রাইসু, বাংলাদেশের ন্যাচারাল বর্ন স্পিরুলিনা (না)

সেই ১৯৯৪ সাল থেকেই স্পিরুলিনা
রাইসু তখন কনকর্ডে থাকেন, পান্থপথের লেজে, স্কয়ারের উল্টা দিকে। একটা সাদা শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার পইরা ঘুরতাছেন রুমে, আমি আর কৌশিক বইসা আছি। মডার্ন একটা সেটিং। তারে গোলাপী এবং সাদা দুইটাই লাগতাছে। রূপবান। আমরা তারে বস বইলা ডাকি, তিনিও আমাদের বস বইলা ডাকেন। ঢাকার ভাষায় বস আর স্যার বইলা সম্বোধন আর সেইটারে নিয়মিত ব্যবহার করার চল শুরু হইছে এবং আমরাও সেটা করছি মনে পড়ে।

কিন্তু এই বসের সেই জোর নাই। কইতে গলা কাঁপে না, ভয় লাগে না। এনজিওতে তো ভাই আর আপারই অনেক দাপট। আমার অভিজ্ঞতায় রাইসুর এই যে বস বা স্যার ডাকন তা একটা ডেলিবারেট কাজ, সেইটা খুব স্পষ্ট। কিন্তু এই সম্বোধন, চাপানো টাইপ না। তিনি এইটার কৃতিত্ব পান, এই কৃতিত্বটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার কাছে মূল কৃতিত্বের যে জায়গাটা তিনি পান তা হইল তিনি ১৯৯৪ সাল থেইকা স্পিরুলিনা খান। কিন্তু আমি তারে কৃতিত্ব দেবার কে?

স্পিরুলিনা ১০১ উহা একটি পুষ্টি-বটিকা
স্পিরুলিনা কী? উইকি থেইকা জানতাছি যে এইটা একটা ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ হইতেছে পাকানো বা সর্পিলাকার। ইহা অতি ক্ষুদ্র নীলাভ সবুজ শৈবাল যা সূর্যালোকের মাধ্যমে দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে। জন্মে পানিতেই আবার তার পুষ্টিগুণ বহুবিধ। এইটার বাণিজ্যিক উৎপাদনও হয়। সেই রকম বটিকা।

শরৎ চৌধুরী

স্পিরুলিনার প্রথম জামানা
কবিসভা, ব্লগ আর বইমেলা থেকে রাইসুর সাথে যোগাযোগ শুরু হইতে পারত, সেইটা একভাবে হইছেও। কিংবা আজিজ মার্কেট থেইকাও, সেইটাও হইছে। কিন্তু রাইসুকে আমি চিনি দিনাজপুর থেকে, সেইটা গত শতকের শেষ দিকে, সালটা ১৯৯৮-৯৯। সংস্কৃতির কেন্দ্র ঢাকামুখী এবং “আমরা মফস্বল সাহিত্য না” এইটা মনে করার একটা চল বেশ জোরালো তখন। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আর ‘কথা’ জেলায় জেলায় ঘোরে। স্থানীয় মঞ্চ নাটক তখনো বেশ শক্তিশালী, জেলায় উপজেলায় একাধিক ‘প্রগতীশীল’ গ্রুপ বেশ টগবগে আর সবাই লেফট করে তাও না। পোলারা গিটার নিয়ে ঘুরলে সেই রকম ডিমান্ড, সাংস্কৃতিক (পড়তে হবে আর্ট কালচার) ‘বড় ভাই’-দের চিঠি আমরা বড় আপুদের জন্য নিয়ে যাই। যৌনতা বলতে চুম্বন আর পার্কে যাওয়া, (গোপন যৌনতা তখনো গোপনই, আমরা টের পাই), এখনকার তুলনায় সেইটারে এইজ অফ ইন্নোসেন্স বলা যেতে পারে। সিডি এসে গেছে, ডিভিডি আসি আসি কিন্তু ক্যাসেট টেপ জোরালো তখনো। বিশেষ বিশেষ গান রেকর্ড করে প্রোপোজালের তখনো মার্কেট আছে।

এদিকে ছোট কাগজ ওরফে লিটল ম্যাগেরও বিরাট রমরমা। ঢাকা থেকে আসা সাহিত্যিকরা বিরাট মর্যাদা আর আদর আহ্লাদ পান, ভিজিটিং প্রেমও। তারা ছেঁড়া চপ্পল, শুকনা, গরীব, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগের লোক আর ঠিক না। যদিও এই প্রজাতিও তখনো বেশ টিকে আছেন।

ব্রাত্য রাইসু ও শরৎ চৌধুরী, সাল আনুমানিক ২০১০, মানস চৌধুরী ও বন্যা মির্জার বিয়ের অনুষ্ঠানে

তো এমন সময় ঢাকা থেকে ড. হুমায়ুন আজাদ আসলেন। সেই সময়টাকে আমি আজাদ কালই বলব। কেননা সেই দশকে যে দাপটে এবং ক্যারিশমায় বহুমাত্রিক স্টারডমে তিনি ছিলেন তা খুব বেশি কেউ অর্জন করেন নি এ দেশে। আবার উনি মারা যাবার পর অদৃশ্যও কেউ হন নি এভাবে। সাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে সরকারি আমলা বিসিএস ক্যাডার, মন্ত্রী, উপমন্ত্রীর চাইতেও অধিক কিছু এবং তা কোমল ধরনের না সেইটাও তিনি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

গত দশকে আমি মনে করি সাহিত্যিকদের গড় সামাজিক মর্যাদায় একটা ধ্বস নামছে, আবার নতুন আকারও পাইছে।

স্পিরুলিনা খুবই ইন্টারেস্টিং
তো ড. হুমায়ুন আজাদের সাথে সখ্যজনিত কারণে তারে আমি জিগাই, “রাইসুরে কেমন মনে হয় আপনার?”

উনি একটু থামেন, এমনভাবে উত্তর দেন যাতে নতুন প্রতিভা লোকেট করার পর আরেক প্রতিভার চোখে যে ঝলক পাওয়া যায় তা দেখা যায় ঠিকই কিন্তু তিনি তা প্রকাশ্যে অনুমোদন দেন না। তবে সম্ভাবনাটা তিনি ঠিকই টের পান, সেটা চোখে থাকে, সেটা লুকানো যায় না। তখনই আমি বুঝতে পারি লোকটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এক, অনেক কবি যারা হুমায়ুন আজাদকে অনেক বেশি ধারণ করতেন তখন, তারা ভাষিক ও প্রকাশ্য অনুমোদন পেয়ে এসেছেন সরাসরি। সেইটা আমি মনে করি তাদের জন্য খুব ভালো হয় নি, কিংবা হইতেও পারে, তারা ভালো বলতে পারবেন। কারণ দুই, যারা অনুরাগের অনুমোদন বলয়ের বাইরে তারা ইন্টারেস্টিং!

রাইসুকে দূর থেকে আমি দেখি ছফা অনুরাগে, মজহার অনুরাগে, সলিমুল্লাহ অনুরাগে। আমার দেখার বিষয় ছিল তিনি কী হিসেবে দাঁড়ান ক্রমে ক্রমে।

স্পিরুলিনার ভাষাশিক্ষা, চোদাতে কী সমস্যা?
ভাষাতেই রাইসু হাত দিবেন তা অনুমান করছিলাম। সেটা আমার অনুমানের আগেই তিনি করছিলেন বেশ ভালোভাবেই। সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ ভাষা আসলে ক্ষমতা। ভাষা মানে বিশ্বসৃষ্টি, ভাষার পরিবর্তন মানে নতুন বিশ্ব তৈরি করে নতুন ক্ষমতা তৈরি করতে থাকা। কিন্তু এই ক্ষমতা কেবল একার না অপরকে ক্ষমতায়িত করারও। এভাবেই ক্ষমতার নতুন বিন্যাস ঘটে। ভাষা একই রেখেও অর্থ বদলে দেয়া যায়। চোদা আর সেক্স শব্দ দুটি কি এক অর্থ আর অনুভূতি বহন করে? আমি চুদতে চাই আর আমি শুতে চাই। কে কার প্রমিত। প্রমিত কার মিত্র? দুই শব্দ কি এক? কে বলছে চোদা? কে কাকে বিচার করছে মানদণ্ড দিচ্ছে চোদা একটি ‘অশ্লীল’ ভাষা বলে? কে উত্তেজনায় বলছে “বেবি টক ডার্টি টু মি”? আর বললেই বা কী সমস্যা? চোদা শব্দে তার কীসের এত উত্তেজনা? আর উত্তেজনা হইলেই বা কার কী? কারে সে বলে “চুদুম” কারে সে বলে “সোনাপাখি লেট্‌স মেইক লাভ”? বললেই বা কী সমস্যা?

স্পিরুলিনা কি সবুজ নাকি কালো নাকি কাবুজ কালিদাস?
রাইসুর ভাষা পরিবর্তনের খেলাটা খালি শব্দ ব্যবহারেই হয় না, এর জন্য ইমেজ লাগে, মিডিয়া লাগে, মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণও লাগে। ইমেজরে অনেকেই একটা বানানো জিনিস হিসেবে দেখেন আর সেইটারে হালকা মনে করেন। মনে করেন তারকাদের আর রাজনীতিবিদের কাজ শুধু। ইমেজ তো একটা পূর্ণ নির্মাণ, রক্তমাংস টাকাপয়সা, সন্তানসন্ততির মতই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি আমি আমরা তো সবাই ইমেজ। সবাই তো ইমেজই বানাচ্ছি। রিকশাওয়ালা একটা ইমেজ, বিসিএস যেমন একটা ইমেজ, তরুণ কবি একটা ইমেজ। রাইসু কবি ইমেজ, সাহিত্যিক ইমেজ, বয়স ইমেজ, পেশা ইমেজ ক্রমাগত ভাঙছেন এবং গড়ছেন। এই যে ইমেজরে তিনি থাকতে দিতাছেন না, বসতে দিতাছেন না, ঢাকা ক্লাবজনিততে শুইতে দিতাছেন না, লুংগি থ্রি কোয়ার্টারে জলপানিদাদভাইনারীবাদীর মত প্রেমেই আছেন, তরুণরা বুড়া হইতাছেন, নিজে লেখা চেয়ে নিজে পছন্দ মত বাছাই করছেন, বাদ দিচ্ছেন, ভাষা আর গোষ্ঠীরে নতুন নতুন সংজ্ঞা দিতাছেন তা তো এক দর্শনীয়, শিক্ষণীয়, স্বাধীন সেক্সি কারবার। এই সেক্সি উত্তেজনায় ঈর্ষা তো হইবোই।

রাইসু ব্লগার না, সাহিত্যিক না, স্পিরুলিনা না; তিনি তা যা যিনি ক্রমাগত হইতে চান
এইখানে তিনি দূরদর্শী, নতুন মাধ্যম সবার আগে আত্মস্থ করার দক্ষতা তিনি দেখাইছেন তা বিরল। সামনাসামনি কথা, লিটল ম্যাগ, বই, ব্লগ, পত্রিকা, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া সবই তো প্রযুক্তি। কিন্তু প্রযুক্তি দিয়া তিনি কী অশেষ নেকি লাভ করতে চান সেইটা হইল কথা। চিন্তার গতি, স্বাধীনতার ফিলিং, নতুন দেখা, সবই উনি নিজে করতাছেন, বাকিদেরও করাইতেছেন।

কিন্তু প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণই তো খালি খেলা না। শুধু ইমেজ নির্মাণই তো গল্প না। এইটা টাকা-পয়সা-খাওন-দাওন বাঁইচা-থাকনের বিষয়। রাইসুর এই অধ্যবসায়, “আমি হমু না”-র শক্তিরে আমার মেঘনাদবধ কাব্যের মত লাগে। রাইসুর বাণিজ্যিক সাফল্য আরো হবে সেইটা আমি বিশ্বাস করি। কারণ তিনি তো মার্কেটও চেইঞ্জ করতাছেন, সেইটাও পাইওনিয়রিং।

সম্পাদকীয় কেমনে হবে? সাহিত্যিকের সামাজিক মর্যাদা কেমন হওয়া দরকার, বুদ্ধিজীবী কী জিনিস, সবকিছুতেই তো রাইসু বিরাজমান। তিনি ছড়াইতে পারেন, তিনি বিস্তৃত হইতে পারেন। তিনি অর্ধশতক ধরে “হমু না”।

ক্রমাগত এই “হমু না”-র পেছনে যে অ্যানার্জি লাগে তা বিরাট। আর এ কারণেই তিনি একটা অপরিহার্য মাপকাঠি। যারা যারা হইতে চাইছেন তারা তো আগেই ধরা। হমু আর হমু না দেখলেই বোঝা যায় কার হয় আর কার হয় না। কীভাবে হয় আর কীভাবে হয় না অথবা হইলেই বা সমস্যা কী?

স্পিরুলিনা হইতে চাওনের কিছু নাই আবার হইয়া গেলেও সমস্যা কী? কিন্তু এইটা বুঝতে পারা খুব দরকার যে স্পিরুলিনা একটা সুপার ফুড, বহুগুণ। আপনার দরকার মনে হয় না? সেইটা হইতেই পারে, রাইসু তো আর স্পিরুলিনা না।

Facebook Comments

Leave a Reply