রাইসু ভাইরে যেইভাবে চিনি এবং দেখি

শৈশবে ১৯৮৮ সালে আমার বড় চাচার ছেলে মানে সম্পর্কে চাচাত ভাই জিয়া ভাইয়ের সাথে টিএসএসিতে যাই। কী কারণে মনে নাই, তবে মনে আছে লম্বা চুলের সুদর্শন এক যুবক তারে দেইকখা বইলা উঠল, “ওই জিয়া! বিয়াকুল জিয়ারা….।”

আমি কিছুই বুঝলাম না। ফ্যাল ফ্যাল কইরা তাকাইয়া জিয়া ভাইরে জিজ্ঞাস করলাম উনি কে?

জিয়া ভাই কইল, “আমার বন্ধু রাইসু—কবিতা লেখে।”

রাইসু ভাইরে জীবনে প্রথম দেখি সেইবার। পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয় নাই।

১৯৮৯ সালের দিকে আমার বড় চাচি দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে দীর্ঘদিন লড়াই করার পর মৃত্যুবরণ করলেন, জিয়া ভাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক আগের দিন। জিয়া ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তীব্র ভাই, সুজিত ভাইয়ের সাথে রাইসু ভাই আসলেন সেদিন আমার দাদাবাড়িতে—সেদিনই রাইসু ভাইয়ের সাথে পরিচয়।

উনি আমারে নাম না জিজ্ঞাস কইরা জিজ্ঞেস করলেন—”আপনি কী করেন?”

সাব্বির আহমেদ জয়

স্কুলপড়ুয়া আমারে কেউ ‘আপনি’ সম্বোধন করতে পারে এইটা আমার কাছে অভাবনীয় ব্যাপার।

এর বেশি কিছু মনে নাই আর। তবে অচিরেই আমার দাদার বাড়িতে জিয়া ভাইয়ের ঘরে তীব্র ভাই, সুজিত ভাই এবং রাইসু ভাইয়ের একটা সান্ধ্যকালীন আড্ডা গইড়া উঠল।

আমার দাদাবাড়িতে প্রতিদিনই যাওয়া হইত বাবা-মায়ের সাথে। বড় চাচির মৃত্যুর পর দাদাবাড়িতে যাওয়া-আসা আরো বাইড়া গেল। দাদাবাড়ির মূল আকর্ষণ ছিল জিয়া ভাইয়ের রুম। জিয়া ভাই এয়ার স্কাউটিং করতেন। সেই কারণে প্রচুর ফাইটার প্লেনের রেপ্লিকা বানাইতেন। আর ছিল তার এরিখ ফন দানিকেনের ভিন জগতের প্রাণি নিয়া বইয়ের সংগ্রহ। যা ছিল তার রুমের প্রতি মূল আকর্ষণ। সেইসবের উছিলায় তার রুমে যাওয়ার অজুহাতে একসময় আমিও তাদের আড্ডার একজন নিয়মিত শ্রোতা হইয়া পড়ি মনের অজান্তে, এবং রাইসু ভাইয়ের স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগ পাই।

ধীরে ধীরে তাদের আড্ডায় আমি আর আমার সেজ চাচার ছেলে পার্থ ভাই শ্রোতা হিসেবে নিয়মিত অংশগ্রহণ করা শুরু করলাম। নিৎসেপ্রেমী জিয়া ভাই, পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র তীব্র ভাই, বিনয়ী সুজিত ভাই আর কবি রাইসু ভাইয়ের আড্ডার বিষয়বস্তু থাকত সাহিত্য থেইক্কা দর্শন, প্রেম, সবকিছুই। তবে রাইসু ভাই ছিলেন আড্ডার প্রাণ। অচিরেই আমি এবং পার্থ ভাই তার ভক্ত হইয়া গেলাম। তার কুতর্ক শুইন্না এবং তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুইন্না একদিন জিয়া ভাই কইলেন, “তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তুই আর কাম পাইলি না রাইসুর ভক্ত হইছিস, ছাগল কুহানকার!”

রাইসু ভাইয়ের সেই আড্ডা জিয়া ভাইয়ের রুম থেইক্কা ধীরে ধীরে আমার দাদাবাড়ির ড্রইং রুম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করল এবং অচিরেই সেই আড্ডায় শরীক হইলেন আমার বড় চাচার মেয়ে সোমা আপা এবং কালেভদ্রে আমার বড় চাচার বড় ছেলে মুন্না ভাইও সেই আড্ডায় আসতেন। একসময় সেই আড্ডায় উদীয়মান কবি, লেখক-লেখিকারা আসা শুরু করলেন। সেই আড্ডায় আমি প্রথম দেখি প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী রনি আহম্মেদ ভাই, সুলেখিকা রাশিদা সুলতানা আপা, আইনজীবী তানজীব ভাই, নব্বইয়ের দশকের আরেক কিংবদন্তীর কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ভাই, গায়ক ওয়াকিল ভাই, এবাদুর রহমান ভাই সহ বর্তমানের অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের।

প্রাক ব্লগ যুগে রাইসু ভাইরে দেখতাম পিডিএফ কবিতা ও গল্পের সংকলন বাইর করতেন, সেখানে আজকের অনেক কবি ও সাহিত্যিকরা লেখালেখি করতেন। রাইসু ভাইয়ের সাহিত্যচর্চা নিয়া সমালোচনা করার যোগ্যতা আমার নাই, তবে আমি মানুষ রাইসু ভাইয়ের ভক্ত যিনি আমারে আঙুল দিয়া দেখায় দিছিলেন পোস্টকলোনিয়াল হ্যাংওভারে ভোগা আমাদের তথাকথিত নিও এলিট সমাজের হাস্যকর দিকগুলা।

উনি একদিন আমারে কইলেন, “জয় কবিতা লেখেন।”

আমি বললাম, “কীভাবে? আমি ছন্দ জানি না!”

উনি আমারে নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ বইটা উপহার দিলেন যেইটা পইড়া আমি কবি হইতে পারি নাই কবিদের সম্মান করতে শিখছি, কবিতা ভালোবাসছি। আমি কবির দৃষ্টি নিয়া জীবনরে দেখি, আমি সংসারী হইয়াও আবার উদাসীন; বৈষয়িক না। কবি হইতে পারি নাই বইলা আক্ষেপ আছে, তবুও চেষ্টা করি কবি হইতে। তাই অতি উৎসাহী হইয়া লেখালিখি বিষয়ক কর্মশালায় একবার অংশগ্রহণ করলে সেই কর্মশালার পরিচালনাকারী উন্নাসিক প্রমিত বাংলাপ্রেমী কবি আমারে জিগাইলেন “আপনার প্রিয় কবি কে?”

আমি উত্তর দিলাম, “কবি ব্রাত্য রাইসু।”

উনি বলেন, “একজন ভাষাদূষক কীভাবে আপনার প্রিয় কবি হতে পারে? আপনাকে দিয়া কবিতা হবে না।”

টের পাইলাম বাংলাদেশের বটবৃক্ষ কবিরাও রাইসু ভাইরে উপেক্ষা করতে পারে না। তার সাহিত্যকর্ম ঠিকই পড়ে ওনারা এবং ওনারে গালমন্দ করে কারণ কবি ব্রাত্য রাইসু ভাই বাংলা কবিতার খোলনলচে পাল্টায় দিছেন ল্যাটকা ভাষায় লেইখা।

এই কৃতিত্ব রাইসু ভাইয়ের একার নিঃসন্দেহে। আমাদের প্রজন্ম এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যচর্চায় রাইসু ভাইয়ের প্রভাব ব্যাপক। এমনকি কিংবদন্তীর কবি প্রয়াত সিকদার আমিনুল হক সাহেবের স্ত্রী—যাকে আমি জলি খালাম্মা বইলা সম্বোধন করি—একদিন আমারে বললেন, “জয় তুমি কি জানো দীপক (কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাক নাম) রাইসুকে খুব ভালোবাসত এবং রাইসুর কবিতার সে ছিল মুগ্ধ পাঠক, আর বলত রাইসু ঠিক যীশুর মত!”

রাইসু ভাই পঞ্চাশ বছরে পা দিছেন। উনি আমারে অবাক কইরা দিয়া কইলেন, “জয় একটা লেখা দেন, আমার পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে!”

আমি বিস্ময়ে অভিভূত হইলাম, আবেগে আপ্লুত হইলাম কারণ কবি রাইসু ভাইয়ের মত জাত কবিরে নিয়া লেখার যোগ্যতা আমার নাই, তবে ব্যক্তি রাইসু ভাইরে আমি শ্রদ্ধা করি, কারণ উনি একজন ভালো মানুষ। বয়স ওনার শিশুসুলভ সরলতার কাছে হার মানছে। রাইসু ভাইয়ের সাথে আমার বয়সের ফারাক এক যুগ, তাতে কিছু যায় আসে না। উনি আমার চাইতেও তরুণ।

আমাদের প্রজন্ম, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, তারো পরবর্তী প্রজন্ম কবি ব্রাত্য রাইসু ভাইয়ের কাছে ঋণী থাকবে কারণ উনি আমাদের শিখাইছেন, আকাশে কালিদাসের লগে বইসা কেমনে মেঘ দেখতে হয়।

জয়তু রাইসু ভাই, আপনার শতায়ু কামনা করি।

(কভারের ছবি.  কবি মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে সাব্বির আহমেদ জয়)

Facebook Comments

Leave a Reply