রাইসু, আমি আপনার দূরের বন্ধু

আমি বোধহয় ভুল করছি না, সময়টা ২০১৪ সাল হবে। রাইসুকে আমি ফেসবুকে খুঁজে পাই। একটা কবিতা পেলাম ফেসবুকে ‘আমাদের ব্যক্তিত্ব অনেক’। কবিতাটা পড়ে সাথে সাথে আমি তার ভক্ত হয়ে যাই।

ইন ফ্যাক্ট আমার মোটামুটি সব কবিদের সাথে পরিচয় হয়েছে ফেসবুকে শুধু কামু ভাই ছাড়া। তানিম, রুদ্র প্রায় সন্ধ্যায় আড্ডা দিত কামু ভাইয়ের সাথে, যেখানে আমিও উপস্থিত থাকতাম। আর তানিম, রুদ্র তো আমার কিশোরবেলার বন্ধু। এছাড়া দুজন কবির সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে উঠে, ফয়সল নোই আর জহির হাসানের সাথে। উনারা দুজনই রাইসুকে খুব পছন্দ করেন এবং গুরুত্ব দেন। জহির হাসানের সাথে আমার আলাপের মাঝে রাইসুর প্রসঙ্গ আসবেই। আমি বুঝতে পারছিলাম উনি রাইসুকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। আর ফয়সল নোই তো রাইসুর একনিষ্ঠ ভক্ত। রাইসুর আঁকা নিলামে তোলা প্রায় সকল ছবিই ফয়সল নোই কিনে নিছেন।

মারিয়া রিমা

রাইসুর কবিতা পড়ে এতই মুগ্ধ হলাম যে, আমি আমার প্রেমিককে এই কবিতা পড়ে ফোনে শুনাই। এরপর বন্ধুদের আড্ডায় এমনকি আমার প্রেমিকের সাথে কথা বললেও রাইসুর প্রসঙ্গ আসত। কারণ রাইসু ফেসবুকে সাহিত্যের পাশাপাশি সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে কনসার্ন এবং তার মতামত ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাইসুর মতামত, চিন্তাধারার জন্য ফেসবুকে অনেকেই রাইসুকে ফলো করেন এবং অফলাইনে এ নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠেন।

রাইসুর ওপর মানুষের রাগ হয় অনেক এটা দেখা যায় খুব। আমারও হয়। ফেসবুকে উনার একচেটিয়া প্রভাব, অন্যের লজিককে মুহূর্তে খারিজ করে দেয়া এগুলো স্বাভাবিকভাবেই অন্যকে অ্যাগ্রেসিভ করে তোলে। তখন আমরা তার সম্পর্কে নেগেটিভ কমপ্লিমেন্ট দেই। আমিও দিয়েছি আড়ালে। বলেছি, উনি নিজের প্রতি বেশি মুগ্ধ থাকেন, অন্যকে অ্যাপ্রিশিয়েট করেন না, এটা ঠিক না।

২০১৫ সাল। আমার মনে হল আমার কবিতা নিয়ে নিজে নিজে একটা বই বের করব। প্রিন্টিং, প্রকশনা নিয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না আগের। মাত্র বছরখানেক হল লিখছি কবিতা, তা নিয়ে বের করে ফেললাম নিজ দায়িত্বে একটা বই। বই মেলায় গিয়ে দেখা হল রাইসুর সাথে। আমি হ্যান্ডশেক করে প্রথম সামনাসামনি পরিচিত হলাম রাইসুর সাথে। রাইসু আমাকে চিনতে পারবে এটা আমি ভাবি নি। তার চেয়ে আমার সাথে আমার এক বন্ধু ছিল সে রাইসুর মহা ভক্ত, সে বেশি অবাক হয়েছিল যে রাইসু এভাবে নিজে থেকে আমার সাথে পরিচিত হল। আসলে রাইসুর মানুষের সাথে সহজভাবে মেশার ভঙ্গি আর আকর্ষণীয় হাসি মানুষকে প্রভাবিত করে।

আমি দেখলাম, রাইসু আমার বই বের হবার ব্যাপারটাও জানতেন। তার মানে উনি অন্যদের ব্যাপারেও খবর রাখেন। তো তখন আমার সাদ রহমানের সাথে ভাল বন্ধুত্ব ছিল। সাদ রহমান পেছন থেকে রাইসুকে ঈর্ষা করে যাইত। সামনে গিয়ে পরিচিত হবার মতন গাটস ছিল না তখনও। রাইসু আমাকে ইন্টারভিউ দিতে বলছেন, এটা শুনে সাদ বলল, আজ তোমারে দেখতে সেক্সি লাগতেছে তো তাই বলছে আর কি!

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার পেছনের সাইটটাতে বেঞ্চি ছিল। রাইসু বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিকদের হ্যান্ডিক্যামে ইন্টারভিউ নেয়াচ্ছিলেন দুজন ছেলেমেয়েকে দিয়ে। আমাকে দেখায়ে বললেন, উনার একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে নেন। ছেলেমেয়েগুলা যখন ওকে বলল, তখন আমি বললাম, আমার আসলে ইন্টারভিউ দিতে অস্বস্তি লাগে। রাইসু অবাক হলেন কিনা জানি না। ছেলেমেয়ে দুইটা নিশ্চয়ই আমাকে বেকুব ভাবছিলেন কারণ রাইসুর উদ্যোগে কোনো ইন্টারভিউ যাবে এটা কেউ না করত না অন্তত।

পরে আমি যখন তানিমকে বললাম, সে বলল, ইন্টারভিউটা না দিয়ে ভুল করছ। আসলে আমি তখনও রাইসুর ব্যাপারে ততটা জানতাম না বা বুঝে উঠতে পারি নাই। পরে দেখলাম, সে ইন্টারভিউগুলোতে, কামু ভাই এবং তানিমের ইন্টারভিউ ছিল। কিন্তু আমার আফসোস করারও উপায় নাই। আসলেই আমার অস্বস্তি লাগে।

এরপর রাইসুর সাথে মাঝে মধ্যে চ্যাট হত। কিন্তু অকারণে আলাপ করার ইনটেনশান তার ছিল না। সাদ এরপর রাইসুর অনেক ভক্ত হল এটা ফেসবুকে দেখতে পেলাম। কিন্তু মেয়েদের বলত, রাইসু শুধু সেইসব মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক করে যাদের সাথে ফিজিক্যাল অ্যাটাচম্যান্টে যায়। ব্যাপারটা আমার কাছে বিরক্তিকর ঠেকল। আমি সাদের বিরুদ্ধে রাইসুর কাছে বদনাম গাইলাম। রাইসু কইল, সে না আপনার বন্ধু! আপনি তার বদনাম গাইতেছেন! আমি বোকা বনে গেলাম।

একদিন রাইসুকে বললাম, “আপনার সাথে দেখা করি। আমার কাছে হুইস্কি আছে আপনার জন্য নিয়ে আসি।”

রাইসু বলল, সাদকে টাইম ফিক্সড করতে বলেন, আর সাদকে থাকতে হবে অবশ্যই।

সাদ তখন রাইসুর সাথে কাজ করে সাম্প্রতিক ডটকমে। সাদকে জানালে সাদ বলে, তুমি চলে আসো পান্থপথের বাসায়। বললাম, বাসায় কেন? অফিস কোথায়? বলে, বাসা অফিস একসাথেই, আসো।

আমি সাদকে বললাম, রাইসু তোমাকে থাকতে বলছে।

সাদ বলে, “আমি থাকতে পারব না। তুমি আসো, প্রবলেম কী!”

পরে সাদ এসে আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেল। সাথে সাদের বান্ধবীও ছিল। সাদ আর আমি মিলে নুডলস রান্না করলাম। রাইসু খাবার দেখে বলল, বাহ! কী সুন্দর দেখতে হইছে রান্নাটা! আমি বুঝলাম, এই লোকটার ভদ্রতাবোধ চরম। এভাবে প্রশংসা করতে জানে না অনেকে। আমরা নুডলস খাবার পর চারজনে ভাগাভাগি করে হুইস্কি খেতে বসলাম। রাইসু আমাকে আর সাদের বান্ধবীকে খাটে বসতে দিলেন। সাথে ডিসিশান হল আমরা একটা অ্যানিম্যাটেড মুভি দেখব। রাইসু আমাকে আর সাদের বান্ধবীকে পা তুলে আরাম করে বেডে বসতে বললে, সাদ রিঅ্যাক্ট করল যে, কখনও আমাদেরকে তো এ অনুমতি আপনি দেন না রাইসু ভাই!

আমি স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ। আসার সময় রাইসুকে বলে এলাম, বাসায়ই সময় কাটান বেশি মনে হয়, হাঁটাহাঁটি করবেন নয়ত স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে। উনি যেভাবে বিনয়ের সাথে আমাদের ওয়েলকাম করেছিলেন, বিনয়ের সাথে আমাদেরকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।

রাইসুর একবার টাকার সংকট। এ নিয়ে তিনি একটা পোস্ট দিলেন ফেসবুকে। ওপেন লোকের কাছে টাকা ধার চাইলেন। কেউ কেউ সাড়াও দিলেন টাকা ধার দিবেন বলে। রাইসুর এভাবে ওপেন টাকা ধার চাওয়ার ব্যাপারটা আমি তার সাথে দেখা হলে অ্যাপ্রিশিয়েট করলাম। আমি মাঝে মধ্যে এমন হেভি টাকার ক্রাইসিসে পড়ি। এবং ধার নেই। রাইসু প্রায়ই টাকার সংকটে পড়ে। একবার আমি বললাম যে, আমি কি ফয়সল নোইকে বলব আপনাকে টাকা ধার দিতে? বললেন, ফয়সলের কাছ থেকে অনেক ধার নিয়েছি, ফেরত দেয়া হয় নি। আর নিতে চাই না। আমার বন্ধু যে রাইসুর মহাভক্ত, সে বলছিল একদিন, এই লোকটা না জানি টাকার অভাবে না খেয়ে, না পড়ে মারা যায়!

রাইসু কিছুদিন পর পর নতুন নতুন বিজনেস আইডিয়া দাঁড় করান। দীর্ঘ কবিতা নিয়ে পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নেন তিনি। বিজ্ঞাপনদাতা খুঁজছিলেন। আমার এক বন্ধু রাজনীতি করে সে আমাকে একবার পত্রিকা বের করতে বলে, বিজ্ঞাপন কালেকশান করে দেবার দায়িত্ব তার বলে। আমি রাইসুকে জানালাম, আমি আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে আপনাকে বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে হেল্প করতে পারি। তবে নিশ্চয়তা আমি দেব না কারণ পলিটিক্স করে এমন লোক কথা দিয়ে কথা রাখে না। কিন্তু রাইসু খুব আশাবাদী ছিলেন যে নিশ্চয়ই অনেক বিজ্ঞাপন পাবেন। সে আশা ভণ্ডুল হল। আমি আমার বন্ধুটির সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগের কিছু পরে তাকে আর খুঁজেই পাচ্ছি না।

ঘটনাচক্রে আমার রাইসুর সাথে দেখা হল মোতালেব প্লাজার ওখানে। উনি টাকা কালেকশানে নেমেছেন। আমাকে নিয়ে গেলেন বেইলি রোড টাকা কালেকশানে সঙ্গ দেয়ার জন্য। আমি খুব কমফোর্ট ছিলাম না রাইসুর সাথে এভাবে ঘুরতে বের হয়ে। সঙ্গী হিসেবে আমি কম কথার মানুষ। রাইসু বুঝতে পেরে বিভিন্ন কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন আমাকে ইজি করার জন্যে। এবং ততটা সহজ হয়ে আমার সাথে বেড়াচ্ছিলেন। পরিবাগের ওভারব্রিজের ওখানটায় এসে বললেন, এখানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অফিস ছিল আগে। আমাদের এক বন্ধুর বড় ভাই জব করতেন এখানে। আমরা বন্ধুর বড় ভাইয়ের কম্পিউটারে ফ্রি ইন্টারনেট ইউজ করতাম এ অফিসে তখন।

বেইলি রোডে হাঁটতে গিয়ে একটা বইয়ের দোকান পাস করতে গিয়ে আবার পেছনে ব্যাক করে বললেন, আসেন এই দোকানে ঢুকি, একটা লোক বসে আছে। লোকটা রাইসুকে তার আপকামিং বইয়ের কথা বলে টিটকারি করে কী যেন বলছিলেন। রাইসু হাসি দিয়ে উত্তর দিয়ে চলে আসলেন। আমাকে বললেন, উনাকে চেনেন? বললাম না তো, উনি কে? বললেন, দাউদ হায়দারের ভাই, উনারা পাঁচ ভাই এবং সবার নাম বলতেছিলেন।

ওখান থেকে আমরা শাহবাগে আসার পথে ফোন আসল, রাইসুর ছোট ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এরকম নাকি প্রায়ই হয়। পুলিশ কিছুদিন পর পর উনার ভাইকে ধরে নিয়ে যায় টাকার দরকার পড়লে। কোনো একটা মামলা ডিসমিস না হবার কারণে এ সমস্যা চলতেছে বহুদিন ধরে। রাইসু পারমিতা হিম এবং ফয়সল নোইকে এ ব্যাপারে হেল্প করতে বললেন। প্রথমে তিনি শুধু ফয়সল নোইকেই বললেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে উনি ওরকম পরস্থিতিতে আমার মতামত জানতে চাইলেন যে আর কোনো সোর্স ইউজ করবেন কিনা এবং সে মত গ্রহণও করলেন। রাইসুর এই ব্যক্তিত্ব যদি সবসময়ের হয় তাইলে লোকে তাকে অনেক ভালোবাসে জানি। কারণ যে পাশের মানুষকে গুরুত্ব দেয় পাশের মানুষটিও তাকে আপন ভাবে। ফয়সল নোই আশ্বাস দিলেন কাজ হয়ে যাবে।

রাইসু আমাকে বললেন, শাহবাগে আমার বন্ধুরা কই? উনি তাদের সাথে পরিচিত হতে চান। বললাম, আমার বন্ধু তো তানিম, রুদ্র ওরা। আর ভার্সিটির কিছু বন্ধু আছে, ওরা আপনার খুব ভক্ত। জানতে চাইলেন, কারা? তারা কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে? আমি বলতেছিলাম, জামিলের সাথেও আড্ডা হয়েছিল কিছুদিন। বললেন, জামিল কে? বললাম, সাইয়েদ জামিল। আমার কাছে জানতে চাইলেন, উনি খুব পপুলার কেউ নাকি? আমিও সুযোগ পেয়ে বলে দিলাম, জামিলের লেখা গাঁইয়া টাইপ পোলাপানেরা খুব খায়।

পরে আমরা বন্ধুরা কোথায় কোথায় আড্ডা দেই সে জায়গাগুলো ঘুরে দেখলেন। এরপর সাদকে ফোন করলে আমাদের সাথে জয়েন করলে আমরা ফয়সল নোই’র আড্ডাখানায় গেলাম। আমি বিয়ার খেলাম, রাইসুর পছন্দ হুইস্কি। রাইসু বলল, আপনি সিগেরেট খান না মারিয়া? আমি বললাম, না। বলল, আমিও খাই না। রাত ১০টার পর রাইসুর ছোট ভাই থানা থেকে ছাড়া পেলেন। পারমিতা হিম নাকি থানায় কঠিন ধমক দিয়েছিলেন। ১১টায় আমরা ব্যাক করি ফয়সল নোইয়ের বন্ধুর গাড়িতে আমি, রাইসু, ফয়সল নোই, সাদ। এবং আমাদের বাসা সবার কাছাকাছি দূরত্বে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সাদ আমাকে বলছিল, তুমি কি আজ রাইসুর সাথে যাবা? উত্তরে আমার হাসি ছাড়া আর মুখ দিয়ে কিছু বের হইল না।

আমি রাইসুর ব্যাপারে আলোচনা করি আমার একাডেমিক বন্ধুদের সাথে। আগেই বলেছিলাম, ওরা রাইসুর ভক্ত। একদিন বলতেছিলাম, আমি ঢাকা শহরে রাইসুর মত এমন স্মার্ট এবং ভদ্রলোক দেখি নাই। তখন আমার এক ফ্রেন্ড বলতেছিল, রাইসুর সাথে তোমার দেখা হয়েছিল কয়দিন? আর আমাকে জেলাস করছিল কারণ সে রাইসুর সাথে আড্ডা দিতে চায়। কিন্তু রাইসু তারে পাত্তা দেবে কিনা এ নিয়ে সংশয়। রাইসুর সাথে আমার সামনাসামনি আড্ডা হয়েছিল দুইদিন। বই মেলায় দেখা হয়েছিল দুই একদিন। কোনোদিন একসাথে ছবি তোলা হয় নি। রাইসু, এজন্য ছবি দিতে পারলাম না।

কিন্তু আমি নিশ্চয়ই আপনাকে মিস করি। তবে, আমি আপনার দূরের বন্ধু, তাই না? লাস্ট যে দুটো স্বপ্ন দেখছিলাম আপনাকে নিয়ে, আপনার সাথে দুজন কবি (মেয়ে) ছিল। প্রথমজনের স্বপ্নের ব্যাপারে জেনে আপনি কিউরিয়াস ছিলেন। পরেরজনের ব্যাপারে বলতে গেলাম, আপনি আমাকে এরপর আর স্বপ্নের কথা বলতে মানা করে দিলেন।

আচ্ছা, আপনার পঞ্চাশ হয়েছে! কই? আমার তো ত্রিশের কোটায় মনে হল আপনাকে।

Facebook Comments

Leave a Reply