উম্— এবাদুর তো মনে হয় বেশি দূর ওঠে নাই, হেরে কও না।’

কিন্তু কোনো তন্ত্র বা বাদই টিঁকল না। সব বরবাদ হইল। বোঝা গেল যে স্বয়ং পৃথিবী এগুলার কোনোটারই জন্য প্রস্তুত নাই। তবে, পৃথিবী কবেই-বা প্রস্তুত থাকে? তারে অপ্রস্তুত অবস্থাতেই আক্রমণ করতে হয়। এইমতো বুইঝা, রাইসু, সেইমতো করতে লয়। ফলে একটা গোলমাল হয়— একটা কমোশন। এবং তারপরে ডিমোশন। রাইসুর গলাধাক্কায় আমরা নামি। নামতে থাকি। নামতে-নামতে-নামতে থাকি। ঘামতে থাকি।

এইবার সে আমারে নামায় না, আমি পিছে। বলি, ‘কষ্ট হইতেছে?’

‘হ’লে কী করতেন? কোলে নিতেন?’

‘না, না-হইলে আমারে নিতে বলতাম। ওঠার চেয়ে নামারই কাঠিন্য বেশি— কোষ্ঠকাঠিন্য। হিটলারের কথা ভাবেন— উঠছিল কেমন তর-তর, আর নামতে গিয়া দুনিয়াসুদ্ধ ঝাঁকাঝাঁকি। যেন মায়ের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়া পোয়ে নামল।’

কোনোএকটা তালায় পৌঁছাইয়া এবাদুররে দেহা যায়। লোহার চোয়ালে, উপ্রে বা নীচে একবারও না-তাকাইয়া, প্রতিটা হস্তক্ষেপ বিবেচনা কইরা, তৌল কইরা-কইরা, কচ্ছপের মতো ধীর কিন্তু নিশ্চিত আগুয়ান। এই পোলা এখন পাইপ থিকা না-পড়লে দেশের বুদ্ধিজীবীগো খবর হ্যাজ।

আমি উবর্শী হই— ‘দ্যাখো এবাদুর, আর উইঠা কাম নাই। রাইসু ঢুকতে দিব না। আমগোও বরতরফ করছে। নাইমা পড়ো, বা পইড়া নামো। যেমতে খুশি। এমন বেহেস্তি বিকালটা গোঁইয়া যাইব গা, আর তুমি পায়খানার পাইপের লগে জাপ্টাজাপ্টি করবা!’

এবাদুর রা করে না। হা পর্যন্ত না। যেন হাতে না, দাঁতে পাইপ ধইরা আছে সে। আমার উষ্মা হইলেও বলি, ‘দ্যাখো, এই যে উনি আছেন, ধানমণ্ডি ঝিল, ক্রেসেন্ট লেক আছেন, ঠাণ্ডি-ঠাণ্ডি হাবা, চলো যাই আর “কী-যে ভালো” লাগাই নিজেগো। যাবা?’

এবাদুর আবারও রা করে না।

‘দ্যাখো, আমি একাএকা নারীসঙ্গ ভুগতে পারি না; কেমন খালি-খালি লাগে। তোমার মগজের দোহাই, অবতার, অবতরো!’

এবাদুর এইবার বলে, ‘কিন্তু এর শেষ না-দেইখা কেম্নে ফিরি।’

‘দ্যাখো, পাইপের শেষে দেখার তো কিছু নাই। পাইপও নাই। খালি এক আব্রহ্মাণ্ড পাইপহীনতা। জীবনের শেষ কামটাও কি আজরাইল সারতে তোমারে দিব, কও? অতএব, হে বাদুড়, অবতরো।’

বাদুড় আবার দাঁতে পাইপ কামড়াইয়া ধরে বোধ হয়, এবং আমি কই, ‘হালার পুত!’ কইয়া মাইয়ার হাত ধইরা ভাবাবেগ জানাই, ‘এখন আপনি ছাড়া আমার কেউ নাই, ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব, ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব, ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব, ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব!’

মাইয়া বলে, ‘তথাস্তু।’ এবং আমার হাতে নকল ফিঙ্গারনেইল দিয়া চিমটি কাটলে তা খুইলা পড়লে আমি বলি, ‘উন্মোচন আরম্ভ হইল, জনাব।’

‘অনেকক্ষণ চলতেছে, আপনি টের পান নাই। আপনার বুঝতে না-পারার মধ্যে যা-যা ঘটছে তার একটা হ’ল, বেবি।’

‘বেবির ব্যাপার কী?’

‘ঢাকায় এখন বেবি নাই।’

‘অ্যাঁ! তাইলে?’

‘অতীত থেকে একটা পাঠানো হইছিল।’


লেকিন আমরা যামু কো’নে? এবং যেহেতু দুইজনেই আমরা প্রশ্নকর্তা, কাজেই শেষে টস্। মাইয়া মুড়া, আমি ল্যাঞ্জা। এবং (যেন টস্ করবার আবশ্যকতা ছিল কোনো) মাইয়া জিতে, জিতা কয়, ‘জিতলে কী করা লাগে?’

আমি বলি, ‘কিছু করলেও হয়, না করলেও। তবে অবশ্য আপনারেই ডিসাইড করতে হবে কী করবেন। বা না-করবেন।’

‘ফুচকা খেলে কেমন হয়?’

‘উমদা হয়। না-খেলে হয় বেহ্তর। তবে খাওয়ার কথা চিন্তা যেহেতু করছেন, খাওয়াই দরকার। খাইয়া ভাবা যায়, না-খাইলে কী হইত।’

কিন্তু না-খাইয়াই বরং ভাবতে হয় খাইলে কী হইত-র কথা, কেননা, আল্লার আলমে ফুচকার প্রচলন আছে এমন বোঝা যায় না।

একটা রিকশা লওয়ার কথা মাইয়ার মনে উঠতে-কেন-ছে না ভাবতে-ভাবতে আমি হাঁটি, আর হাঁটতে-হাঁটতে ভাবি, ঐ একই কথা, মানে রিকশা লওয়ার কথা মাইয়ার কেন…। ভাইবা কূলকিনারা পাই না, হাঁইটাও পথ ফুরায় না। বলি, ‘পথের শেষ কোথায়?’

‘তুমি বলো!’

আমি তো লজ্জায় লাল, ভয়ে নীল, প্রেমে গোলাপি হইয়া তবু অবশ্য সাথেসাথেই… করি না— ‘ইয়ে, পান চলে?’

‘ছি! আমি কি নানিমা!’

‘না না, বলতেছিলাম যে পান করা চলে কীনা।’

মাইয়া হাসে। এই আরেক হাসি, যা খালি মাইয়ারাই পারে অর্ধস্ফুট করতে। এ আমার হাবাহাসির বাবা। আমি সুতার উপ্রে-দা’ হাঁইটা যাই— সাকুরাভিমুখে— লেফট না রাইট হাঁ করতে-করতে। মাইয়া গুটিগুটি মেবি-মেবি অনুসরে। আর এই বেটাইমে সাকুরা-গমন একদিক্ দিয়া নিরাপদ্— আমি বলতাম আমারে জিগাইলে— কিন্তু জিগায় কই! অধিকন্তু, নিরাপত্তার ব্যাপারটা তো সাকুরা গেলেই প্রকট হইব। কারণ, কারণ-ছাড়া তো কার্য নাই। তবে কার্য-ছাড়া কারণ হয়। যেমন এখন রিকশা লওয়ার কারণ ঘটলেও, কার্যতঃ হইতেছে না। কলাবাগান থিকা পরিবাগ পর্যন্ত, এই অত্যন্ত জাজ্বল্যমান কারণটা কার্যাভাবে মনমরা হইয়া থাকব, আমগোর আরাম হারাম করতে থাকব— খোদ সাকুরা গিয়া যদি কিছু হয়। সেইখানেও গর্ডন্‌জ্ ড্রাই জিন না-জোটে তো হইছে। তখন, কারণ ছাড়া কার্য নয়, এই অ্যাক্সিয়মটাও ফক্কিকা হইব। কেননা, আমগো বাঁইচা-থাকা-রূপ কার্যের কোনো কারণ আর মালুম হইতে পারব না।

কিন্তু আপাততঃ সেই কেয়ামতের কিছু বিলম্ব থাকে বইলাই প্রতীয়মান হয়। গর্ডন্‌জ্ হ্যায়! আমরা ঢুকছি, বার-এ না, রেস্তোরাঁয়। মাইয়া কয়, ‘রেস্টোরান্টেও মদ চলে জানতাম না।’

‘আপনের দোষ নাই,’ আমি ভনি। ‘প্রায় কেউই জানে না আগেভাগে। প্রথমবারই বার-এ গিয়া ঢোকে। আর তারপর, জাইনাও আর রেস্টোরান্টে যায় না। অভ্যাসের দাস ইনসান। দশটাকার জিনিস কুড়িটাকায় কিনতে সুত্রাপুর থে’ মিরপুর যায়। এবং যাইতেই থাকে। একবার যেইখানে গিয়া মারা পড়ে নাই, তারচেয়ে বিশ্বস্ত জায়গা আর কোন‌্টা?’

‘তুমি এমন সম্বোধনবৈষম্য ঘটাইতেছ কেন?’

আমি হাবা-হাসলে মাইয়া আবার বলে, ‘তুমি রেস্টোরান্টে যে? বার-এ ঢোকো নাই?’

‘আমি নিজ পয়সায় মদ খাই না তো, যে যেখানে নিয়া যায়। রেস্টোরান্টে ঢুকাইছিল এক ব্যাটা, হে কোনোদিন বার-এ ঢোকে নাই। এইখান থিকাই স্বর্গে গেছে গা’, মর্গ ঘুইরা।’

লেম্বুর রসচক্র সমেত জিন বাবাজি আসেন। অতুলান তিনি। বাদশা সুলায়মানের বেয়াড়া বান্দা। বোতল থিকা ছাড়া-পাইবামাত্র, তিনি তোমার দেহের সমান হইয়া পড়েন, আর তুমি হও বাবেলের মিনার। তোমার চান্দি গুঁতা খায় চান্দে, নাক-কান দিয়া জোনাকির লাহান, হাজারেবিজারে ঢুইকা পড়ে অ্যাস্টারয়েড, আর মুখ থিকা অটোম্যাটিক বাইর হয় কুফরি কালাম— এক্লেসিয়েস্টিজ্— মায়ায়ৈ মায়া, সর্বঞ্চ মায়া, মায়াময়মিদমখিলম্! এ-জিন আমারে বে-জিন পিঠে লইয়া কতকতবার উড়াল দা’ গেছে কতকত এল দরাদো, কত২ শ্যাংগ্রিলায়…

আমি বলি, ‘কেমন বুঝতেছেন?’

‘লালের চেয়ে সাদা-ই তোমার পছন্দের?’

‘হঁ। মদ খাইয়া লাল তো আমি হব, মদই নিজেই তা হইয়া রইলে তো হবে না। হওয়ার জন্যই তো হওয়ানো, হওয়ানোর জন্য তো হওয়া না।’

রেস্তোরাঁর বাত্তিগুলি কাঁঠালপাতা-সবুজ অন্ধকার ছড়ায়। জিনের দানবায়ন শুরু হয়। আর— অহহ— অডিয়োসিস্টেমে তখনই বাজতে ধরে কঁসের্তো পুর উ্যন্ ভোয়া! জিন-ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আমার পাঁজরার তারে গিটার বাজায়। আমার চোখের ভিতর দিয়া যা সে দ্যাখে তা হইতে শুরু করে। দেখার পরে হয়। অনতি পরে। সূক্ষ্মাতি পরে। তবু পরে। আর আমি যখন দেখি তখন তা হইয়া গেছে অন্ততঃ একবার। আমি জানতে পাই। আমি বর্তমানে তাকাইয়া অতীত দেখতে পাই, অতীতে তাকাইয়া ভবিষ্যৎ। আর বর্তমানরে দেখি অতীত থিকা, ভবিষ্যৎ থিকা। আর আমার চেতনার রঙে সুশ্রীর নয়ন হয় পান্নার সাগর। পালিশ করা ঢেউ। আমি তাতে সাঁতরাইছিলাম কোনোদিন-দেখতে পাই। দেখতে পাই যে আমি দেখতে পাইছিলাম যে আমি দেখতে পাব।

রিট্রাই।

সুশ্রীর চোখের পান্না এখন আকুয়ামারিন হইতে নিবে, আমি জানতে পারি। সে বলবার ঠিক আগে শুনি, ধুধু অতীতের কোনো আলোহিম লিথি-পারের থা’ সে ক’বে, ‘আমার অনেক দুঃখ।’

আর আমি গুঁইসাপের ছলম হইয়া যাব জাইনা,—হই। আর কী-যে হরকত হবে অতঃপর। মাটি গইলা লাভা; আর হাওয়া, পয়লা অ্যাম্বারগ্রিস, পরে ফিটকিরি। আমার নিশ্বাস বন্ধ হইয়া কবে গেছিল, এখন খুলতেছে না আর, প্রাণপাখি আমারে ফাটাইয়া বাইর হয়-হয়, আর আমি বলি, ‘এই কথাটার আগে গিয়া, শ্রী, দ্যাখো-তো এরে রুখতে পারো কীনা, নাইলে বিশ্ব রসাতল যায়!’

সুশ্রী ততক্ষণে নীরব মোম গলতে ধরবে তা আগেই বুইঝা জোর তাড়া দেই— ‘তুমি বইলা ফ্যালো যা বক্তব্য— তোমার নির্গলিতার্থ।’

‘আমি অপবিত্রা।’

এই কথাটা সে বলবে জাইনা আমার জন্মের আগে এর জবাব প্রস্তুত হইছিল বইলাই তো আমার জন্ম হইল। আমি বললাম— ‘মা গো!’

‘হায় হায়! তুমি জিহার করলা! তুমিও করলা! এৎ তু ব্রুতে!’

এর পর আমগোর ছিটপটাং ছিটকাইয়া যাওনের কথা থাকলেও, আমরা বিধান লঙ্ঘি, কেননা, একটা বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা আছিল। আমি বললাম, ‘জাগো!’

আঙ্গন ঘরপন সুন ভো বিআতি।

কানেট চোরে নিল আধরাতি ॥

আকাশে-আকাশে এশার আজান প্ল্যানচেটে রাত নামাইতেছে। এখন যাইতেছি সুশ্রীরে তার শ্বশুরালয়ে সোপর্দ করতে। স্বামী বাড়িত নাই। শ্বশুর দুনিয়াতেই নাই। আছে খালি কাজের লোকজন হামিদ ওয়া খালেদা। তাগো দুইজনের ভাব হয় নাই, সুশ্রী আমারে বাতায়। কেননা, হামিদ আন্ধা, খালেদা বোবা। মানসিকভাবে অবশ্য। এখনও। তবে এইসব মানসিক সমস্যার শারীরিক হইতে তো বেশি ওক্ত লাগে না। সুশ্রী কয়, ‘হামিদকে বিদায় করতে হবে শিগগিরই। ওর অ্যাপ্যাথি ভয় জাগানিয়া। তুমি করবে?’

‘অ্যাঁ! তোমার বাসার চাকর হ’তে কইতেছ!’

‘প্রেমের জন্য মানুষ জান দিয়ে দেয়, কান দিয়ে দেয়, আর তুমি মান দিতে পারবা না?’

‘নিশ্চয় নিশ্চয়,’ আমি নিশ্চিত হইয়াই বলি। ‘এ আর কী এমন।’

জানা যায়, তার শৌহর মাসে চল্লিশ দিন বৈদ্যাশ থাকে। আমদানি-রফতানি ও আমদান-রফতান নিরন্তর চলে। আমি হামিদ না, এইটা টের পাইতে তার বারো বচ্ছর মতো লাগবে। ততদিন কাফি। আর বারোতে না-হইলে বিরানব্বইয়ে হবে না, তা-ও নিশ্চিত। কাজেই আমার বারো বচ্ছর সুশ্রীঘরবাস একরকম ধার্য হয়।

রিট্রাই।

পরসকাল বাদ-ব্রেকফাস্ট এবাদুর আসে। আমারে হামিদের লুঙ্গি-গেঞ্জিতে দেইখাও তার তরবেতর নাই। যেন হামিদই হে। বা আমি। আমি বলি, ‘দ্যাখো, তোমার বিষয়টা কী? তুমি পাইপ না-বাইয়া, বা পা পিছলাইয়া পটোল না-তুইলা, এইখানে কেম্নে?’

‘পাইপে চড়ার আগেই আসছি,’ এবাদুর ওতরায়। ‘নাইলে আসা আসান হইত না। বিকালের দিকে রাইসুর বাইত যামু, পাইপ বাইতে।’

সুশ্রী স্নানান্তিক তোয়ালেয়, ঢুইকাই শ্চীৎকার দেয়, ‘এবাদুর…!’ এইবার অবশ্য এর সঙ্গে আরও কিছু বাক্যও বাইর হয়, যথা :‘ওয়াট্টা প্লেজেন্ট স্যর্প্রাইস! কফি না কুলফি?’

এবাদুর চা চা-ইলে সুশ্রী বলে, ‘হামিদ, চাই লে আও।’

‘এ কী!’ রাগে আমি বাক্যহারা হওয়ার আগেই বইলা ফেলি— ‘হামিদ বলতেছ কোন্ আক্কেলে! আর এই হুকুমদারিরই বা মানে কী?’

‘আহা, চটতেছ কেন? তোমাকে তো সত্যিকারের হামিদই হ’তে হবে, সু! মাইনাস দ্য নির্বেদ, অফকোর্স।’

আমি চা-ইনা দেখি রাইসু বইসা।

‘এহে, এইটা কী করলা মিঞা! এখন কী হইব! এবাদুর আইছে অতীত থিকা, তুমি ভবিষ্যৎ থিকা— একলগে এখন আমগো বর্তমানে; সমস্যা হবে তো।’

‘থোন্ ফালায়া আপনের ক্যাঁচাল। আমার ফৈয়াজ খাঁ বাইর করেন।’

‘ফৈয়াজ খাঁ তোমার হইব কোন্ দুঃখে? উনি সবার, বিশ্বমানবের।’

‘বিশ্বমানবের খ্যাঁতা পুড়ি। আমার ঘর থিকা চুরি!’ ভাবাবেগে রাইসুর বাগ্রোধ হয়।

‘কিন্তু ঐটা এখন ফেরত দেওয়া যাবে না। কালকা পয়সা-ছাড়া মদ খাইয়া জানটা-ছাড়া আর সবই জমা দিয়া আইতে হইছে। জামাকাপড় দয়া কইরা ছাড়ছে, তয় শার্টের একটা হাতা কাইটা নিছে। আমি হেই এক হাত শার্টই হামিদরে দিলাম। হে ভ্রূ পর্যন্ত ক্ষেপণ না-কইরা পইরা গেল গিয়া।’

‘তাইলে চলেন সাকুরা।’

‘যাবা-ই যখন, রাইসু, এক বোতল ভদকা নিয়ে এসো, সাথে প্রচুর কাঁচামরিচ আর টমাটো সস, ব্লাডি মেরি করব,’ সুশ্রী আবদারে।

রিট্রাই।

রিট্রাই।

দূর শালা।

এবাদুর আর রাইসুর কান্ধে হাত দিয়া কই, ‘তিনজনে তো দোষ নাই, কী বলো?’

রাইসু বলে, ‘আপনে মিঞা হাকুল্লা পাব্লিক, গাত্থা দেখলেই চ্যাল্লৎ কইরা হান্দায়া যান। এই মাইয়ার লগে জুটলেন ক্যা? হের জামাই টাইকুয়োন্ডো ব্ল্যাকবেল্ট, জানেন?’

জাইনা আমার জলাতঙ্ক হয়— ‘হায় হায়! এখন উপায়?’

‘হর্মোন চেঞ্জ কইরা ফালান, সমস্যা হবে না।’

সাকুরায় গেলে হেরা তো মারতে আসে। আমি কই, ‘ভাইয়া, এবাদুর কালকার পয়সা দিতে আসছে, মাইরেন না।’

এবাদুর কয়, ‘কিন্তু কালকা তো আমার আগামিকাল। পয়সা দেই কেম্নে?’

‘অ্যাডভান্স্ পে কর্, হউরের পুত,’ রাইসু বলে। ‘পরশুদিন তাই ফৈয়াজ খাঁ হুনতে পারবি— পাইপ থিকা কালকা না পড়স যদি।’

এবাদুরের বদান্যতায় সাকুরা স্পেলবাউন্ড; দিব্যি বাকিতে ভদকা দিল। এবাদুর অবশ্য গম্ভীর বিতর্কে বুঝাইছে যে আসলে বাকি না। সে তো অ-তিথি, আছে অতীতে। দুই দিন পর যখন বর্তাবে, মানে, ভদকা লওয়ার সময়ে সে থাকবে, তখন, সাথেসাথেই দাম দিয়া দিবে। কাজেই বকেয়া কিছুই রইল না। মদটা কিনার চেয়ে আগে খাওয়া হবে, এই মাত্র। কিন্তু খাওয়া না-খাওয়া তো খাদকের ব্যাপার, বিকিকিনিটাই দোকানির।

আমি এতদিনে জানলাম তার পিএইচডি-র মাহাত্ম্য, এবং তারেই ধরলাম, ‘দ্যাখো, হর্মোনের ব্যাপারেও তোমার হেল্প লাগব, ভাই! দোহাই লাগে তোমার, আমায় নিরাশ কইরো না!’

‘ই কী! আপনি না কয়দিন আগে করালেন?’

‘তাই নিকি?’

‘কিন্তু আবার চেঞ্জ হ’য়ে গেলেন কীভাবে?’ ডাক্তার বিস্ময়ব্যঞ্জক কণ্ঠে বলে। ‘অবশ্য এই সায়েন্সটা এখনও ফুলপ্রুফ না, দুই একটা কেস…।’

‘আরও একটা ব্যাপার ঘটতে পারে, ডাক্তার সাহেব,’ এবাদুর গম্ভীর বলে— ‘আজকার ঘটনারই স্মৃতি হয়তো আপনার মনে আগের থিকাই আছে— মহাকবি মাসুদ খান যারে ক’ন “ভবিষ্যৎ স্মৃতি”।’

সেই সম্ভাবনাটাও উড়াইয়া দেওয়া না-গেলেও, ডাক্তার, ছুরি-কাঁচি-চিমটা-করাত-কুড়াল-হাতুড়ি-ছেনি বাইর করলে পরে রাইসু তো মারখাপ্পা— ‘মিঞা, করেন কী? এইসব প্রাগৈতিহাসিক শস্ত্রে কী হইব? হে তো বাবা আদম না, একজন আদমি-মাত্র। তাছাড়া টাইম “নাই”। ভদকা লইয়া বইয়া আছি। লেজার-ফেজার দিয়া সারেন।’

‘নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই!’ ডাক্তার নওশা হাসে। ‘ভুলে গেছিলাম। সরি।’

হের পর ডাক্তার, আকুপাংচারের মতো, আমার সারা শরীর পাংচার কইরা নানাকার সুঁই ঢোকায়। হেগো লগে আবার একটা রোবটাকৃতির যন্ত্রের সতার সংযোগ আছে। আমি তো লবণ-দেওয়া মইষা জোঁকের লাহান কিলবিল কিলবিল কিলের চোটে ভূত ভাগিয়া যায় রে, আর তাই-না দেখে রাইসুর কী হট্টহাসি! সেইটা সুঁইয়ের চেয়ে কম পেনিট্রেটিং না বইলা, কিলবিলানি আমার বাড়ে। সুঁই-কিলবিল-হাসি-কিলবিল-এইমতো চেইন রিঅ্যাকশন চলতে লাগে, যতক্ষণ না ডাক্তার কয়, ‘এবার শুরু হবে।’

শুইনা তো আমি কিলবিলানিও ভুইলা গিয়া ‘অ্যাঁ! তাইলে এতক্ষণ কী হইল?’ বললে পরে রাইসুর গুর্দা তার মুখ দিয়া বাইর হইয়া আসে আর ডাক্তার নিরুত্তরে আমার নাকে অক্সিজেন মাস্ক দিলে, আমার নিশ্বাস নিতে তো এমনিতেই অপারগতা হইতেছে না মর্মে কিছু বলতে যাইতেই চামড়ার ভিত্রে পয়লা একটা থিরথির, হের পর দুম কইরা আপাদমস্তক ঝাঁকি, রিখটার স্কেলে ৭/৮ তো হইবই, আরও বেশিও হইতে পারে যদি সেই স্কেলে ৮ এর বেশি দাগ থাকে। আমি তারস্বরে প্রতিবাদ করি, কিন্তু তা নিজের কানেই পৌঁছায় না, অন্যে-পরে-কা-কথা। ঝাঁকি খ্যাপে-খ্যাপে চলতে থাকে, আর সারে জাহাঁ গন্ধকগন্ধে পরিপ্লুত, আর আমি দেখি আমার খাটটা একটা সহস্রদল কুবলয়, আর রাইসু, এবাদুর, আর ডাক্তার, এল গ্রেকোর ছবির যিশুর লাহান ঢ্যাঙ্গাঢোঙ্গা পাতলাপোতলা নাঙ্গা হইয়া তাগোর অতিবিলম্বিত মর্দানা বাগাইয়া অগ্রসর… মা গো!

একটা গুহার মধ্যে চোখ আবার মেলি, সামনের দেয়ালে পিছের আলো খ্যালে— তাতে তিনটা অনচ্ছ রঙ্গিন ছায়া। আমি ভাবি এর একটা রাইসু, একটা এবাদুর, একটা ডাক্তার— মাগার কোন্‌টা কেটা? বিযুক্তি প্রয়োগ কইরা বুঝতে যাই : ধরা যাক, মধ্যেরটা রাইসু, তাইলে এক-এক পাশে এবাদুর আর ডাক্তার। যদি ডাইন দিকে এবাদুর হয়, বাম দিকে ডাক্তার, আর যদি না-হয়…

সহসা অযৌক্তিকভাবে আমি হাল্কা হইয়া গেলে ও আপনারে উলঙ্গ দেখতে পাইলে… ই ই ই ই কী যে লিবিডো আমার হয়! আমি নিজেরে প্রায় ধর্ষণ করতে উদ্যত হইলে দেয়ালের ছায়ারা চঞ্চল হয়, একটা সমুদ্রসম্ভব স্তনন উদ্ভূত হয়, (রিট্রাই), মধ্যের ছায়ার হাতে সিগরেটের লালের মতো একটা আলো জ্বইলাই বুইজা গেলে আমি তারে ডাক্তার শনাক্ত কইরা বামে ডাইনে রাইসু আর এ… বা…

ফেল।

ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে দেখি সুশ্রী আমাপানে অগ্রসর। আমি হাসি। সে ও। বলি, ‘কেমন আছেন, জনাব?’ কিন্তু আমি কি বলি? নাকি সে? সন্দেহের কারণ দুইটা : এক. ঠিক এই কথা বললে যেভাবে ঠোঁট নড়ার কথা, সেভাবে তারও নড়ে; দুই. যে-কণ্ঠস্বর আমার কানে আসে, তা তার। আর, দুইটা কণ্ঠস্বরও কানে আসে নাইক্কা। তবে কি আমি বলি নাই? হর্মোন-বদলে আমার গলা গায়েব হইছে? নাকি আমিই বললাম আর সে লিপ্ দিল? এইমতো দুনোমনো করতে-করতে সে দুইটা হইয়া গেল। দুই সুশ্রীরই চোখে ভয়ঙ্কর বিস্ময়। আমার কথা বলাই বাহুল্য হয়। তো সুশ্রীদের একজনা কয়, ‘সু! সু! এ কী!’

আরেকজনা বলল (কিন্তু বলার সময় ধারণা হইতেছিল যেন আমি বলতেছি), ‘শ্রী, তুমি কেন দুই?’

‘আ-আ-আ-য়্যু রাস্কল!’ এইবার কইলাম চিৎকারটা পিছের থা’ আইল তা স্পষ্টই বোঝা গেল। আমি বোঁ কইরা ঘুইরা গিয়া দেখি আরেক সুশ্রী। তখন গোলমালটা পরিষ্কৃত হয়— পিছনে আয়না। আয়নায় যুগপৎ আমি ও শ্রী আছিলাম। কিংবা সু ও আমি। আমগোর কেউ কয়, ‘তুমি কে?’ তুমিই শ্রী, নাকি তুমি সু?’ আমগোর কেউ বলতে পারে না, একমাত্র যে পারত, হে এখন পাইপ বাইতেছে। একজন আমতায়, ‘আমরা দুইজনে মিলা সুশ্রী, সু-শ্রী।’

অপরে জবাব দেয়, ‘কিন্তু আমি দুইজন হইয়া থাকতে চাই না, কিছুতেই না!’

ফলে আমগোর একজন নিহত হইলে একজন থাকে। এক বিয়োগ এক সমান এক।

তার পরদিন বা আগের দিন রাস্তায় রাইসুরে দেখি এক ক্যালাস কিসিমের লোকের লগে খাড়ায়া আছে। আমি হাত নাড়ি, রাইসু নাড়ে না। আমি বলি, ‘রাইসু…!’

রিট্রাই।

রিট্রাই।

রিট্রাই।

অ্যাবর্ট।

২০০৪ (সম্ভবতঃ)

Facebook Comments
More from সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *