হার্টে সমস্যা

ব্রাত্য রাইসুর বিশেষত্ব হইলো, তার পরিচিত লোকেরাও তার বিষয়ে আনপ্রেডিক্টেবল আচরণ কইরা থাকেন। স্পেশালি, সাহিত্যিকরা।

দুই হাজার সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে আগে, টেস্ট পরীক্ষা শেষে আমাদের ক্লাসের সেকেন্ড বয় ছিল যে ফিরোজ, তার মাথা বিগড়াইয়া যায়। সে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে অ্যান্ড পকেটবিহীন পায়জামা পইরা স্কুলে মাঠে আইসা উদাস ভঙ্গিমায় খাড়ায়া থাকে। হুমায়ূন আহমেদ পড়তে পড়তে সে হিমু হইয়া গেছে গা। ফলে, ওই বছর তার আর পরীক্ষা দেয়া হয় নাই।

সেই বছর আমি ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হইলে ফিরোজ একদিন আমার বাসায় ‘এবং হিমু’ বইটা নিয়া হাজির হয় এবং কলেজে যাওয়ার পথে আমার সাথে একদিন শাহবাগ পর্যন্ত যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। বইটার উৎসর্গপত্রে হুমায়ূন আহমেদ লেইখা দিছিলেন, ‘ব্রাত্য রাইসু, যে মাঝে মাঝে হিমুর মতো হাসে।’

তো, পর পর বেশ কয়দিন শাহবাগে বইসা থাইকাও হিমু জাতীয় কাউরে খুঁইজা পাওয়া গেল না। মারজুক রাসেলকে পাওয়া গেল। তার বুদ্ধিতে পিজির বটতলায় গিয়া দেখা গেল কিছু ভাবগম্ভীর লোক গোল হইয়া বইসা আছেন, তার মধ্যে একজন একটু পর পর চরকির মতো এক ঠ্যাঙের উপরে ঘুরান খাইতেছেন। ওই চরকি হইলেন ব্রাত্য রাইসু। তারে খুব অ্যারোগেন্ট দেখাইতেছিল সেইদিন।

আমরা প্রায় ঘণ্টাখানেক তাকে দূর থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলাম এবং যারপরনাই হতাশ হইলাম। ফিরোজের হিমুগিরি জন্মের মতো ছুইটা গেল। এরপরে আমরা আর শাহবাগে যাই নাই।

শোয়েব সর্বনাম

ব্রাত্য রাইসুর লগে তখনো আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে নাই। তার লগে পরিচয় সম্ভবত দুইহজার ছয় সাতের দিকে। তখন আমিও আজিজের নামকরা প্রতিষ্ঠানবিরোধী লোক। সেই বছর প্রোব ম্যাগাজিনের কাভার করা হইছে আমারে নিয়া। ইংরেজিতে ইন্টারভিউ ছাপছে। আমি দিনমান কলার উঁচা কইরা আজিজ মার্কেটের এক সিঁড়ি দিয়া উঠি আর আরেক সিঁড়ি দিয়া নামি। দেশের যাবতীয় সাহিত্যিকরা তখনো আজিজ মার্কেটে গড়াগড়ি খায়। মোটমাট ছয়টা সিঁড়ি আছে সেই মার্কেটে। সেইসব সিঁড়িগুলাতে তারা বইসা বইসা চা সিগারেট গাঞ্জাদি খায়। আমার সিঁড়ি উঠানামার উদ্দেশ্য ছিল এই সকল গড়াগড়ি খাওয়া সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ। তাতে লাভ হয় নাই। তখনো দুই চাইরটা পত্রপত্রিকায় কবিতা ছবি ইত্যাদি আসলেও আজিজে কেউ কাউরে তেমন পাত্তা দিতেন না।

তেমন একদিন বিকালের দিকে দেখি দোতালার একপাশে ব্রাত্য রাইসু খাড়ায়া আছেন। আমি ছুইটা গিয়া পকেট থেকা একতোড়া কবিতা তার দিকে আগায়া দিয়া পড়তে অনুরোধ করলাম। আমার প্রতি ব্রাত্য রাইসুর প্রথম বাক্যটা ছিল, আমি আনপাবলিশড কবিতা পড়ি না!

একজন কবির জন্য এই রকম অপমান আর হয় না। আজিজে অনেক লোক ছিল, এখনো আছে, যারা রাইসুর নিন্দা করতে ভালোবাসে। আমি তৎক্ষণাৎ তাদের দলে গিয়া যোগ দিলাম। তখনো রাইসুর কবিতার লগে আমার পরিচয় নাই। ফলে হেথায় সেথায় তার নিন্দা কইরা বেড়াইতে আমার কোনও সমস্যা হয় নাই।

বছরখানেক পরে, সম্ভবত চ্যানেল আইয়ের সিদ্ধেশ্বরীর অফিসে বইসা প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার আমাকে ব্রাত্য রাইসুর কবিতা পড়ার পরামর্শ দেন। অনিকেত শামীম সম্পাদিত লোক পত্রিকাটার কথাও তিনি বলেন। সেই পত্রিকায় ব্রাত্য রাইসুর কবিতা পড়ার পর বাংলা কবিতা সম্পর্কে আমার ধারণা বদলাইয়া যায়।

সেইদিন আমি পুরা আজিজ মার্কেট ঘুরতে থাকি রাইসুর কবিতার বই খুঁজতে গিয়া। কোথাও পাওয়া যায় না। পরে সন্ধ্যার দিকে তারে ফোন কইরা বসি, রাইসু ভাই, আপনের একটা কবিতার বই দরকার। উনি ভদ্রলোকের মতো পরের দিন তার একটা বই নিয়া আজিজ মার্কেটে আইসা আমাকে উপহার দেন। কিছুটা লজ্জা নিয়া অটোগ্রাফও। ব্রাত্য রাইসুর কাছে এতটা ভদ্রতা আশা করি নাই।

সেইদিন উনার সাথে গোফওয়ালা এক ভদ্রলোকের সাক্ষাৎ হইলো। সেই ভদ্রলোক উনারে সাকুরাতে যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই রাইসু ভাই তারে প্রশ্ন রাখলেন, শোয়েব সর্বনামকেও আপনি মদ খাওয়াইতে রাজি আছেন কি না? এরপর আমার দিকে অনুমতি নেয়ার ভঙ্গিমায় জিগাইলেন, আপনি মদ খাবেন তো?

আমি হতভম্ব অবস্থায় রাজি হইলাম।

মদের টেবিলে রাইসু ভাই আমার সাথে সাহিত্য নিয়া দীর্ঘ আলাপ করলেন। সমালোচনা জানাইলেন। বাংলা সাহিত্য নিয়া উনার বোঝাপড়া সম্পর্কে আমি একধরনের ধারণা পাইলাম। ভদ্রলোক পেগের পর পেগ অর্ডার করতে থাকলেন! আমি ভাবলাম, এইসব সাহিত্য বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ নাই।

পরের দিন সন্ধ্যায় আজিজের একই জায়গায় একই ভদ্রলোকের সাথে আবার দেখা। আমি কৃতজ্ঞতাবশত তারে সিগারেট অফার করলে তিনি বিরক্তি নিয়া জানাইলেন, রাইসু তো আজকে আর আসলো না। চলেন, আপনে আর আমিই যাই। এইবার আমার অবস্থা হতভম্বের পরের পর্যায়ে। উনি আমারে জানাইলেন, রাইসু আপনেরে নিয়া মদ খায়, আপনি নিশ্চয়ই বড় কবি। সেইদিন মদের টেবিলে বইসা আমি অস্বস্তির সাথে খেয়াল করলাম, এই ভদ্রলোকের নাম আমি জানি না। উনি ছিলেন কথাসাহিত্যিক জিয়া হাশান। তারে নিয়া পরে একসময় লেখব নে।

ব্রাত্য রাইসু যাদের সাথে মিশেন তাদের সম্পর্কে এইরকম ধারণা অনেকেরই আছে। আমার এক বান্ধবী, যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহবুব মোর্শেদের ক্লাসমেট ছিল, তার ধারণা, মাহবুব মোর্শেদ নিশ্চয়ই ভাল লেখক। কারণ, ফেসবুকে সে দেখতে পাইতে যে, ব্রাত্য রাইসু তাকে চিনে।

তবে তিনি একবার যারে চিনলেন, সর্বদাই তারে চিনতে থাকবেন, ব্যাপারটা এমন না। ফোন করলে অচেনা লোকের মতো প্রশ্ন করেন, আচ্ছা কী ব্যাপার বলেন? হি ইজ টোটালি আনপ্রেডিক্টেবল। এইটা অবশ্য কোনো বিশেষত্ব না। ব্রাত্য রাইসুর বিশেষত্ব হইলো, তার পরিচিত লোকেরাও তার বিষয়ে আনপ্রেডিক্টেবল আচরণ কইরা থাকেন। স্পেশালি, সাহিত্যিকরা।

সাহিত্যিকদের নানান আলাপ আলোচনায় প্রায়ই ব্রাত্য রাইসুর নাম ওঠে। সেইখানে দেখা যায় রাইসুর কবিতা নিয়া প্রায় সকলেরই অ্যালার্জি আছে। বেশিরভাগের মন্তব্য নিন্দামূলক। একদম সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার এক কবির বাসায় ভারতের এক কবি আসছেন, সেইখানে দাওয়াত পাইয়া আমিও হাজির হইলাম। বাংলা কবিতা নিয়া আলাপ হইতেছিল, প্রাসঙ্গিকভাবেই রাইসুর প্রসঙ্গ উঠল। কিছুক্ষণ আলাপের পর হাজিরানে মজলিশ একমত হইলেন, রাইসুর কবিতা, ওইগুলা কিছু হয় না। ভারতের কবি বললেন, রাইসুর ফেসবুক স্ট্যাটাস ভালো। যুক্তির প্রয়োগ আছে। কিন্তু কবিতা? উঁহুহ! তাদের একজন সামনে রাইসুরে না পাইয়া আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমায় আমারে প্রশ্ন রাখলেন, রাইসুর একটা কবিতার লাইন আপনি বলেন। কোনটা কবিতা হইছে, বলেন।

আমি আশ্চর্য হইয়া লক্ষ করলাম, সেই আড্ডায় উপস্থিত লোকেদের অনেকেই এখন আবার রাইসুর কবিতা নিয়া প্রশস্তিমূলক লেখা লেখতেছেন। ভারতের সেই কবি রাইসুর কবিতার বিশেষত্ব নিয়া বিরাট এক প্রবন্ধ লেইখা পোস্ট কইরা দিছেন! পিপল আর সো আনপ্রেডিক্টেবল অ্যাবাউট রাইসু!

আমি খিলগাঁও সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। দুই হাজার দশ সালে স্কুল কমিটিি বেশ বড়সড় কইরা রিইউনিয়ন করার সিদ্ধান্ত নিল। ব্যাপক খানাপিনার আয়োজন। হাতি ঘোড়া ভাড়া কইরা আনা হবে শোডাউন করতে। সাহিত্যিক হিসেবে আমার দায়িত্ব হইলো সাময়িকী সম্পাদনা করা। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে সাহিত্যিক কারা আছেন সেইটা আমি খুঁইজা বাইর করার উদ্যোগ নিলাম।

প্রথম আলোর উপসম্পাদক জাকারিয়া ভাই ছিলেন তেমন একজন, তার কাছে জানা গেল, ব্রাত্য রাইসু আমাদের স্কুলের চুরাশি ব্যাচ। আমার জন্ম পঁচাশিতে। রাইসু ভাই এত বুইড়া হবেন তেমন ভাবি নাই। সাময়িকীসূত্রে তার লগে আবার যোগাযোগ স্থাপিত হইল।

ব্রাত্য রাইসুর কাছে লেখা চাইতে নাই। বদনাম আছে, উনি কাউরে লেখা দেন না, উপরন্তু সম্পাদকদের অপমান কইরা থাকেন। একবার আমি তার লগে, আজিজের পিছন দিকের রাস্তায় হবে, হাঁইটা যাইতেছি, আশির দশকের কবি বদরুল হায়দার লেখা চাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়া কুশল জিগাইলেন, রাইসু কেমন আছ? রাইসু না শোনার ভান কইরা কিছুদূর আগায়ে গিয়া আবার ফিরত আইসা তারে ডাইকা বললেন, শোনেন, এখন থেকে আমারে ‘আপনি’ কইরা বলবেন।

তো, আমি রিইউনিয়নের দাওয়াত দিয়া তার কাছে লেখা চাইলাম। উনি চাঁদার কথা জিগাইলেন, আমি জানাইলাম এক হাজার টাকা। উনি প্রশ্ন রাখলেন, তাইলে যার কাছে এক হাজার টাকা নাই তারে আপনেরা ঢুকতে দিবেন না? এইটা তো টাকাওয়ালাদের রিইউনিয়ন!

যাই হোক, রিইউনিয়নে না আসলেও উনি এক ফর্মা সাইজের একটা লেখা দিছিলেন। লেখার সাইজ নিয়া স্কুল কমিটির প্রবল আপত্তির কারণে সেই লেখা ছাপা যায় নাই। পরে সেইটা বদলাইয়া একটা ছোট লেখা দিতেও রাজি হইছিলেন তিনি। শহীদ মিনারের পবিত্রতা বিষয়ক প্রবন্ধ। প্রবন্ধে শহীদ মিনারে জুতা নিয়া উঠতে না দেয়ার নিন্দা ছিল। পরে সেই লেখা নিয়াও স্কুলে কমিটিতে তোলপাড় ঘটে। আমার সম্পাদকগিরি যায় যায় অবস্থা। তৃতীয়বার তার কাছে লেখা চাওয়ার উপায় নাই, আবার ব্রাত্য রাইসুকে ছাড়া সাময়িকী করাও আমার পক্ষে সম্ভব না। ব্রাত্য রাইসু হইলো এইরকম এক বেকায়দা ব্যাপার।

ব্রাত্য রাইসুর লগে আমার সম্পর্কটা এইরকম বেকায়দা ধরনেরই। উনার দাওয়াতে আমি প্রচুর মদ খাইছি, কিন্তু আমি দাওয়াত দিলে উনি আর আসতে রাজি হন না। বলেন, মদ খাওয়া ছাইড়া দিছি বস! হার্টে সমস্যা। জন্মদিন উপলক্ষে আমার বান্ধবী উনারে কিছু একটা গিফট করতে চাইলে উনি হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান কইরা জানান, কারও গিফট নিলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে হয়। হাসিমুখে কুশল বিনিময় করতে হয়। এইসব কারণে আমি গিফট নেই না। আমার হার্টে সমস্যা হয়।

উনার হার্টে সমস্যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা আমার বান্ধবীর নাই। ব্রাত্য রাইসুর হার্ট ভালো থাকুক। উনি স্বাস্থ্যসচেতন লোক। স্পিরুলিনা খান। উনার বয়স বাড়ে না। বাড়লেও বছরে সম্ভবত মাসখানেক বাড়ে। ফলে, আমি নিশ্চিত, ব্রাত্য রাইসুর এই রকম পঞ্চাশ আরো আসবে।

ব্রাত্য রাইসু সম্ভবত বাংলাদেশে একমাত্র কবি, যিনি ঈর্ষণীয় এক কবিজীবন যাপন করেন! বিরল সৌভাগ্য নিয়া জন্মাইছেন তিনি, যারে হাঁইটা যাইতে দেখলে শাহবাগে বইসা থাকা নারীরা একে অন্যেরে বলে, ওই দেখ, বাংলা কবিতা হাঁইটা যাইতেছে!

বাংলা কবিতা ভালো থাকুক। ব্রাত্য রাইসু ভালো থাকুক।

(কভার ছবি. সুমন কর্মকার শ্রাবণ, ২০১৫)

Facebook Comments
More from শোয়েব সর্বনাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *