রাইসু স্বাধীন বুদ্ধিজীবী, আমি স্বাধীন পাঠক

রাইসুর কবিতা সাধারণ মানের, আমি মূলত তার বুদ্ধিজীবিতা, দার্শনিকতা, ছবি এবং ভাঁড়ামোর ভক্ত।

ব্রাত্য রাইসুকে আমি কখনও চর্মচক্ষে দেখি নি। দেখার সাধও নাই। যদিও অনেক বছর আগ হইতেই আমি ব্রাত্য রাইসুর নাম শুনে আসছি। ফেসবুকে আমি তাকে নিবিড়ভাবে ফলো করি। যেহেতু সি-ফার্স্ট হিসাবে ফলো করি তাই ভাবলাম যখন সুযোগ আছে লিখি না দুই এক কলম। প্রকাশ করিবে কি না নিতান্তই রাইসুর ব্যাপার।

ব্রাত্য রাইসুর যে ব্যাপারটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে—‘উনি স্বাধীন বুদ্ধিজীবী’। তিনি আহমদ ছফা এবং ফরহাদ মজহার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। যে কোনো দল, মত, সঙ্ঘের বাইরে একান্ত স্বাধীন মানুষ। কারো চাদর গায়ে জড়ান নাই, বা চাদরের নিচে ঢাকা পড়েন নাই যেমনটি অনেকেই পড়েছেন বা পড়ে থাকেন। ব্রাত্য রাইসু শতভাগ স্বাধীন বুদ্ধিজীবী।

সোহেল এইচ রহমান

ব্রাত্য রাইসুর চিন্তা অন্যদের থেকে আলাদা। অসম্ভব রসবোধ তার। কয়দিন আগে লিখলেন, “দুঃখজনকভাবে আমার বয়স পঞ্চাশ হয়ে যাচ্ছে!” তিনি ১৩০ বছর বাঁচতে চান!  বেশ বড় লক্ষ্য! রাইসু নিজেকে ভাঁড় হিসাবে উপস্থাপন করেন। উনি ভাঁড়ই, তবে রাজ দরবার থেকে দূরে থাকা ভাঁড়; স্বাধীন ভাঁড়। রাইসু একাধারে কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বই বিক্রেতা, দার্শনিক এবং ছবি আঁকিয়ে। রাইসুর কবিতায় নতুনত্ব আছে। প্রচুর স্ল্যাং ইউজ করেন। যেমন: “পশ্চিম আমার গোয়া মেরে মেরে আমাকে করেছে পশ্চিম।” রাইসুর কবিতা সাধারণ মানের, আমি মূলত তার বুদ্ধিজীবিতা, দার্শনিকতা, ছবি এবং ভাঁড়ামোর ভক্ত।

ব্রাত্য রাইসু একটা স্বতন্ত্র ভাষারীতির প্রবর্তক। রীতিনীতিহীন ভাষারীতি! আমি ওই রীতিতে লিখি না, কিন্তু পড়ে মজা পাই!। অনেকেই তার স্টাইলে লেখেন যেমন: রক মনু, সালাহ উদ্দিন শুভ্র ইত্যাদি। ভাষা-প্রশ্নে রাইসুর অবস্থানের সাথে আমার অমত নাই। ভাষাকে স্বাধীনভাবে বইতে দেয়া উচিত।

ব্রাত্য রাইসুর ফেসবুক ওয়ালে গেলে মনে হবে উনি ২৪ ঘণ্টা ফেসবুকেই থাকেন। তবে রাইসু বেশ ইফেক্টিভলি ফেসবুক ইউজ করেন। ফেসবুককে টাকা না দিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে রুটিরুজির ব্যবস্থা করেন রাইসু, এও এক ব্যতিক্রম। অন্য কাউরে আমি দেখি নি এমন। উনি ফেসবুকের মাধ্যমে ছবি বিক্রি করেন, বই বিক্রি করেন এবং এগুলো কেনার জন্য ব্যাপক সাড়াও লক্ষ্য করি। রাইসুর বই প্রকাশ করে লসে পতিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। ফেসবুক মার্কেটিং-এ রাইসু সফল।

রাইসু নতুন কিছু সবার আগে দেখে ফেলেন, বুঝে ফেলেন, ধরে ফেলেন। তিনি এমন কিছু বলেন যা আগে কেউ বলে নি। এগুলো খুব মজা লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যা বলতে চাই কিন্তু পারি না রাইসু সেটা বলে দেন। কিছুদিন আগে উনি smart শব্দের বাংলা অনুবাদ করলেন ‘সজ্জিত বলদ’। অসাধারণ! একদিন স্ট্যাটাস দিলেন, “বিনয় বড় অহংকার।’’ প্রথমে খটকা লাগে, একটু পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় কথা মিথ্যা নয়। অনেক অহংকারীই বিনয়ের ভান করেন। প্রকৃত বিনয়ীদের কথা আলাদা।

ব্রাত্য রাইসু একজন লাজ-লজ্জাহীন স্বাধীন বুদ্ধিজীবী। তার এই লজ্জাহীনতা আমার না-পছন্দ। উনি খুব সাবলীলভাবে পোস্ট দেন, “মেয়েরা আসো।” উনি অকাতরে বলেন তরুণ মেয়েদের তার খুব পছন্দ। যতদূর মনে হয় নিজ পরিমণ্ডলে রাইসু প্লেবয় ইমেজের, চটি সাহিত্যও তার খুব পছন্দ। রাইসু সাহিত্য, বুদ্ধিজীবীতা বা যে কোনো সেক্টরে বটগাছ তৈরির বিপক্ষে কিন্তু উনি নিজেই মস্তবড় বট গাছ হয়ে উঠছেন, আপনা আপনি? আমার মনে হয় সচেতনভাবে। অন্তত তার ফেসবুক এক্টিভিটি দেখে সেটাই মনে হয়।

রাইসুর ভক্তসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ—মানুষ যেসব কথা, ইচ্ছা, কামনা অবদমন করে রাইসু বাস্তবে সেগুলো করেন। মানুষ রাইসুর প্র্যাকটিস দেখে নিজের অবদমনের কষ্ট ভোলেন। অন্যভাবে বললে, অনেকে যা হতে চায় ব্রাত্য রাইসু সেটা হয়ে দেখিয়েছেন বা দেখিয়ে যাচ্ছেন; একজন স্বাধীন মানুষের পক্ষেই এসব সম্ভব।

সবশেষে আবার কই, আমি যা ব্যক্ত করলাম তা স্রেফ রাইসুর ফেসবুক পোস্ট ফলো করা পর্যবেক্ষণ। রাইসু হয়তো এমন না। তাতে কিছু যায় আসে না; আমি যেমন বুঝেছি তেমন বললাম। রাইসু স্বাধীন বুদ্ধিজীবী, আমি স্বাধীন পাঠক।

Facebook Comments
More from সোহেল এইচ রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *