রাইসু ভাই

উনারা বলেন রাইসু আনকমন, বা ইউনিক, বা ভিন্ন, কিন্তু এর ভিতর দিয়া উনারা রাইসুর বেটারের দিকটারে লঘু করতে চান।

দুই হাজার চৌদ্দ সাল, অথবা পনেরো সালের শুরুর দিকে, একদিন রাতের বেলায় বারোটার পরেই হবে, সোফায় শুয়ে শুয়ে রাইসু ভাইয়ের কোনো একটা পোস্টে কমেন্ট করলাম। রাইসু ভাই রিপ্লাই দিলেন, আমি তার প্রতিরিপ্লাই দিলাম। কয়েকটি রিপ্লাইয়ের পর দেখা গেল, রাইসু ভাই আর রিপ্লাই দিলেন না।

সুযোগে, উনার সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছাও তো আমার আছে, আমি উনাকে ইনবক্সে লেখলাম, “হাই, আর রিপ্লাই দিলেন না?”

রাইসু ভাই বললেন, “কথা তো শেষ। আর কিছু তো বলার নাই।”

আমি লেখলাম, “আপনার সাথে পরিচিত হইতে চাই।”

সাদ রহমান

রাইসু ভাই বললেন, “হবে।”

লেখলাম, “দেখা হবে?”

উনি বললেন জানাবেন।

আরেক দিন দুপুরের দিকে, সেদিন আমি অফিস করতেছি বাংলামটরে। শামসুর রাহমানকে নিয়া একটা স্ট্যাটাস দিলাম, যে, শামসুর রাহমানের কবিতা বেশ ফালতু। রাইসু ভাই ওই পোস্টে কমেন্ট করলেন। কী কমেন্ট করলেন তা এই মুহূর্তে মনে করতে পারতেছি না। তবে উনি কমেন্টটা শেষ করলেন একটা ‘হি হি’ দিয়া। ‘হি হি’টার জন্য বোধকরি আমাকে লজ্জাই পাইতে হইল। সেই পোস্টেও কিছুক্ষণ রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে রিপ্লাই-প্রতিরিপ্লাই চলল। এক পর্যায়ে এটাও শেষ হইল।

এরপরে রাইসু ভাইয়ের ফেসবুক পোস্ট পড়তে পড়তে, আর বাংলামটরের অফিসে রাত্রিদিন কাজ করতে করতে আর ঘুমাইতে ঘুমাইতে আরো অনেকদিন কাইটা গেল।

একদিন, খুব সম্ভব ইনবক্সেই, রাইসু ভাই জিগাইলেন, ফ্রি আছি কিনা। বললাম, ‘অবশ্যই।’ উনি বললেন, “তাইলে সাড়ে সাতটায় আজিজ মার্কেটে দেখা হবে।” ইতিমধ্যে আমাদের ফোনেও কথা হইল। আমি বাংলামটর থিকা আজিজ মার্কেটে যাব, উনি বাসা খুঁজতে বাইর হবেন, বাসা-টাসা খুঁইজা তারপর আজিজে আসবেন। আজিজে পৌঁছাইতে আমারই দশ মিনিট লেইট হইল।

আজিজ মার্কেটে রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হইল। আমি পইরা ছিলাম একটা ঢোলা নীল টিশার্ট। রাইসু ভাই পইরা ছিলেন ডিপ নীল রঙের শার্ট, আর দেখতে ইউনিক একটা বেঁটে প্যান্ট, ঘিয়া রঙের। সঙ্গে একটি ব্যাগ, ব্যাগটিও খুব সুন্দর। আমাকে জিগাইলেন, “লেইট কেন?” আমি একটু আমতা আমতা কইরা, বলতে বলতে, উনিই বললেন উনার পাশে বসতে। উনার পাশে বইলাম, আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকান ‘সন্দেশ’-এর চিলতা বসনি’টাতে। যারা গেছেন ওইখানে, উনারা চিনবেন।

কিছুক্ষণ আলাপ হইতেই আমি টের পাইলাম, এই ফেসবুক সেলিব্রিটিটি আমাকে বড়ই আদর করতেছেন, এই অর্থে যে আমার মনে হইল আমি ক্রমেই দ্বিধাহীন হয়ে উঠলাম। আপনাতেই আমার কথা বলবার চালিকা আমার যোগ্যতার ব্যাপারটিরে অতিক্রম কইরা গেল। আমি কিনা ভুইলাই গেলাম যে, কী বলতেছি না বলতেছি, কিছুক্ষণ নানান আলাপ হইল, কুশলাদি হইল। উনি বাসা একটা পাইছেন, আর কোনো বাসা না পাইলে ওইটাতেই উইঠা যাইতে হবে, মানে বাসাটা বিশেষ পছন্দসই হয় নাই, এরকম বললেন।

সেলফি. শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে। সাদ রহমান, ব্রাত্য রাইসু ও তানিম কবির, ৩১/১২/২০১৫

রাইসু ভাই বললেন, আসেন চা খাই। আমরা উইঠা কোনার দোকানটায় চা না নিয়া কফি নিলাম, কী জানি কী একটা কারণে। কফি একটু খাইতেই উনি জিগাস করলেন, আমি মদ খাই কিনা। আমি বললাম, “হ্যাঁ খাই তো।” উনি জিগাইলেন, “শিওর খান? কই খাইছেন?” কী যেন বললাম মনে নাই, তারপরে আমরা কফির কাপ রাইখা একটা রিকশা নিয়া সাকুরায় চইলা গেলাম।

সাকুরাতে ঢুকতেই প্রথম টেবিলটা থিকাই রাইসু ভাইকে কে যেন ডাকলেন। উনি ফয়সল নোই ছিলেন। আমরা ফয়সল নোইদের টেবিলে বসলাম। এর আগে আমার মদ খাবার অভিজ্ঞতা হাতেগোনা কয়েকবার। বিয়ার খাব কিনা জিগাস কইরা রাইসু ভাই দুইজনের জন্য বিয়ার নিলেন। আর বললেন, আমাদের আর্থিক কোনো অসুবিধা নাই, নতুন ক্যান দরকার হইলে বলতে।  

অনেকক্ষণ গেল, কথা প্রসঙ্গে রাইসু ভাই আমার দিকে দেখিয়ে ফয়সল নোইকে বললেন, উনাদের বয়সে আমরা তো আরো শার্প ছিলাম। ‘আমরা’ তো নয় নিশ্চয়ই না, হি হি, ‘উনি’ই, মানে ‘ব্রাত্য রাইসু’ই, এমনটা লাগল। আর ব্রাত্য রাইসুর শার্পনেসের প্রতিউত্তরে আমিই বা কী বলব, কিছু বললাম না। তবে বুঝি একটু দুঃখই পাইলাম, আর মনে মনে সিদ্ধান্তও বুঝি লইলাম, বয়সের কোটা ধইরাও আমার হিসাব করতে শিখতে হইব।

একফাঁকে সাকুরা রেস্টুরেন্টে বইসাই রাইসু ভাইকে বললাম, উনার পত্রিকায় লেখা যাবে কিনা। উনি জিগাইলেন কী লিখব। কী লিখবে তা বাইর করা একটু কঠিনই ছিল। অনেক কিছু ভাইবা টাইবা শেষে সিদ্ধান্ত হইল, আমি যে বিভিন্ন জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে, বিশেষত মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাই, ডেট করি, মানে লিগাল ডেইট যেইসব, সেইসব লিখব।

রাইসু ভাইয়ের পত্রিকায় ব্লগ সিস্টেম, ব্লগের নাম কী হবে, এইটা নিয়া পরে ভাবা যাবে, এমন সিদ্ধান্ত হইল। আমরা বেশ কয়েকটি বিয়ার খাইলাম, রাতও হইতে চলল। রাইসু ভাই আর ফয়সল নোই আরো কিছুক্ষণ থাকবেন, ওই টেবিলেই ছিলেন একজন, উনি ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন, কোন একটা হোটেলে উঠছেন, আমি যেহেতু অফিসে রাত থাকি, উনি বললেন উনার সঙ্গে আজ রাতটা থাকতে পারি। বড় রুম, ভালো ঘুম, ইত্যাদি বললেন। রাইসু ভাই আমাকে জিগাস করলেন, “আপনি যাইতে চান?” আমি বললাম, “না।”

তারপরে ওই ভদ্রলোক আমাকে বাংলামটরে নামিয়ে দিতে পারেন, এই মর্মে উনার সঙ্গে বের হব কিনা জিগাইলেন, রাজি হয়ে রাইসু ভাইকে রেস্টেুরেন্টে রেখেই আমি ওই লোকের সঙ্গে বের হলাম। ফয়সল নোই আমাদের রিকশা করে দিলেন। রিকশাতেও বেশ কয়বার লোকটি আমাকে বললেন, উনার সঙ্গে যাইতে পারি, উনার সঙ্গে যাইতে পারি, হি হি, উনার সঙ্গে আমি কেন যাব?

বাংলামটরে নেমে আমি অফিসে উঠলাম, অমনি রাইসু ভাইয়ের ফোন পাইলাম। রাইসু ভাই জিগেস করলেন, অফিসে পৌঁছাইছি কিনা। আমি বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ রাইসু ভাই, থ্যাংকস।” সেইসঙ্গে জানাইলাম যে আমার খুবই ভাল লাগছে। আরো কিছুক্ষণ কথা হইল, ফোন রাখার আগে রাইসু ভাই বললেন, উনি চিন্তা করতেছিলেন আমাকে নিয়া, বললেন, “এইসব ব্যাপারে সাবধানে থাকবেন বস।” আমি বললাম, “তা তো থাকবই রাইসু ভাই!”

২.
প্রথম দিনের পরের দিন, বা তার পরেরদিনই আমি আমার জীবনের শুরুর-শুরুর এক প্রেমিকাকে কেন্দ্র কইরা একটা লেখা লেইখা ফেললাম, রাইসু ভাইকে সেটা পাঠাইলাম। উনি আমাকে ফোন করলেন, লেখার নাম কী হবে সেই নিয়া আলাপ হইল। ব্লগের নাম কী হবে, সেইটা নিয়াও আলাপ হইল। রাইসু ভাই বললেন, উনাকে নাম পাঠাইতে কয়েকটা, উনি একটা বাছাই করবেন। অনেক অনেক নাম পাঠানোর পর একটা নাম বাছিত হইল। ব্লগের নাম রাখা হইল, ‘বিন্দাস বাতাসে’।

দেখা গেল ‘বিন্দাস বাতাসে’ নামটির কারণে আমার লেখার কেন্দ্রস্থল আরো বৃহৎ হইল। মেয়েবন্ধুদের নিয়া ঘোরাঘুরি করবার উপাত্ত দিয়া লিখবার যেই ব্যাপার ছিল, তা এর থিকা বের হইয়া আমার জীবনের এক ‘বিন্দাস বাতাসে’তে আইসা ঠেকল। রাইসু ভাই বললেন, ছবি তো আঁকতে হবে, লেখার সঙ্গে আঁকা ছবি দিলে বেটার। উনি বললেন আঁইকা পাঠাইতে, সেইটা সম্ভব ছিল না। পরে বললেন, উনার বাসায় গিয়াও আঁকতে পারি ছবি। তার পরদিন বিকালবেলায় আমি রাইসু ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকার জন্য গেলাম।

যেহেতু লেখার জন্য আঁকা লাগবে, ফলেই ছবি তো হইতে হবে ক্যারেক্টারের ছবি। যাই হোক, বহু কষ্টে দুইটা ক্যারেক্টারের ছবি আঁকলাম। একটা আমার, আরেকটা আমার ওই প্রেমিকার, উনার নাম ছিল রাত্রি। লেখাটার নামও ‘রাত্রি’।

ছবি আঁকা শেষে রাইসু ভাইয়ের বাসায় চা খাওয়া হইল। নানান আলাপ হইল। সবচে বেশি হইল যেটা, সেটা যৌন আলাপ। নিজেদের বিভিন্ন যৌন অভিজ্ঞতাও আমরা শেয়ার করলাম, তবে নিশ্চয়ই তার প্রমাণ না রেখেই, নামধাম হাইড করে। খুব সম্ভবত, এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম সুন্দর যৌন আলাপ।

এক পর্যায়ে বিদায় নিলাম। অফিসে ফিরবার পর পর’ই রাইসু ভাইয়ের ফোন পাইলাম। উনি বললেন, সাম্প্রতিকে আমার লেখাটা প্রকাশ হলে তো অন্যান্য অনেকেই আমার কাছে লেখা চাইবে, তাদেরকে আমি লেখা দিব কিনা। আমি বললাম, “কী করবো? দিব নাকি দিব না।” উনি বললেন, “এই বিষয়ে দিয়েন না আর কাউকে লেখা।” আমি বললাম, “ওকে রাইসু ভাই।”

সাম্প্রতিকে লেখা প্রকাশ হবার পরে অবশ্য আর কেউ লেখা চাইলেন না। তবে, ব্যক্তিগতভাবে আমি, মনের চিপায় চিপায় একটি মর্যাদাকেই ফিল করলাম, যা আমাকে এই লেখালেখি-দুনিয়ার লগে একেবারেই ওতপ্রোত কইরা দিল। আর তার ধারাবাহিকতাতেই আমি পর পর আরো কয়েকটি লেখা লেইখা ফেললাম। মনে পড়ে, তিন নাম্বার লেখাটিকে রাইসু ভাই উনার ফেসবুক ওয়ালে এই লিখে শেয়ার করলেন, “সাদ রহমানের গদ্য ভালো লাগতেছে। সাবধান, সাদ রহমান!”

৩.
আমার বাংলামটরের পত্রিকাটি পনেরো সালের শেষদিকে এসে টাকা নিয়া বেশ ঝামেলা আরম্ভ করল। এইখানে বলে রাখি, রাইসু ভাই উনার পত্রিকায় লেখা বাবদ আমাকে প্রতি লেখা তিনশ টাকা কইরা দিতেন। ভাড়াটাড়া সহ যা প্রায় পাঁচশ হয়ে যাইত। প্রথমদিন যেবার উনার বাসায় গেলাম, সেদিন থেকেই এই বিল আমি পাইতে শুরু করলাম। ওইদিন উনি আমাকে অনুরোধ করলেন যেন আমি এই বিলের ব্যাপারটি গোপন রাখি। অবস্থাসম্পন্ন অনেকেই উনার পত্রিকায় লেখেন, সবাইকে লেখার বিল দিলে তা এক বেশ বড় ব্যয়ের ব্যাপার হবে। ফলেই উনার সিদ্ধান্ত ছিল, অবস্থার ঘাটতি আছে যাদের, তাদেরেই তিনি লেখার বিল দিবেন।

আমি এতদিন ব্যাপারটা গোপন রাখলেও আজকে তা লেইখা ফেললাম, হি হি, রাইসু ভাই রিসেন্টলি উনার একটা ফেসবুক পোস্টে লিখছেন, উনাকে নিয়ে লিখতে, আর ভাবতে যে উনি মইরা গেছেন, তাইলে লেখা সহজ হবে, হা হা।

যাই হোক, পনেরো সালের ডিসেম্বরে একদিন রাইসু ভাইয়ের বাসায় ছবি আঁকতে গেলাম, আলাপে আলাপে উনাকে জানাইলাম আমাকে বাংলামটরের পত্রিকা অফিস আর বেতন দিতেছে না। কথা ওঠাতে, খুব সম্ভবত আমিই জানতে চাইলাম, উনার পত্রিকায় চাকরি করা যাবে কিনা। উনি সাম্প্রতিকের অন্য দুই স্টাফের সঙ্গে পরামর্শ করলেন, সাম্প্রতিকে ওইদিন আমার চাকরি হইল, বেতনও ধার্য হইল। উনি শর্তমূলক ভাবে জিগাস করলেন, ছোট ছোট গেরস্থালি কাজ করতে আমার কোনো অসুবিধা আছে কিনা, লাইক চা বানানি, দুধ গরম করা, ইত্যাদি। আমি বললাম, না, অসুবিধা নাই।

দুই হাজার ষোল সালের জানুয়ারি মাস থিকা রাইসু ভাইয়ের পত্রিকায় চাকরি শুরু করলাম। দেখা গেল, আমি প্রায় দিনই বেতনের একটু একটু কইরা অ্যাডভান্স নিতে আরম্ভ করলাম। কোনো দিন পাঁচশ, কোনোদিন দুইশ, এইভাবে মাস শেষের আগেই আমি বেতন পুরাটা বা বেশি অর্ধেকটা নিয়া ফেলতে লাগলাম। সরল কথাটি হইল, সাম্প্রতিকে চাকরি নিয়া আমি আর্থিকভাবে বেশ আনন্দপূর্ণ হইয়া উঠলাম।

রাইসু ভাইয়ের এই বাসাটা ছিল নতুন, তাই নতুন বাসার নানান কাজে আর বিশ্রামে বিশ্রামেই জানুয়ারি মাসটা কেটে গেল। উনার সংগ্রহে ছিল প্রচুর ক্যাসেট, এখনো নিশ্চয়ই আছে, সেইগুলাকে ঠিকঠাক করতে করতে আমাদের অনেকদিন লাগল। রাইসু ভাই, আমি এবং সাম্প্রতিকের আরেকজন স্টাফ সাঈদ রূপু, একটি ক্যাসেট প্লেয়ার সহযোগে সেইসব ক্যাসেট আমরা সাজাইলাম অনেকদিন ধরে, রৌদ্রে দিলাম, রৌদ্র থেকে আনলাম, কার্টনে ঢুকাইলাম, ইত্যাদি। ইতিমধ্যেই ফ্রেব্রুয়ারি মাস চইলা আসল।

ফ্রেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা, বইমেলায় সাম্প্রতিকের সঙ্গে আমি অনেক কাজ করলাম। মার্চ মাসটি ছিলাম না, এপ্রিল থিকা আবার কিছুদিন রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করলাম।

রাইসু ভাইয়ের বাসায় আমি কিছু অদ্ভুত শান্ত দুপুর কাটাইছি। আমার অফিস টাইম থাকত প্রায় দিন এগারোটা-বারোটা, কোনো কোনোদিন আরও আগে, যাওয়ার পরে দেখা যাইত রাইসু ভাই অনেকক্ষণ কাজ-টাজ কইরা এবার একটু জিরাইতে চান, মানে আরো অনেক আগেই ঘুম থিকা উঠছেন। আমাদের প্রায় দিন বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ হইত, যখন যেই কাজ চলত সেই কাজের, লাইক, মাসব্যাপী ইন্টারভিউ নেওয়া হইতেছে, সে বিষয়ে পরামর্শ, অথবা রাইসু ভাইয়ের প্রকাশনী ‘বহিঃপ্রকাশ’, সেটার বিষয়ে, ঘরোয়া বিষয়েও আলাপ-পরামর্শ হইত, রাতে-সন্ধ্যায়-বিকালে কখন কে বাইর হবে, কে কোথায় খাবে, নাস্তা আনলে কয়জনের নাস্তা আনা হবে, এইসব।

আলাপ পরামর্শে রাইসু ভাইকে অনেকদিন পাইবার কারণে আমার একটা খুব উপকার হইছে। যেহেতু রাইসু ভাইয়ের চিন্তার হিসাবটা ভিন্ন, এবং উপকারী। আমি অনেকবারই ভাবছি, রাইসু ভাইয়ের চিন্তা আসলেই কী রকম ধরনের ভিন্ন। ফাইনালি আমার এমন মনে হইছে যে, ধরা যাক ‘বহিঃপ্রকাশ’ নিয়া আমাদের আলাপ-পরামর্শ চলতেছে, কিছুক্ষণ এই-সেই আলাপ হইল, একটু পরেই দেখা গেল আমরা সবাই দুটি-একটি মৌলিক জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হইছি, রাইসু ভাই জিগাস করলেন, “বই কি আমরা দামে বেচব নাকি কম দামে বেচব? কোনটা ব্যবসায়িক?”

রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শের সুবিধাটা এই রকম, অল্পতেই আলাপের হকিকতে ঢুইকা পড়া লাগে। আমি অন্যান্য আরো সব পরামর্শ-আলাপের ঘূর্ণিতে ঢুইকা দেখছি যে বেশিরভাগের হকিকত পাইতেই বিলম্ব হয়, ফলে উনাদের থিকা রাইসু ভাই অফকোর্স ভিন্ন হন, কিন্তু এই ভিন্নতা নিয়াও আলাপ থাকে। সেটা হইল যে, উনার এই ভিন্নতা তো তাইলে একটা বেটার-কেই নির্দেশ করে, যেই ভিন্নতা বেটার, তা কি কেবলই ভিন্নতা থাকে? আমি মনে করি, তা যতখানি ভিন্নতা তার চাইতে বেশি হইল বেটার, আর এই বেটার-রে ভিন্নতা বইলা পরিচিতি দেওয়াকেও সামটাইমস, বলা যাবে হঠকারিতা।

আমি অনেক লোকেরে দেখছি, বিশেষত বৃদ্ধ লোকদেরকে, উনারা বলেন রাইসু আনকমন, বা ইউনিক, বা ভিন্ন, কিন্তু এর ভিতর দিয়া উনারা রাইসুর বেটারের দিকটারে লঘু করতে চান। ব্যাপারটা ভাল লাগে না।

যাই হোক, সাম্প্রতিকে চাকরিকালে এমন আরো অনেক কিছুই আমার জন্য নির্দেশনামূলক হইল। যা আমার লেখালেখি-জীবনের শুরুতে হইয়া ওঠা জরুরি ছিল বইলাই আমি মনে করি, এইজন্য আমি গভীরে গভীরে রাইসু ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি।

আরেকটা যেটা আমার জন্য নির্দেশনা হইল, তা এই বাংলা কনটেক্সটের শিল্পসাহিত্যের যেই সম্মান-সম্পর্ক-ছাত্রত্ব নির্ভর রূপ, তা থিকা আমার হাসতে হাসতে বের হইয়া আসা হইল। ইজ্জত, মোরালিটি, হুজুরি, বই-পাতা-টেক্সট, হিস্ট্রি ও হিস্ট্রির পবিত্রতা, এইসবের ভিতর দিয়া এই ভড়ংচোদা শিল্পসাহিত্যিক সমাজের ঠ্যাঙগে পিছ-পিছ ঘুরবার মৌন ও সাহিত্যিক যেই শিকল, এর থিকা ছুইটা যাওয়া আমার পক্ষে ঘইটা  গেল। আমার বরং ‘ফিল ফ্রি’ লাগল।

এ রকম অনেক কিছুর ভিতর দিয়া, সাম্প্রতিকের দিনগুলা শেষ হইল একদিন, রাইসু ভাই কক্সবাজার যাবেন, তো আমরা এক সপ্তাহ অফিস করব না। কিছু টাকা আমার বাকি ছিল, সন্ধ্যায় অফিস থিকা বাইর হইতে সময় রাইসু ভাই সহ নামলাম, উনি ব্যাংক থিকা টাকা তুইলা টাকা দিলেন, রাস্তায় দাঁড়াইয়া কিছুক্ষণ আমরা আড্ডা মারলাম, তারপরে চইলা আসলাম।

এরই মধ্যে, হয়তো বা নানান জাগতিক, (অজাগতিকের বিচারে এই জাগতিক নয়, হুদাই জাগতিক) সাহিত্যিক বিষয়াদিও যুক্ত হইছিল আমাদের সম্পর্কটাতে, রাইসু ভাই কক্সবাজার থিকা ফিরলেন। অফিসে যাব কি যাব না, এইরকম এক দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকতে-থাকতেই রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে পরামর্শ হইল, অফিসে না গিয়া অফিসের বাইরে থেকে কিছু কাজ করব আমি, এমন সিদ্ধান্ত হইল। সেটা আর হইল না।

রাইসু ভাই মনে করতেন, আমার ক্যারিয়ারের জন্য বেশি ফলদায়ক হবে যদি আমি সম্পূর্ণই অফিসিয়াল কোনো এনভায়ারমেন্টে কাজ করি, মানে নিউজভিত্তিক পত্রিকাগুলার কোনো একটাতে। উনি কেন যে এমন মনে করতেন, তা নিয়া আমার আজো কমবুঝি আছে। আজো আমার ওইরকম কোনো পত্রিকায় কাজ করা হইল না, সাম্প্রতিক ছাইড়া আসবার পর।

৪.
আমি এই বছরের মে মাসে রাইসু ভাইকে নিয়া পিপলের একসেপ্টেন্সি ও ইগনোরেন্সি বিষয়ে একটা স্ট্যাটাস দিছিলাম, ওই আলাপটা এইখানেও উল্লেখ করলে ভাল হবে মনে করি, তাই স্ট্যাটাসটা এইখানে পেস্ট করলাম:

‘‘ব্রাত্য রাইসুকে হুদাই হিংসা কইরা এইখানে একটা বেহুদা বিদ্বেষ চালু আছে। যারা এমন করেন, তারা রাইসুর স্ট্যাটাসের, বক্তব্যের, ভাষার ভুল ধরতে চান। এইভাবে যে, তারা বলতে চান রাইসু হাউ ক্ষতিকর, হাউ দূষণকারী, হাউ শয়তান, ইত্যাদি।

কিন্তু রাইসুর হিংসকদের জন্য একটা দুঃখের ব্যাপার হইল, আদতে, ব্রাত্য রাইসুর কথা ও চিন্তায় ভালমানুষি-ই পাওয়া যায়। মানে খারাপমানুষি পাওয়া যায় না। তথা এই সোসাইটির সমস্যাগুলারে নোটিশ করবার ক্ষেত্রে, আবেগ আর কাণ্ডজ্ঞানহীনতারে বাদ দিয়া ব্রাত্য রাইসুর মতো কথা বলতে পারার ঘটনা বিরল।

রাইসুর হিংসকরা তার মুখের দিকে ভাষাদূষণের যেই কালিমা ছুঁড়তে চায়, এই কালিমাই শেষমেশ ভাষারে একটি বুর্জোয়া ভাব থিকা মুক্তি দিতে পারে। নষ্ট চিন্তা, কলুষ চিন্তা, ক্যাচি চিন্তা, ইত্যাদি বইলা বইলা ব্রাত্য রাইসুর চিন্তার যে ক্রিটিক ইনারা করতে চায়, খেয়াল করা লাগে, তার চিন্তার এইধরনই এইদেশের চিন্তারে একাডেমি, বৃদ্ধ, টিভি আর পত্রিকার হাত থিকা ফেসবুক পর্যন্ত আইনা দিতে বড়মাত্রার হেল্প কইরা থাকে।

এন্ড ব্রাত্য রাইসু ফেসবুকে যা বলেন, তা প্রথমত এবং শেষতঃ মজলুমের সমস্যা এবং সোসাইটির ফেইক ফেইক ভ্যালুরে নোটিশ করতে পারে। সুতরাং মনে হিংসা হয় বইলা তারে ক্ষতিকর বইলা ফেললে, এই বলাকারিই আপনাআপনি সমস্যার পক্ষে দাঁড়াইয়া যান।

আমি মনে করি, আমাদের এই তৃতীয় বিশ্বে, ফেইক ভ্যালুজের সমুদ্রে, চিন্তার গরিবিতে ব্রাত্য রাইসুর লেখালেখি ও তার হিটপাটগুলা খুব জরুরি ছিল। না হইলে আমরা বর্তমানে যেই অবস্থায় আছি, সেইখানেই এখনো পর্যন্ত আসা হইত না। আমাদের বাংলা টেক্সটের ফেসবুক আরো পরাধীন, আরো ক্যাবলা, আরো বেহুদাই থাইকা যাইত।

রাইসুর হিংসকদেরকে এই ব্যাপারগুলা সমঝ করতে হইব। হিংসা যদি করতেই হয়, তাইলে উনার এইসব কাণ্ডরে স্বীকার কইরা নিয়া, তার মধ্যে আর কি সংযোজন বা বাদ দিবার থাকে, সেই আলাপ তুলতে হইব।

