রাইসু

মাঝেমধ্যে রাইসু তার স্টাটাসে আমাকে সমর্থন করেন, মাঝেমধ্যে আমার বিরোধিতা করেন। আমি তার পাতা ফাঁদে পা দিই না।

ঢাকা শহরে খুব কমজনই আছেন, যারা আমাকে ‘তুই’ বলেন, আমিও যাদের ‌’তুই’ বলি।

আমার ভাইবোনেরা আমাকে ‘তুই’ বলে ডাকেন, কিন্তু আমি তাদের ‘আপনি’ বলি। আম্মাও আমাকে ডাকেন ‘তুই’, আমি তাকে ডাকি ‌’আপনি’। মোজাম্মেল বাবু ভাই আমাকে ‘তুই’ ডাকেন, আমি তাঁকে ‌’আপনি’ ডাকি। আমার ক্লাসমেটদের বেশির ভাগের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ‘তুমি’র। একজন দুইজন আমাকে ‘তুই’ বলে, আমিও পাল্টা ‘তুই’ বলি, খুব যে আনন্দের সঙ্গে বলি, তা নয়। আমি নিজেকে তুচ্ছার্থ ভাবি না। প্রেমার্থ ভাবি। আমার প্রিয় তাই ‘তুমি’।

ঢাকা শহরে এখন মাত্র দুজনের সঙ্গে আমার তুই তোকারি সম্পর্ক। একজন হলেন উৎপল শুভ্র, আরেকজন হলেন ব্রাত্য রাইসু।

ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে প্রথম দিকে যখন পরিচয় হলো, আমি তাকে ‘তুমি’ বলে ডাকলাম। তিনি আমার দুই বছরের জুনিয়র হবেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকলেন। আমি ভাবলাম, আমাকে জিততে হবে। আমি ডাকলাম ‘তুই’। তিনিও আমাকে ডাকলেন ‘তুই’।

তিনি বললেন, যে আমাকে যেভাবে ডাকবে, আমিও তাকে সেইভাবে ডাকব।

আনিসুল হক

ব্যস, আমরা চিরস্থায়ী তুই-তোকারির সম্পর্কে আবদ্ধ হলাম। সে বহু বছর আগের কথা। ১৯৯০ সালেরও আগে। যখন আমরা পূর্বাভাস পত্রিকা বের করতাম। রাইসু সেই পত্রিকায় তার বিখ্যাত অপ্রমিত ভাষায় অনেকের সাক্ষাৎকার  নিয়েছিলেন।

সেই সময় আরেকজন বিস্ময়কর প্রতিভার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল—আদিত‌্য কবির। রাইসুর কাছ থেকে শিক্ষা পাওয়ার পর আদিত্যকে বহুদিন ‘আপনি’ ‘আপনি’ বলে ডেকেছি, এখনো বুঝি তাই ডাকি।

রাইসুর প্রান্ত নামের একটা পত্রিকা করলেন। আমার কবিতা নিলেন।

আমরা ভোরের কাগজ, কিংবা লতিফ সিদ্দিকীর কাগজ রোদ্দুরের পক্ষ থেকে এক সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম কখনো সৈয়দ শামসুল হকের, কখনো বা শামসুর রাহমানের।

একবার হক ভাইয়ের বাসায় গেছি। আলাপ-আলোচনা চলছে। শামসুর রাহমান কেন প্রধান কবি। ১৯৮৪ সালে রংপুরে হক ভাইয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। আমি তখন ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে বুয়েটে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরুর অপেক্ষা করছি। হক ভাই তখনই আমাকে বলেছিলেন, গৌণ কবিরা স্রোতের সঙ্গে ভেসে যায়, প্রধান কবিরা বাঁক বদলে দেয়। তো সেই প্রসঙ্গ আবার তুলতে গেলাম। শামসুর রাহমান নিশ্চয়ই ঢাকা কেন্দ্রিক কবিতায় বড় বাঁক তৈরি করেছেন। আরো অনেকেই তার সঙ্গে আছেন। কিন্তু রাইসু বলে বসল, আরে রাহমান ভাইরে উঁচা জায়গায় তুইলা দিছে, উনি আর নামতে পারতেছেন না, আপনারাও আর নামাইতে পারতেছেন না। আরো কী যেন রাইসু বলল। হক ভাই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন, রাইসুকে বললেন, ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারস্মার্ট, ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভার স্মার্ট।

রাইসু ওভারস্মার্ট কিনা জানি না, তবে ভীষণ স্মার্ট। স্মার্ট মানে এখানে বুদ্ধিমান।

রাইসু আমার তারিফ করত প্রকাশ্যে, বলত, মিটুনের মধ্যে ক্রিয়েটিভ ইম্পালস আছে।

আর আমি রাইসুর তারিফ করি ওর আড়ালে, বলি, রাইসু একটা জিনিয়াস।

রাইসু যে জিনিয়াস সেটার একটা পরিচয় ধরা আছে তার আঁকা ছবিতে। পেন্সিলে রাইসু কতগুলো ছবি এঁকেছিল, তাতে মৌলিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল দক্ষতা। আর ছিল ভীষণ রকমের কল্পনার বিস্তার।

আমি সেই ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

এরপর পড়লাম তার কতগুলো আগে লেখা কবিতা। যেগুলো একটু লালিত্যময় ছিল বলে রাইসু হয়তো তার বইয়ে রাখে নাই। এরপরে একটা কবিতায় সে যে লিখেছিল ‘জয়ের ছায়া সুনীল গাঙের ছায়া’—তাতেই আমার স্থিরবিশ্বাস জন্মাল যে, রাইসু একটা সাংঘাতিক উইটি ছেলে।

আমি নির্মলেন্দু গুণের সাংঘাতিক ভক্ত। এর একটা কারণ তার অকৃত্রিমতা। তাঁর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নাই। যা ভাবেন, তাই করেন, যা করেন, তা লুকোন না।

রাইসুকেও আমার একই কারণে পছন্দ। তিনি যা ভাবেন তা বলে ফেলেন। যা করেন, তাও বলে ফেলেন।

 

তবে রাইসুর মধ্যে প্রথা, সমাজ, মূল্যবোধ বিরোধিতাটা হয়তো তাঁর রাইসু হয়ে ওঠার প্রধান সূত্র। নির্মলেন্দু গুণ আগে কবি, তার পরে ভণ্ডামিবিরোধী। রাইসুর ক্ষেত্রে উল্টোস্রোতে অবিরাম সাঁতার কাটাটা প্রথম, বাকি কাজ দ্বিতীয়। এটা আমার সমালোচনা নয়, এটা আমার পর্যবেক্ষণ।

আমাদের সমাজে কোনো বিদ্রোহী নাই বললেই চলে। সবাই আমরা সমাজের আজ্ঞাবহ। সব ইস্ত্রিকরা ভাজহীন মানুষ। এই একই রকম ছাচে ফেলা মানুষের ভিড়ে রাইসু ছাচের বাইরের মানুষ।

রাইসু একবার লিখল, সবার জন্য শিক্ষা হলো একটা মানবাধিকার-পরিপন্থী ধারণা। আমার অধিকার আছে আমি অশিক্ষিত থাকব। আপনি কেন আমাকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দেবেন?

এই কথাটা নিশ্চয়ই নৈরাজ্যমূলক। কিন্তু আমি অনেকবার রাইসুর এই কথাটা নিয়ে ভেবেছি। সত্যি তো, কেউ যদি আপনার দেয়া শিক্ষা না নিতে চায়, আপনি কে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে শেখাবেন? নৈরাজ্য কথাটাও তো আসলে ইতিবাচকই। আমাদের এত রাজ্যপাট মানতে হবে কেন?

(রাইসু হয়তো এইভাবে ভাবে নি, কিন্তু তর্কের খাতিরে বলাই যায়—রবীন্দ্রনাথ বাধ্যতামূলক এডুকেশনের বাইরে ছিলেন বলেই তো রবীন্দ্রনাথ হতে পেরেছিলেন।)

রাইসুর উইটের কোনো তুলনা নাই।

একবার একজন বলল, রাইসু, তোমার মন-মানসিকতা কেমন। সে বলল, আমার মন খারাপ আর তোমার মানসিকতা খারাপ।

আরেকবার এক মজার কাণ্ড হয়েছিল। ভারত থেকে একটা নাটকের দল এসেছিল সংস্কৃত ভাষায় নাটক করবে। কিন্তু তাদের প্রপস আসে নি। তবুও তারা নাটক করল শিল্পকলায়। একে তো প্রপস নাই, তারও পরে সংস্কৃত ভাষার নাটক। কেউ কিছু বুঝছে না। সবার মধ্যে অস্বস্তি, কখন শেষ হবে, হলে বাঁচা যাবে। নাটক শেষ হলে, একজন অভিনেতা, মনে হয় পীযূষ দা বললেন শাকের ভাইকে, আহ, কী নাটক হলো, দুর্দান্ত!

রাইসু ছিল, বলল, হ, আমি হুনছি, অনেক দেশে নাটক হয়, মঞ্চের পর্দাটা ওঠেই না, নামানোই থাকে, ওইটা আরো দুর্দান্ত হয়।

 

রাইসুর সঙ্গে আমার ‘তুই’ ‘তুই’ বন্ধুত্বকে আমি মূল্যবান মনে করি। মাঝেমধ্যে রাইসু তার স্টাটাসে আমাকে সমর্থন করেন, মাঝেমধ্যে আমার বিরোধিতা করেন। আমি তার পাতা ফাঁদে পা দিই না। আমি শুধু উপভোগ করি, কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া দেখাই না।

আবার মাঝে মধ্যে হুট করে রাইসুর ফোন আসে। দোস্ত, একটা দীর্ঘ কবিতা দে।

কী করবি?

বই করব।

আচ্ছা দিব।

কবে দিবি? কাইলকাই দে।

কাইলকা? যাহ। আমি হাসি।

আরে না। তুই কাইলকাই দিবি। যা। তোর জন্য পরশু।

আমি রাইসুর এই দাবিকে ভীষণ পছন্দ করি। এই জুলুমকে। সে যদি আমাকে ভালো না বাসত, এইভাবে জুলুম করত না। এই জুলুম অধিকারবোধের জুলুম।

আমি কুড়ি বছর আগেও মনে করতাম, রাইসু আমাদের সবচেয়ে প্রতিভাবান সাহিত্যব্যক্তিত্বদের একজন, এখনো মনে করি।

কবি আলতাফ হোসেন একবার কবিতা লিখেছিলেন, কবিতা যে লেখা হচ্ছে রাইসু এলেই বোঝা যায়। রাইসুকে দেখে আমারো আগে তাই মনে হতো। এখন তো দেখাই কম হয়।

আরেকবার রাইসু লিখল, স্টারেরা আমাকে চিনে। নিমা রহমান নাকি তাকে দেখে চিনেছিলেন। এই নিয়ে কবিতা। রাইসু নিজেকে নিয়ে ফাজলামো করতে পারে। এইটা সবাই পারে না।

রাইসুর বই বেরুল, আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি

আমারো বই বেরুল, শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে, জলরংকাব্য। রাইসুর বই খুব সুন্দর হয়েছিল। কাগজ ভালো, প্রচ্ছদ ভালো, ওর নিজের করা। কিন্তু কে যেন জিগ্যেস করল, কার বই বেশি বিক্রি হয়েছে, রাইসু অকপটে বলল, মনে হয় মিটুনেরটা।

 

রাইসু বোধ হয় তার প্রথাবিরোধিতা চর্চা করতে গিয়ে বেশি মূল্য দিয়ে ফেলল।

আজ থেকে ২২/২৩ বছর আগের কথা। আমরা ময়মনসিংহ যাচ্ছি একটা সাহিত্য আসরে যোগ দিতে। আমি, সাজ্জাদ ভাই, রাইসু। একটা মাইক্রোবাসে।

রাইসু সাজ্জাদ ভাইকে বলছে, আমি ওভারহিয়ার করছি, সাজ্জাদ ভাই, অমুক ছড়াকার আমাকে দেখলেই এই রকমভাবে আক্রমণ করে।

আমি সেইদিন বুঝেছিলাম, রাইসুর হৃদয়ও আমাদেরই মতো। আক্রান্ত হলে ব্যথিত হয়।

রাইসু যখন সারাটা পৃথিবীকে আক্রমণ করে, তখন একটা ব্যথিত নিঃসঙ্গ কবিহৃদয়কে আমি অনুভব করি, যে কিনা আসলে নিজেই আক্রান্ত।

কোনোদিন আমি রাইসুকে এটা বলি নি। আজ তার ৫০ বছরের সুবর্ণ জয়ন্তীতে এটা বললাম। রাইসু এটা পছন্দ করবেন না। কারণ রাইসু দেখাতে চান তিনি আসলে আক্রমণকারী, আক্রান্ত নন।

আমি জানি, আমার লেখায় রাইসুকে একবার তিনি একবার সে করে লিখছি। এটা ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু যেভাবে এলো, সেভাবেই রাখলাম। কারণ রাইসুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এই রকম। আপনি, তুমি, তুই যেখানে একাকার হয়ে যায়।

রাইসু, তোর জন্য আমার জেনুইন রেসপেক্ট, এপ্রিসিয়েশন, শ্রদ্ধাবোধ আছে। তুই সেটা জানিস। জানিস বলেই, আমরা এতদিন এই শহরে মিলেমিশে বুড়ো হয়ে যেতে পারলাম। হ্যাপি বার্থ ডে টুই ইউ, রাইসু, দি পোয়েট অ্যান্ড দি রেবেল, অ্যান্ড ওয়ান অব আওয়ার ওল্ডেস্ট ফ্রেন্ডস।

(কভার ছবি. ১০ হাজার ফুট উচ্চতার বিগ বিয়ার লেক, ক্যালিফোর্নিয়ায়, ছবি. আল মাসুক ২০১৭)

Facebook Comments
More from আনিসুল হক

1 Comment

  • আপনি ব্যাথিত হলে স্বীকার করেন না আনিসুল হকের এই পরজবেক্ষন কি সত্য বলে মানেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *