রাইসু—ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড

দ্বিগুণ বয়সী এই লোকটার সঙ্গে মিশে মিশে কত কিছু যে আমি শিখছি! এই কয় বছরে আমার বয়স প্রতি বছর এক না, দশ বছর করে বাড়ছে।

আমি যে কোনো বিপদে পড়লে সবার আগে ফোন দেই রাইসুকে। এমন না যে সে সব সমস্যার সমাধান করে দিবে। কিংবা সে সমাধান করতে খুব একটা ইচ্ছুক। তারপরেও তাকে ফোন দিয়ে কান্দি। কিংবা দুঃখের কাহিনী শোনাই। রাইসু আমার প্রধান পরামর্শক। তার মাথায় এমন সব বুদ্ধি আসে যেইগুলা ম্যাকিয়াভেলি কিংবা রাসপুটিন ছাড়া কারো মাথায় আসতে পারে না। যে কোনো ঘটনাকে একেবারে অন্যরকম করে দেখার ওস্তাদ রাইসু।

তো একবার একটা বিরক্তিকর বিপদে পড়লাম আমি। সেটা ছিল এক প্রেমপ্রত্যাশী ছেলেকে নিয়ে। সে ছেলে নানা সময় নানারকম উপহার নিয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরে। আমি যতই রাগ দেখাই, ধমক দেই এবং দেমাগ দেখাই না কেন সে কিছুতেই দমে যাবার পাত্র নয়। বিপদের কথা হল, তার এবং আমার কাজের জায়গা একই। আমাকে তো প্রতিদিন সেখানে যেতেই হয়। একবার সে একটা শাড়ি নিয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরা শুরু করল। আমি যতই ধমক দেই বা রিফিউজ করি তার কিছুই যায় আসে না।

এই ঘটনার তো একটা বিহিত করা দরকার। তাই আমি রাইসুকে ফোন দিলাম এবং এর সমাধান চাইলাম।

রাইসু অবলীলায় বলল, শাড়ি নিয়া নাও।

আমি বললাম, নিয়া নাও মানে? এইটা তুমি কী কথা বললা? হের জিনিস কেন আমি নিতে যাব? আমি বসের কাছে নালিশ দিব। হের চাকরিটা যাইব। যাক।

পারমিতা হিম

রাইসু বলল, না, না, এইসব তুচ্ছ ব্যাপারে কখনো বসের কাছে যাবা না। তারা বিরক্ত হবে। এবং তোমাকে অদক্ষ মনে করবে। ভাববে—যে মেয়ে এত ছোট বিষয় হ্যান্ডেল করতে পারে না তো বড় কিছুতে তো তার ওপরে ভরসা করা যাবে না! কথায় কথায় বসের কাছে গিয়া কানবা না। তারা তোমারে অ্যাকসেস দেয় মানে এই না যে প্রতি কথায় তাদের কাছে গিয়ে কানতে হবে।

‘বস, ওই আমারে মুখ ভেঙাইছে’, ‘বস, ও আমারে পাত্তা দিছে না’ এইসব ফালতু বিচার দিতে যাবা না কথায় কথায়। তোমারেই আনস্মার্ট মনে করবে তাতে, বুঝছো?

আর এই ছেলে যতদিন চাকরিতে আছে ততদিন তোমার মঙ্গল। ততদিন তুমি তোমার বসের ভয়, চাকরির ভয় দেখাইতে পারবা। যদি চাকরি চলে যায়, আর এরপরে তোমার বাসার নিচে দেবদাস হইয়া ২৪ ঘণ্টা বইসা থাকে—তখন তুমি কী করবা? আছে তোমার মন্ত্রী মিনিস্টার বাপ-ভাই-চাচা? পাগল খেদাইব কেডা?

খুবই যুক্তিযুক্ত কথা। এইজন্যই তো আই লাভ রাইসু। রাইসু হইল আমার এক নম্বর ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। সে আমারে জীবনে যা যা বলছে, আমি তাই তাই করছি। রাইসুর সাথে যখন আমার সরাসরি পরিচয় ঘটে তখন আমার বয়স ২২, রাইসুর ৪৪। দ্বিগুণ বয়সী এই লোকটার সঙ্গে মিশে মিশে কত কিছু যে আমি শিখছি! এই কয় বছরে আমার বয়স প্রতি বছর এক না, দশ বছর করে বাড়ছে।

এই যেমন সে আমাকে শিখাইছে, তুমি যদি বড়লোক হতে চাও, তাহলে বড়লোকদের মত চলবা। ফকিরদের মত চলে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখবা না। যদি সাকসেসফুল হতে চাও, সব সময় এমনভাবে কথা বলবা এবং চলবা যে, তুমিই সাকসেসফুল। দেখবা সবাই তোমারে বড়লোক এবং সাকসেসফুল হিসাবেই মেনে নিবে।

এই থিওরি অ্যাপ্লাই করে আমি জীবনে কত যে উপকার পাইছি বলার মত না। যার ঢাকা শহরে বাড়ি গাড়ি সবই আছে সেও আমার মতন ফকিন্নিকে মনে করে মন্ত্রী মিনিস্টারের মেয়ে। অনেকেরই ধারণা আমি অডি গাড়ি দিয়া অফিসে যাই আর আসি আর বাসায় এসে হীরাখচিত কাপে কফি খাই।

আমি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাইছি যেটা সেইটা হইল পাওয়ারফুল হবার ইমেজ। দুঃখী মানুষের মত না কেন্দেকেটে আমি বরাবরই এমনভাবে চলি যেন কত ক্ষমতা রে আমার এই দেশে! ম্যাজিকের মত কাজ হইল জানেন! সব পাওয়ারফুল লোকজনও আমারে সমীহ করে চলে! হা হা।

যাই হোক, রাইসুর বিবেচনার উপর আমার খুব আস্থা।

তাই তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে আমি কী করব বলো এখন। এই ডিস্টার্ব আমি সহ্য করতে পারতেছি না। আর শাড়িটা নিলে সে ছেলে তো মনে করবে একটু যখন মোম গলছে আরো গলবে। তার প্রত্যাশা বেড়ে যাবে। সেটা তো আর করা যাবে না।

রাইসু বলল, আরে গাধা, শাড়িটা নাও। নিয়া বলবা, আল্লাহ্ এত কম দামি শাড়ি! আমি তো এত কম দামি শাড়ি পরি না!

খুবই বাজে বুদ্ধি মনে হইলেও রাইসুর বুদ্ধির উপরে আমি ভরসা রাখি। সে আমাকে বুঝাইল যে গ্রহণের ভিতর দিয়ে প্রত্যাখান করা হইল শ্রেষ্ঠ প্রত্যাখান। যতদিন প্রত্যাখান করবা, ততদিন সে তোমার পিছে পিছে ঘুরবে। তাই গ্রহণ করে ফেলো। গ্রহণ করার পরেও যখন দেখবে যে কিছুই বদলায় না, তুমি আগের মতই কাঠখোট্টা আছো, তার এই অধ্যবসায় কোনো কাজে আসে না, সে নিজেই একসময় ইস্তফা দিবে।

আমি ঠিক এ কাজটাই করলাম। আমি শাড়িটা নিলাম এবং খুব নিরানন্দ চেহারা করে শাড়িটা উল্টাপাল্টা করে বললাম, ইয়ে মানে ভালো, তবে কি, আমি না, এইসব কম দামি শাড়ি তো পরি না।

আমার অভিনয় এত ভালো ছিল যে আমার নিজেরই নিজেকে অস্কার দিতে মন চাইছিল। আর ওই ছেলে আমার এই এক ডায়লগে এমন ছ্যাঁকা খাইল যে উপহার নিয়ে তো দূরে থাক, নিজেও আর কোনো দিন আমার ছায়া মাড়ায় নাই।

রাইসুর এই ‘রিজেকশন থ্রু অ্যাকসেপ্টেন্স’’ বা ‘গ্রহণের মাধ্যমে প্রত্যাখান’ থিওরি আমার জীবনে বহু কাজে লাগছে।

তবে এই যে আমি বললাম রাইসুর সব কথা আমি শুনি এইটা সত্যি না। আমার এক্স বয়ফ্রেন্ডকে যখন আমি তালাক দিতে চাইলাম তখন রাইসু, একমাত্র রাইসুই আমাকে মানা করল। তার যুক্তি, সব ছেলেই ওর চেয়ে হয় একটু ভালো বা একটু খারাপ। মানে ঘুরেফিরে একই। তো এই একটুর জন্য ওকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না।

আমি কনভিন্স হই নাই। কারণ আমি জানি রাইসু আমারে এই উপদেশ দিলেও নিজে কখনোই এরকম ঘ্যানঘ্যানানি মূলক সম্পর্কে থাকবে না। কিন্তু ওই ছেলের ব্যাপারে রাইসুর স্ট্রং সাপোর্ট দেখে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কীভাবে ওর পক্ষ নিলা রাইসু আমি তো বুঝি না!

রাইসু বলল, কারণ ও তো অ্যাট লিস্ট সুন্দর। বাংলাদেশের ছেলেদের চেহারা দেখছ তুমি? হা হা।

আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড বিরহের জ্বালা সইতে না পেরে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেল লণ্ডন। সে ভাবছিল, এইখান থেকে চলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কোনো জ্বালা-যন্ত্রণা থাকবে না। ফল হইল উল্টা। লণ্ডন যাইয়া মনে হইল সে এক মুহূর্ত একদিন আমারে ছাড়া বাঁচবে না। সুতরাং এক বছর কষ্ট করে যে ভিসা লাগাইল, এক মাস শেষ হবার আগেই ভিসার খ্যাতা পুড়ে সে দেশে এসে হাজির হইল।

এইদিকে, আমি তো আর বিদেশ চলে যাই নাই যে আমার পরাণ তার জন্য পুড়বে! আমি আমার আগের সিদ্ধান্তেই অটল আছি। নো মোর দিস ঘ্যানঘ্যানানি, নো মোর প্রেম-পিরিতি। সুতরাং সে দেশে ফিরে আবার যখন আমার সাথে ঘ্যানঘ্যান করা শুরু করল আমার সিরিয়াসলি বিরক্ত লাগল।

সে নাকি লণ্ডন থেকে আমার জন্য কী উপহার নিয়া আসছে সেইটা দেওয়ার জন্য রিকশাওয়ালার ফোন থেকে একবার, সিএনজিওয়ালার ফোন থেকে একবার (যেহেতু তার নম্বর আমি ব্লক করে রাখছি সব ফোনে) এইরকম করে সারাদিন ফোন দিতে থাকে। একদিন আমি নিজে তারে ফোন করে বললাম, কী আনছো সব নিয়া সন্ধ্যাবেলা চলে আইস, আমি থাকব ধানমণ্ডি।

“আমি খুব খুশি হয়ে লকেটটা নিলাম। এবং তখনই গলায় পরে ফেললাম।”

সন্ধ্যায় সে আসলে দেখলাম সে আনছে একটা সিলভার লকেট, তাতে ‘পারমিতা’ লেখা। লন্ডন ব্রিজের উপর থেকে এইটা বানায়া আনছে। আমি খুব খুশি হয়ে লকেটটা নিলাম। এবং তখনই গলায় পরে ফেললাম। একা একা পরতে পারি নাই। তাই তাকে বললাম, প্লিজ আমাকে পরায়ে দাও।

তারপর বললাম, ওগো, একটা ছবি তুলি?

সে খুব খুশি খুশি মনে বলল, তোলো! তারপর তার শার্টের কলার ঠিক করে ছবি তোলার জন্য রেডি হল।

আমি আমার ফোন বের করে, সামনের ক্যামেরা অন করে অনেক ঢং করে হেসে একটা ছবি তুললাম, নিজের। শুধু নিজের—মানে পাশের জনকে ছাড়াই। এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে আপলোড করে লিখে দিলাম, “আমার নারীজনম আমি খুবই উপভোগ করি।”

আমার পাশের ছবি প্রত্যাশী লোকের মনের অবস্থা তখন বুঝতেই পারছেন।

সে শুধু একটা কথাই বলল, মানুষ হবি না রে, তুই কোনোদিন মানুষ হবি না?

আমরা যখন প্রেম করতাম, তখন দুইজনেই ছিলাম খুব গরীব। এইখানে সেইখানে খাইতাম ঠিকই, কিন্তু অত টাকা আমাদের ছিল না। সে তখন তার বাপ-মাকে সবে ঢাকা নিয়ে আসছে, সংসার শুরু করতেছে, আমিও তাই। প্রতি মাসে টিভি কেনা, ফ্রিজ কেনা কিংবা এটা সেটা ফার্নিচার কেনা আর মাসে মাসে এগুলার কিস্তি শোধ করা এইগুলাতেই যা আয় তা খরচ হয়ে যেত। অনেক কষ্টে টাকা পয়সা জমায়ে, কিংবা ধার করে মাঝে মাঝে বেড়াতে যাইতাম আমরা। তখন সে বলত যে, একটা ভেসপা কেনার শখ তার। পুরান দিনের সিনেমায় যেমন দেখা যায়। যেইটা স্টার্ট নিতেই এক ঘণ্টা লাগে।

এখন সে ওই ভেসপা কিনে ফেলছে। স্টার্ট নিতেও বেশ সময় লাগে। কিন্তু আমি তো আর নাই। বেড়ানোর টাকা আছে, বাহন আছে, জায়গা আছে কিন্তু লোকটা নাই। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই দুঃখের। এই দুঃখে সে শুরু করল নতুন ডিস্টার্ব। তার বাইকে একদিন চড়তে হবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম।

আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড আমার মত পাজি না। খুবই ভদ্র ছেলে। আমি পিছনে বসছি বলে সে বার বার হার্ডব্রেক করবে এমন ছেলে না। আমি খুব ভালভাবেই ওর বাইকের পিছে বসে গেলাম। পই পই করে বললাম, চলো, জোরে জোরে ব্রেক করার চেষ্টা করবা না। আমি তোমার গায়ের ওপর কিছুতেই পড়ব না। আর আমি তোমার কাঁধে হাত রেখেও বসব না। ভয় পাইয়ো না, পিছনে পড়ে যাব না। কোনো ট্রাক কিংবা পিকআপের নিচে আমাকে এক্সিডেন্ট করাবা না। এই মর্যাদাময় জীবন কোনো সিএনজির নিচে শেষ করতে চাই না। মেরে ফেলতে চাইলে আমাকে বইলো, আমি ভালো উপায় বলে দিব।

আমি বড় হইছি মামাদের সাইকেলের পিছনে চড়ে। গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তায় তো বটেই, ক্ষেতের চিকন আইল ধরেও তারা আমারে পিছনে নিয়েই সাইকেল দিয়ে মাইল মাইল গেছে। সুতরাং বাইকে চড়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও, কোনো ভয় আমার নাই। আমি তার শরীর কোনো রকম স্পর্শ না করে পিছনের চাকা ধরে পুরা রাস্তা বসে থাকলাম। আর গান গাইলাম।

একটা দুর্গন্ধ ডাস্টবিনওয়ালা নির্জন রাস্তা আছে ধানমণ্ডিতে। ওই ছেলে সবসময় ওইখান দিয়ে যেতে পছন্দ করত। সে আবারো ওইটা দিয়াই যেতে থাকল। রাস্তা নির্জন হওয়ায় আমার গানের কিছু কথা তার কানে গিয়ে থাকবে। সে হঠাৎ বলল, কিরে তুই পিছনে বইসা কী করস?

আমি বললাম, গান গাই। “হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা, কিছু ভালবাসা দাও।”

তারপর জোরে চিৎকার করে গাইলাম, “হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা, কিছু ভালবাসা দাও।”

সে বাইক চালাতে চালাতে হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা, মানুষ একটা মানুষের প্রেমে কয় বার পড়তে পারে। আমি মনে হয় কি এক জীবনে পাঁচ ছয়বার তোর একারই প্রেমে পড়লাম।

আমি বিরস কণ্ঠে বললাম, আজকে কি আবার পড়ছোস নাকি?

সে মাথা নেড়ে বলল, হ।

আমি বললাম, এই গান শুনে?

বলল, হ। আসলে এতদিন ধরে চালাইতেছি বাইকটা। কেমন জানি খালি খালি লাগে। আজকে প্রথম মনে হইতেছে সব আছে। বাইকটা পূর্ণ। লাইফটা পূর্ণ। বাইকের পিছনে বসে কেউ একটা আজগুবি গান গাইতেছে। মনে হইতেছে কী জানি ফুলফিল হইল।

আমি বললাম, শোন, দোষটা তোর না। তোর বাইকের। কারো বাইকের পিছনে যদি এত খালি জায়গা থাকে, তার তো খালি খালি লাগবেই। এইরকম বাইক চালানো যাবে না। পিছনে অনেক মোটা এবং ঢালু এইরকম বাইক চালাতে হবে। ম্যাচো ছেলেরা চালায় দেখিস না! ওইরকম একটা বাইক কিনে নে। এইসব কিছু মনে হবে না। জায়গা নাই তো ফিলিংসও নাই।

ততক্ষণে আমার বাসার সামনে চলে আসছি। বাইক থেকে নেমে গেলাম তাই।

বললাম, এইটা চেইঞ্জ কর। ওইগুলা কিন। যেইটার পিছে জায়গা নাই।

সে বলল, হ। হ। কইছে তোরে। মানুষ হবি না তো তুই। তুই রাইসুর লগে মিশা বন্ধ কর। তোরে একটা অমানুষ বানাইছে। ওর সাথে মিশলে তোর জীবনে কিছু হবে না।

এই এক কথা আমি কত যে শুনছি! রাইসুর মত খারাপ লোক নাকি গোটা দুনিয়াতে নাই! অথচ পুরা দুনিয়াতে একমাত্র এই লোকটাই সম্পর্ক না ভাঙার জন্য ওই ছেলের পক্ষে সুপারিশ করছিল! দুইদিনের ছেলে, আমারে কয় রাইসুর লগে মিশবা না। যত্তসব!

আমি হুহ্ মার্কা একটা শব্দ করে বাসায় এসে ঘুমায়ে গেলাম। পরদিন দুপুরে ঘুম ভাঙল। দেখি রাইসুর এসএমএস—ফোন করো।

করলাম ফোন। রাইসু বলল, টাকা আছে তোমার? টাকা দাও। আমি বু..স জব করাবো।

কী যেন খাইতেছে। ভাতই হবে, তখন দুপুরবেলা।

আমি বিছানায় আধাশোয়া ছিলাম। শুনে সটান হয়ে বসে গেলাম। কী বলে লোকটা! পাগল হয়ে গেল নাকি?

এই কয়দিন আগে আমার বিদেশী বান্ধবীদের মারফত আমি প্রথম বিষয়টা জানতে পারি। বিদেশের মেয়েরা নাকি ছোটবেলা থেকেই ‘বুবস জব’ এর জন্য টাকা জমায়। বড় হয়ে যদি দেখে তার বুবস ছোট কিংবা বুবস ঠিক মনের মত সুন্দর হয় নাই, এইজন্য টিন এইজ বয়স থেকেই টাকা জমায় তারা। আমি এইটা শুনে হাসতে হাসতে খুন হয়ে গেছি। আর রাইসুর কথা শুনে ভয়ে ফ্রিজ হয়ে গেলাম।

পারমিতা ও রাইসু

মাত্র কয়দিন আগে ৫০ হইল রাইসুর। মাথাটা কি খারাপই হয়ে গেল কিনা! মাইকেল জ্যাকসনও তো দুনিয়ার সব কিছু পেয়ে বোর হয়ে নিজের শরীর চেন্জ করতে গিয়ে সার্জারি করে যা তা কাণ্ড করে শেষমেশ মরেই গেল! রাইসুও কি এই পথে হাঁটতেছে?

সে যদি ঠিক করে এইসব করবে, তো করবেই,কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না। আমি কানলেও করবে, না কানলেও করবে। টাকা দিলেও করবে না দিলেও করবে—তাই ভয়ে আমার গলা শুকায়ে গেল।

আমি ভয়ে ভয়ে আবার বললাম, কী করবা তুমি? কী আবার বলো।

রাইসু খাওয়া থামায়ে বলল, বুস্ট জব করব। ফেসবুকে পোস্ট বুস্ট করব।

আমি তো হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। খুশিতে আটখানা হয়ে বললাম, ও আচ্ছা। তাহলে কার্ড দিয়ে করে দেই?

আমার কণ্ঠের পরিবর্তন শুনে রাইসু বলল, কেন? তুমি কী শুনছিলা প্রথমে?

পড়ুন: পারমিতা হিমের আরো লেখা

আমি সত্যি কথাই বললাম।

রাইসু বলল, বুবস জব? সেইটা আবার কী?

আমি বললাম আমার বিদেশী বান্ধবীরা আমাকে কী বলছে এই নিয়ে।

তারপর ফোন করে কার্ডের মাধ্যমে ফেসবুকে পেমেন্ট করলাম।

একটু পরে রাইসুর ফোন। তখন আমি ভাত খেতে বসছি, বললাম, কী হইছে আবার?

রাইসু বলল, তুমি তো আমার একটা বুবস জব করছ, আরেকটা তো বাকি আছে, ইন্সটাগ্রামে… ওইটার জন্য ফোন দাও। পয়েন্ট এক ডলার কাটবে।

হাসির দমকে গলায় ভাত আটকে আমার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হইল।

Facebook Comments
More from পারমিতা হিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *