লাল সংকেত

রাইসুর কথা ভাবলে ওর লাল চাদরে জড়ানো চেহারাটাই ভেসে ওঠে আমার মনে, এখনও।

আমার কাছে ব্রাত্য রাইসু মানে ‘অস্বস্তি’ বা ‘ভ্যাবাচাকা’। কখনো বা ‘মুশকিল’ও।

আমাকে বলা যেতে পারে সমাজের কেতা মেনে চলা স্টেরিওটাইপ ঘরানার মানুষ। সবাই যাকে ভাল বলে তাকে ভাল বলা; সবার চোখে যা খারাপ, তাকে খারাপ বলে মেনে নেওয়া আমার সহজাত প্রবণতা।

এই আমার সঙ্গে রাইসুর আলাপ হয়ে গেল সাজ্জাদ শরিফের সূত্রে, ১৯৯৪ কি ’৯৫ সালে। প্রথম প্রথম তার চমক লাগানো কথাবার্তা আর আচরণে দারুণ মজা পেতাম আমি। তাকে ঠিকঠাক বুঝে উঠি নি তখনো। তাই আমার ভালই লাগতে থাকে রাইসুকে।

শাওন আজিম

কোনো বিষয় নিয়ে আমি যেভাবে ভাবি, দেখতে পাই, সে ভাবছে তার থেকে সম্পূর্ণ উল্টোটা। ফলে সুকুমার রায়ের ছড়ার মত আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে সে আমার কাছে। কিন্তু আস্তে আস্তে তার সঙ্গে চেনাজানা বাড়তে থাকে। তখন আমার একেবারে নাস্তানাবুদ অবস্থা।

রাইসুকে চিনি, মেলামেশা করি, তাই কাছের লোকজন বিরক্ত হতে থাকে। বন্ধুরা বক্রোক্তি করে। এক সময় বাড়ি থেকেও বলে দেওয়া হয়, তাকে যেন বাড়িতে না ডাকা হয়।

আর আমার নিজেরও ভারি বেকায়দা অবস্থা তখন। তার অদ্ভুত সব কথাবার্তার কারণে তাকে না পারি সহ্য করতে, না পারি এড়াতে।

সাজ্জাদের খুবই কাছের মানুষ সে। ওই সময়টাতে প্রায় সারাক্ষণ তারা একসঙ্গে থাকে। চাইলেও রাইসুকে আমার বা আমাকে রাইসুর এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। অগত্যা তাকে আমার সহ্য করার ভাব করেই চলতে হয়।

এর কিছু দিন পরে অবশ্য ঝগড়াঝাটি হয়ে কথাবার্তা আর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। তাতে করে বেশ সুবিধা হয়ে গেল আমার। আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার সামাজিক জীবনের নিরবচ্ছিন্ন স্বাচ্ছন্দ আবার ফিরে আসে। আবার আমি স্বস্তিতে বসবাস করতে থাকি।

এভাবে অনেকগুলো দিন চলে যায়। বেশ অনেকটা দিন পর কীভাবে কীভাবে যেন তার সঙ্গে কথাবার্তা আবার শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা এমন নয় যে ভারি ভাব হয়ে গেল। বরং বলা যায় এবার পুনঃস্থাপিত হল ভদ্রস্থ একটা সম্পর্ক।

এর পর থেকে যে অনুষ্ঠান বা দাওয়াত ছাড়া খুব যে নিয়মিত রাইসুর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, তাও নয়। তবে ফেসবুকে নিয়মিতই দেখি তার মন্তব্য। বুঝতে চেষ্টা করি নানা বিষয়ে তার অবস্থান। আর সেগুলো হয় আমার জন্য ভারি মুশকিলের। কারণ বেশির ভাগ সময়ই তার কথার সঙ্গে একমত হতে পারি না। আবার এমনও নয় যে তার কথা একেবারে ঝেড়ে ফেলেও দিতে পারি। ফলে আমার জন্য হয়ে সেটা ওঠে ভারি অস্বস্তিকর একটি ব্যাপার। এ কারণে রাইসু আমার কাছে বিষম বিড়ম্বনাময় একটি বিষয়।

মনে আছে, রাইসুর সঙ্গে যখন আমার প্রথম আলাপ হল, তখন শীতকাল। একটা টকটকে লাল চাদর গায়ে জড়িয়ে সে ঘুরত। ওই চাদরটায় খুব মানাত তাকে। রাইসুর কথা ভাবলে ওর লাল চাদরে জড়ানো চেহারাটাই ভেসে ওঠে আমার মনে, এখনও।

লাল মানে তো বিপদ সংকেত। লাল মানে অবাধে চলার পথে হঠাৎ জোরে ব্রেক কষে ভ্যাবাচ্যাকা মুখে দাঁড়িয়ে পড়া।

(কভারের ছবি. শাওন আজিম, টার্কির ক্যাপাডোসিয়ায়)

Facebook Comments
More from শাওন আজিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *