রাইসু—দ্য বস

আমার ইচ্ছা আছে একদিন উনার লগে অনেক আড্ডা দিব আর সেই আড্ডাটা ইন্টারভিউয়ের বই আকারে ছাপাব।

রাইসু আর আমি পরস্পরকে বস বইলা ডাকি। আমাদেরে কেউ পরিচয় করায় দেয় নাই। ফেইসবুকেই আলাপ হইছে। তবে আমি উনার নাম জানতাম বহু আগে।

২০০৭ সালে ঢাকায় এক বাসায় গেছিলাম, সেইখানে এক আপু বলতেছিলেন যে ঊর্দু নাকি ব্যারাকের ভাষা। সৈন্যদের ব্যবহারের জন্য। আমি দুর্বলভাবে প্রতিবাদ করতে চাইলাম এই বইলা যে ঊর্দু আসলে খুবই কাব্যিক ভাষা যে কারণে হিন্দি গানে প্রশংসা কইরা বলে ‘যিস কি জুবান উর্দু কি তারাহ’ (মানে যার কথা ঊর্দুর মতন)।

তো যার সঙ্গে গেছিলাম, সেই বড় ভাই বললেন, “ওর কথা ছেড়ে দাও, ও রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কাউকে কবি বলেই মানে না।” তখন আরেকজন বললেন, “রবীন্দ্রনাথ আর ব্রাত্য রাইসু ছাড়া।” তখনই আমার একটু আগ্রহ হইছিল কে সেই ব্যক্তি যার নাম রবীন্দ্রনাথের ঠিক পরেই আসতেছে।

উম্মে ফারহানা

সম্ভবত বান্ধবী হুমায়রার বাসায় রাইসুর আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি নামের কাব্যগ্রন্থখানা দেখছিলাম। কাচের আড়াল দেওয়া শেলফে তালামারা ছিল দেইখা বইটা হাতে নিয়া উল্টায়া পাল্টায়া দেখতে পারি নাই। ২০১৩ বা ২০১৪ তে ফেইসবুকের কল্যাণে রাইসুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। আমি উনার সাহিত্য ডটকম নামের অনলাইন পত্রিকায় লৌহিত্যের ধারে  নামে একটা ধারাবাহিক লেখা শুরু করি। লেখার নাম ইত্যাদির ব্যাপারে যখন উনার সঙ্গে ফোনে কথা হইতেছিল তখন আমার মেয়ে (প্রকৃতি আনন্দময়ী, বয়স তখন ৮/৯ বছর) বলল, “ব্রাত্য রাইসু তোমারে ফোন করছিল? উনি তো অনেক বিখ্যাত লোক।”

আমি একটু বিস্মিত হইলাম। রাইসু বিখ্যাত বটে, কিন্তু আমার মেয়ে সেইটা জানল কেমনে? প্রকৃতিকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল, “হুমায়ূন আহমেদ তাকে একটা বই উৎসর্গ করছেন।”

পরে আমি রাইসুর অটোগ্রাফ সম্বলিত আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছির একটা কপি সংগ্রহ করলাম, প্রকৃতির নামে সই কইরা দিতে বললাম, সে বড় হইয়া পড়বে।

“প্রকৃতির বয়স আজকে (৪ ডিসেম্বর ২০১৭) ১১ হইল, প্রকৃতির সঙ্গে আমার ছবিটি এ বছর জানুয়ারিতে কক্সবাজারে তোলা।”—উম্মে ফারহানা

রাইসুর বিভিন্ন পোস্টে আমি মন্তব্য করতে যায়া প্যাঁচ খাইয়া গেছি অনেকবার। তাই মন্তব্য করাও বাদ দিছি, ইনবক্সে আবার উনি সেই ব্যাপারে কথা বলেন না। যেভাবে উনার সকল মতামত পাবলিক এবং অকপট (অল্পবয়সী মেয়েদের প্রসঙ্গে উনার আগ্রহ কিংবা পক্ষপাতসহ) সেইটা আমারে মুগ্ধ করে।

আগেও আমি আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে চেষ্টা করতাম, ঠিক যুইত পাইতাম না। রাইসুর কাছ থাইকা এই ব্যাপারে খানিকটা সাহস পাইছি। তবে কথা বলার সময় যে প্রমিত ভাষায় কথা বলার দরকার আছে, নাইলে লোকে ভাবতে পারে যে আমি ‘শুদ্ধ’ ভাষা বলতেই পারি না সেইটাও রাইসু মনে করায় দিছেন।

রাইসুর ব্যাপারে যে কথাটা না বললেই না সেইটা হইল আমি উনার মতন ভদ্র সম্পাদক আর দেখি নাই। কলেজে পড়ার সময় বিভিন্ন পেপারে আর ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাইতাম। অধিকাংশ সময়েই ছাপা হইত, কিন্তু পাঠকদের মধ্যে যারা লেখে তারা আসলে অল্প শিক্ষিত এইটা ভাইবাই কিনা জানি না সম্পাদকেরা কিছু না কিছু কাটছাট করতেন কিংবা শব্দ এইদিক-ওইদিক কইরা দিতেন। দরকার না থাকলেও যে শব্দ আমি লিখি নাই সেইটা জুইড়া দিতেন, যেটা লিখছি সেইটা বাদ দিতেন। উনারা হয়ত ধইরাই নিছিলেন সম্পাদনা মানেই লেখায় কিছু না কিছু ট্যাম্পারিং করতে হবে। অথচ রাইসু খুব শক্ত যুক্তি থাকা স্বত্বেও আমার সাথে আলাপ না কইরা একটা দাড়িকমাও এইদিক-সেইদিক কইরা কোনো লেখা আপলোড করেন নাই। উলটা আমি আপলোড হইবার পরে অনেক ব্যক্তিগত কারণে লেখা বা লেখার সঙ্গের ছবির ক্যাপশন পাল্টাইছি। উনি একবারের জন্যেও বিরক্ত হন নাই বা বলেন নাই যে নেক্সট টাইম থাইকা যেন নিশ্চিত হইয়াই লিখি।

যখন উনি কোনো কিছু বাদ দেওয়া বা পাল্টানের দরকার হইতে পারে মনে কইরা কথা কইছেন সেইটাও এত সুন্দর কইরা বলছেন যেন আমি খুব আহামরি কেউ, আমার ইচ্ছার উপরেই নির্ভর করতেছে জিনিসটা আমি পাল্টাব কি না, সেই অংশটা রাখব কি না। এতে আমার আত্মশ্লাঘা তৃপ্ত হইছে বইলাই আমি খুশি হইয়া উনার প্রশংসা করতেছি এমন না। আমার মনে হয় একজন স্মার্ট সম্পাদক কখনোই নিজে লেখার উপর কাঁচি চালাবেন না, যা পাল্টানোর সেইটা লেখকের হাত দিয়াই পাল্টাবেন। এই স্মার্টনেস আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে বিরল।

পড়ুন: উম্মে ফারহানার আরো লেখা

রাইসু কখনো আমার বাসায় আসেন নাই, আমিও উনার সঙ্গে কোথাও বইসা কফি খাই নাই। তবে আমার ইচ্ছা আছে একদিন উনার লগে অনেক আড্ডা দিব আর সেই আড্ডাটা ইন্টারভিউয়ের বই আকারে ছাপাব। ততদিনে আমিও বেশ বিখ্যাত লেখক হইয়া যাব, রাইসুরে যারা পছন্দ করে আর যারা করে না দুই দলই দেদারছে সেই বই কিনবে। আমিও বইয়ের লয়্যালটি পায়া বেশ বড়লোক হইয়া যাব।

ব্রাত্য রাইসুর জন্মদিনে এই আশা ব্যক্ত কইরা রাখলাম, নিরাশ কইরেন না বস।

(কভারের ছবি. উম্মে ফারহানা, ময়মনসিংহের নতুন বাজারে, রূপকের চায়ের দোকানে;ছবি. ফারহানা সুস্মিতা, ২০১৬)

Facebook Comments
More from উম্মে ফারহানা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *