রাইসু দ্য গ্রেট

‘রাইসু দ্য গ্রেট’ লিখতে গিয়া মনে হইল ডায়োজিনিস দ্য ডগে’র কথা। দার্শনিক ডায়োজিনিসরে নিয়া যেসব কাহিনী প্রচলিত আছে তা দিয়া ডায়োজিনিসের প্রতি একটা মুগ্ধতা আছে আমার। তার থিকাও বেশি মুগ্ধতা আছে দার্শনিক ব্রাত্য রাইসুরে নিয়া থাকা কাহিনীতে।

বিখ্যাত মানুষেরা তার নাম নানা জায়গায় উচ্চারণ কইরা গেছেন বইলা আমার বিন্দু পরিমাণ তার প্রতি মুগ্ধতা ক্রিয়েট হয় নাই। বরং, মুগ্ধ হইছি তার খালি পায়ে হাঁইটা বেড়ানোর কাহিনি দিয়া। ফুটপাথে বইসা থাকা কোনো ছোটলোকেরে ‘সাহিত্য কী?’ প্রশ্ন জিগানের মধ্য দিয়া এক্সিপেরিমেন্ট করার ঘটনা দিয়া। প্রেমিকারে লেখা চিঠি দিয়া।

রাইসুর যাপনের প্রতি মুগ্ধতার অধিক তার কর্মের প্রতি মুগ্ধতাই আমার বেশি। রাইসু যে ১৮-২১ বয়সের রেঞ্জ দিয়া বেশ সাড়া ফেলছে তাতে আমার এক ফুটাও আগ্রহ নাই। এই রেঞ্জের মেয়েদের নিয়াই তো আছি! বরং, তার প্রেম নিয়া, সংসার নিয়া লেখাগুলা আমার প্রিয়। কাজে দিছে মেলা।

শেখ সাদ্দাম হোসাইন

অক্টোবর ৭, ২০১৫ তে ব্রাত্য রাইসু আমারে রিকোয়েস্ট পাঠান। সম্ভবত তারও দুইমাস আগে তারে আমি ফলো দেই নাদিয়া ইসলামের রাইসুর পোস্ট শেয়ার দেয়ার বরাতে। তখন আমি বেশ ব্লগারদের লেখা-ট্যাখা (ট্যাখাই) পড়ি।

ট্যাখা হয়ে উঠতে রাইসুর সাহিত্য, দর্শন, বুদ্ধিজীবিতাই কেন আমার মধ্যে কাজ করল? কেননা, সমগ্র রাইসুতেই আমি কোনো বায়াসনেস খুঁইজা পাই নাই যা পাইছি অন্যান্যদের (এই অন্যান্যরা আমার কাছে অই সময়ে ১৫’তে যারা বা যাদের চিন্তা গুরুত্ব বহন করত লাইক: হুমায়ুন আজাদ, তথাগত প্রগতিশীল ব্লগারগণ) মধ্যে। এর মানে এই নয় যে ব্রাত্য রাইসু দিয়ে আমি কাঠমোল্লা হইছি! আমি বরং যে কোনো মোল্লাগিরির বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জায়গাটাই খুঁজে পেয়েছি ব্রাত্য রাইসুর মধ্য দিয়ে।

এর বাইরেও আমার সমাজ দেখার ভঙ্গি, মানুষ, জীবন, হোল ইউনিভার্সকে দেখার ভঙ্গিতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসল রাইসু। নীতি, আদর্শ, সম্মান, শিক্ষা, অশিক্ষা, মিক্লা, এলিটদের লগে কেমনে ফাইট দিবেন, পুরানা বন্ধু থিকা সাবধান, ছোটলোক, সত্য-মিথ্যা হিপোক্রিসি, ভাষা’র ভঙ্গি, বলার ভঙ্গি এসবের ভেতর দিয়া একটা চিন্তাজগত ভেতরে গ্রো করতে থাকল।

সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্টতা রাইসুর মধ্য দিয়েই বাড়তে থাকল। রাইসুর মধ্য দিয়েই আরো বেশি লিটারেচারের কাছাকাছি যাওয়া হইতে থাকে।

চিন্তার স্পেসটা হিউজ হয়ে উঠল রাইসু প্রবেশের মধ্য দিয়ে। ব্রাত্য রাইসুর চাইতে বেশি কে সাহিত্য নিয়া কথা বলে? কে এত ডাইভারসিফাইড চিন্তা করে? রাইসুর চিন্তার কাছে এইভাবে অনেক লেখকদের লেখা, ব্লগারদের লেখা ট্যাখায় পরিণত হয়।

পরে কত সাহিত্যিকদের লেখা, সমসাময়িক সাহিত্যিকদের লেখা ট্যাখায় পরিণত হইছে সে এইখানে আর বলব না। অন্য কোথাও বলব।

রাইসুর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাইয়া আমি বেশ খুশি হইছিলাম। রাইসু আমারে পাঠাইলেন রিকোয়েস্ট? পাঠাইছেন এবং প্রভাবিত করছেন। প্রথমে, তার ছোট ছোট এক-দুই লাইনের পোস্টের নিচে ব্রাত্য রাইসু হ্যাস ট্যাগে লেইখা তারিখ দিয়া রাখারে আমি সমালোচনা না তো অ্যাট্যাক করলাম। তারে বদহজম হইল আমার। কইলাম এইসব অগুরুত্বপূর্ণ লেখা আবার তারিখ নাম দিয়া লেখতে হয়? উনি ভাব-গম্ভীর সিলেব্রিটি বনে যাওয়া লেখকদের মতো কমেন্ট এড়ায় গেলেন না। যতটুকু মনে পড়ে এরকমই রিপ্লাই দিলেন—লেখাগুলি পরে যাতে সহজেই পাওয়া যায় সেই ট্র্যাক রক্ষার্থেই এইটা করা।

এইখানে বইলা রাখি আমি রাইসুর কমেন্টের ভক্ত। তার কমেন্টের স্টাইল, বোল্ডনেস সেকেন্ড আর কারো মধ্যে পাই নাই। আর তার এই কমেন্ট চর্চা আমি নিজে করতে হইলে কোথায় পৌঁছাইয়া আমার করা লাগবে তা আমি টের পাই।

রাইসুরে কিছুদিন ভাল্লাগে কিছুদিন লাগে না এর ভিতর দিয়া মেলাদিন গেছি। এই তার অহং আবার এই তার বিনয়; এই তার ভিক্ষাবৃত্তি আবার এই তার এলিটিয়ানা—এইভাবে আলাদা কইরা বেশ কিছুদিন চিন্তা করছি। ভাল্লাগে আবার ভাল্লাগে না। তখনও ছিলাম ভালো লাগানো বা না লাগানোর মধ্যে—মানে কিছু একটা লাগানোর মধ্য দিয়া সে যে থাইকা যাইতেছে সেটা টের পাইতে থাকলাম।

এর মধ্যে জার্মান দার্শনিক নিটশে’র সাথে আমার পরিচয় হইল। নিটশে’র বোল্ডনেস আমারে বেশ অ্যাট্রাক্ট করল। নিটশে যে নিজের দেশের না এবং মৃত দার্শনিক এবং জার্মান তাই নিটশে’র বোল্ডনেস পজিটিভলি গুরুত্ব সহকারে নিলাম। আসলে আমি যে সহজাত ভাবেই বোল্ডনেস পছন্দ করি তা পরে রিয়ালাইজেশন হইলে, বোল্ডনেসে রাইসু যে তার মতো কইরা উস্তাদ সেটা বোধগম্য হয়। আমি তারে ভালবাইসা ফেলি। নিটশেরে ভালোবাসার আর রাইসুরে ভালবাসায় অন্যতম কারণ এই দুই ব্যাক্তির বোল্ডনেসের তীব্রতা।

রাইসু শ্রেণিচর্চার যে ব্যঙ্গাত্মক ছবি ফুটিয়ে তোলে তা এক বিশাল শক্তির জায়গা তার। মর্যাদা নিয়া তার লেখা আমার অত্যধিক প্রিয়। রাইসু উৎকৃষ্ট মানের ভাষাবিদ। তিনি শব্দের অর্থ বদলায় দিতে পটু এবং শব্দের অর্থ ক্রিয়েট কইরা বা প্রচলিত অর্থ দিয়া সে শব্দের ভিতরেই তর্ক রাইখা আলোচনা চালায় যান সুনিপুণ ভাবে।

কবিতা বলতে এযাবৎ পড়াদের মধ্যে ব্রাত্য রাইসু আর চার্লস বুকোওস্কির কবিতা আমারে বোর করে নাই। নইলে কবিতা মাত্রই আমার কাছে বোরিং আর দুঃখভারাক্রান্ত বিষয় ছিল। আমিও এরকম কবিতার চর্চাও করছি। পরে নিজের কবিতাই অখাদ্য ঠেকছে। অত আবেগ আমার কখনোই ভাল্লাগতো না। তবু আমার প্রেম করতে ভরপুর আবেগের আশ্রয় নেয়া লাগছিল। রাইসু যে ছন্দে সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক, দার্শনিক চর্চা বিদ্যমান রাখছে তা সাহিত্যিকদের আড্ডা কেন্দ্রিক আলোচনা থিকা বাইর হইয়া আসতে শুরু করছে। লেখক-লেখক যে আলোচনা তা পাঠক সাধারণে ছড়ায় পড়তেছে।

রাইসু তরুণ বয়সীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেছে ক্রমাগত। এইটা একটা গুড লক্ষণ। একটা সক্রেটিক কালের অবতরণ ঘটতে যাইতেছে বাংলায়। একটা বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বার সুস্পষ্ট প্রসারিত হইতেছে।

রাইসু ঋত্বিক ঘটকের মুভি তার ভাল্লাগে না বইলা তার ইন্টারেস্ট জানাইছিলেন। সেখানে আমিও আমার ইন্টারেস্ট জানায়ছিলাম আমার ভাল্লাগে। অনেকে তার ইন্টারেস্ট থাকা না থাকারে বেশি গুরুত্ব আরোপ কইরা ভুল ইন্টারপ্রেট করেন যে রাইসু তাদের খারিজ কইরা দিতেছেন কোনো কারণ না দর্শাইয়া। ইন্টারেস্ট নাই—এইখানে কারণ দর্শানের আছে কী।

রাইসুরে আমি এযাবৎ একবারই স্বপ্নে দেখছিলাম। একটা মেসের মতো রুম। দুইটা তোশক ফেলা ফ্লোরে। ময়লা চাদ্দর বিছানো দুইটাতেই। একটায় ফরহাদ মজহার বইসা আছেন, আরেকটায় রাইসু দেয়ালে ঠেস দিয়া গা হেলাইয়া আছেন। আমি লুঙ্গি পইরা দাঁড়ায় আছি। তারা লুঙ্গি পইরা বইসা, হেইলা আছেন। রাইসুর হাতের পাশে ফ্যানের সুইচ সে সুইচ সে খালি বন্ধ করতেছে আবার চালু করতেছে। মজহার ধ্যানে আছে, আমি খাঁড়ায় আছি। স্বপ্ন এইটুকুই।

আমি যে রাইসুরে ভালোবাসি এই দিয়া সলিমুল্লাহ খানরে ভালোবাসে এমন একজনের লগে বাঁধাবাঁধি না আর কি একটু লাগলো। নামে না যাই। সে প্রথমে সলিমুল্লাহরে এমন একটা বুদ্ধিজীবীর জায়গা দিতে চেষ্টা করল যে রাইসুরে একটা গৌণ বিষয়ে নিয়া গেল এবং আমারে সে গৌণ বিষয়ে সময় অতিবাহিত করার দলে ফেলল। সে পরে রাইসু প্রেমে মজছে কি মজে নাই জানি না, তয় সলিমুল্লাহ খানরে এখন বুদ্ধিজীবী কয় না, মাস্টার কয়। আমার ভালোবাসা আগের জায়গাতেই রইয়া গেছে রাইসুর বুদ্ধিজীবিতার প্রতি।

রাইসুরে আমি কোনো দার্শনিক ফ্রেমে ফেলতেছি না জাস্ট মনে হয় অ্যাবসার্ডিস্ট, অ্যানার্কিক, স্কেপটিক, যুক্তিবাদী। অ্যাবসার্ডিস্ট মনে হওয়ার কারণ জীবনকে ঘিরা যে অর্থ এবং অর্থহীনতা বিরাজ থাকে তারে ব্যঙ্গাত্মক ভাঁড়ের ভূমিকায় তিনি চিত্রায়ন কইরা দিতে থাকেন। বাকিগুলা আরো অনেকেরই মনে হয়। কিন্তু কেউ তারে অ্যাবসার্ডিস্ট কইতে চায় নাই।

রাইসুরে আমার কখনোই যেটা মনে হয় নাই তা হইল চরমপন্থি। রাইসু কোনো জায়গাতেই চরমপন্থি না। রাইসু লইড়া চইরা, হেইলা দুইলা চলে। জীবনরে দেয় এক সহজ গতিময়তা। রাইসু ক্ষমতা চর্চার নৈতিকতায় আস্থা রাখে না বইলা তারে নীতিবাদীও ঠাওরাই না। নিটশে’র জরথুষ্ট্রা দিয়া বলছেন কেউ আমারে আদর্শে রাইখা তার পথ চলুক তা আমি চাই না। নিটশে’র মতোই রাইসুরে কোনো একটা আদর্শ মনে জইপা আদর্শ সমাজ, জাতি গইড়া উঠুক চায় নাই বইলা মনে হইছে। ইন্ডিভিজুয়াল তার সহজাত সরল জীবনকেই আদর্শ জ্ঞান করুক এইটাই সম্ভবত রাইসু চায়।

ম্যান্দামারা সাহিত্য থিকা প্রাণবন্ত, সজীব সাহিত্য চর্চার দিকে রাইসু আমাদের নিয়া যাইতেছেন। রাইসুর যে ভাঙন ক্ষমতা এইটা এই অবলা হইয়া থাকা কান্দাকান্দির বাংলায় জারি থাকন দরকার। তাইলে যদি অবলা ভাইঙ্গা সবল হয়, তাইলে যদি কান্না ভাইঙ্গা মুখে হাসি ফোটে।

Facebook Comments

Leave a Reply