ব্রাত্য রাইসুকে দুম কইরা এই ভাষা এবং সোসাইটির জন্য ক্ষতিকর বইলা দিলে নিজেরই ক্ষতিকর হইয়া পড়া ছাড়া গতি কম।’’

আমার এই স্ট্যাটাসের নিচে রাইসু ভাই কমেন্ট করেন, ‘‘হিংসারে গণ্য করা যায় না। ওইটা সাইকোলজিক্যাল স্টেট। আমার যদি নেতৃত্বের ব্যাপার থাকে তাইলে ওনারা সেই নেতৃত্ব মানতেছেন না কেন বা তার বিপরীতে তাদের কী অবস্থান তার জিজ্ঞাসা বেটার অপশন হইতে পারে। থ্যাংকস সাদ। শেয়ার করলাম। আপনারে অ্যাড রিকোয়েস্টও পাঠাইলাম।’

হিংসা-অহিংসার এই বাইনারি মানদণ্ডে আমিও আর নাই, এই কয়দিনে আমি ওই অবস্থান থিকা বাইর হইয়া আসছি। কিন্তু ওই স্ট্যাটাসে রাইসু ভাইয়ের যেই ‘ভালমানুষি’কে আমি নোটিশ করছি, সেইটাই এখনো আমার আসল পয়েন্ট রয়, এইখানেও আমি ওইটাই পুনরায় নোটিশ করি। সেইসঙ্গে রাইসু ভাইয়ের অবস্থানের বিপরীতে যারা, তাদেরও অবস্থান আদতে কী, সেই জিজ্ঞাসাও তুলি।

আমি অনেক দিন অনেক কিছু ভাববার পরে, আমার কাছে সত্যিকার অর্থেই ‘ভালমানুষি’টারে ইম্পর্টেন্ট মনে হইছে। ফলেই রাইসু ভাইয়ের লেখালেখি আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট, এবং রাইসু ভাইয়ের বিপরীতঅলাদের ব্যাপারেও আমার একই আলাপ। মানে হইল, আমি যদি লেখালেখিরে ভালমানুষি দিয়া সমাধান করিব, তবে বেটার ভালমানুষি ছাড়া আর কীভাবেই বা এই হঠকারির দুনিয়ায় ওই বিপরীতঅলারা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হইবেন। আমি বলব যে, বেটার ভালমানুষি’র সন্ধান না দিতে পারলে রাইসুর বিপরীতঅলাদেরকেও রাইসুর সঙ্গে এলাই হইতে হবে, আদারওয়াইস উনাদেরকে মানবের ওই সাইকোলজিক্যাল স্টেট দিয়াই বিচার করা লাগবে, যা হয়ত বা ঈর্ষা, হয়ত বা ব্যক্তিত্বের সংকট, যেটা কিনা কবি-লেখকদেরই বেশি বেশি হইয়া থাকে, অথবা যা কিনা হইয়া থাকতে পারে ভালমানুষিহীনতা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

রাইসু ভাইয়ের একটা কবিতা আছে ‘এই দেশে বৃষ্টি হয়’, কবিতাটার অল্প কয়েক লাইন এইখানে দিয়া লেখাটা শেষ করি, তাইলে ভাল লাগবে।

‘‘তবু কেন বৃষ্টি হয়? তবু,
এই তবু জীবনানন্দের তবু নয়;
এই তবু আমাদের উষ্মার প্রকাশ
এই তবুকে ইগনোর করে বৃষ্টি দীর্ঘ মহাকালব্যাপী

এই দেশে মহাকাল অত দীর্ঘ নয়
আমাদের মহাকাল—ব্যক্তিগত, নিজের ব্যাপার।
তাতে সময়চেতনা, কোনো ইতিহাস
অধ্যাপনা নেই, তাতে অর্থনীতির ছাত্রী বসে আছে
এ কা কি নী
জীবনের অর্থ খুঁজিতেছে
তাকে অর্থ দাও, কীর্তি দাও, সচ্ছলতা দাও
তাকে বিপন্ন বিস্ময় দাও, একদিন জোর করে
বৃষ্টিতে ভেজাও। বলো,
মহাকালে এইরূপ বৃষ্টি হয়ে থাকে।’’

Facebook Comments
More from সাদ রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *