হোয়াট ইজ ব্রাত্য রাইসু

রাইসু নিজেকে সমাজের সামনে ‘ভালো মানুষ’ করে তোলেন না। তার মধ্যে ‘ভালো মানুষ’ হয়ে উঠার তাগিদ দেখা যায় না। ‘মানুষ’ হওয়ার ব্যবসায় উনি নাই।

বেশ কিছুদিন থেকে প্রশ্নটা মনে হইতেছিল আসলে ব্রাত্য রাইসু কী জিনিস, কী চিজ? পরে লক্ষ করতে থাকলাম, প্রশ্নটা আসলে উনি নিজে। উনি নিজেকে ‘প্রশ্ন’ আকারে হাজির করছেন। ‘কোনো কিছুর জবাব’ আকারে না।

অধিকাংশ লেখক ‘জবাবমূলক’ জীবন চর্চা করেন। সকলের সামনে এমনভাবে হাজির থাকেন, যেন জগতের সকল মৌলিক প্রশ্নের জবাব নিয়া বইসা আছেন। তারা অবিরাম নিজের সংজ্ঞা দিতে থাকেন। কিন্তু ব্রাত্য রাইসু এই চর্চা থিকা দূরে দাঁড়াইয়া থাকেন; নিছক আপাদমস্তক প্রশ্ন হইয়া। মে বি এই কারণে উনি সাধারণত ব্যাখ্যামূলক কর্মকাণ্ড এভয়েড করেন। কাউরে কিছু ‘বুঝাইয়া গিলাইয়া’ দিতে চান না।

যুবা রহমান

আমার মনে হয়, রাইসুর গোটা জীবনের যাবতীয় চর্চা (সাহিত্য, দর্শন, আঁকা, তর্ক) অপর লোকের সামনে ‘কী’ হিসেবে হাজির থাকার জন্য। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, উনার ৫০ বছর নিয়া যারা লিখছেন, অধিকাংশ লেখক তাদের লেখায় ‘রাইসু কী’ এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রায় সকলে অভিজ্ঞতা দিয়া বলবার চেষ্টা করছেন, ‘রাইসু এই’, ‘রাইসু সেই’। এর অর্থ হইল আগে থেকেই প্রশ্নটা জারি ছিল যে ‘রাইসু আসলে কী’—‘হোয়াট ইজ ব্রাত্য রাইসু’।

একটা ‘সাকসেসফুল প্রশ্ন’ বিরাট ব্যাপার। অনেক বড় ঘটনা। এই কারণে ব্রাত্য রাইসু এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দরকারি ইস্যু। বাংলায় যারা চিন্তা করেন, তাদের প্রতিদিনই রাইসুরে মোকাবিলা করা লাগে। সকালে উইঠা দুইটা গাইল দিলেও তারা রাইসুরে দেন। রাইসু কী কয়, সেই দিকে খেয়াল রাখেন। অনেকে তারে বাতিল করেন। কিন্তু তারা মানতে নারাজ যে এই বাতিল করার মধ্য দিয়েই তারা রাইসুর লগে এনগেইজড আছেন। তাদের পাত্তা না দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাতাসে রাইসুর ওজন বাড়তেছে।

এই যে নিজেকে ‘গাইলের পাত্র’ বা ‘পাত্তা না দেওয়ার পাত্র’ হিসেবে রাইসু হাজির আছেন, এইটাও কিন্তু সমাজের জন্য কম না। কারে নির্ভয়ে গাইল দিতে পারেন? সমাজে তো গাইল দেওয়ার লোক রেয়ার। কারে আপনি গাইল দিবেন। সবাই তো আপনার ‘সেলাম’ নেওয়ার জন্য বইসা আছেন। কারে আপনি থোড়াই কেয়ার করতে যাবেন। মনে তো একটু হইলেও ডর লাগে যে শাহবাগ মোড়ে পিটনাই দেয় নাকি! কিন্তু লোকে দেখি রাইসুরে নির্ভয়ে গাইল দেয়। অপমান করে। রাইসু নিজের স্টাইলে এসব মোকাবিলা করেন। কিন্তু স্বভাব বদলায় না।

রাইসু নিজেকে সমাজের সামনে ‘ভালো মানুষ’ করে তোলেন না। তার মধ্যে ‘ভালো মানুষ’ হয়ে উঠার তাগিদ দেখা যায় না। ‘মানুষ’ হওয়ার ব্যবসায় উনি নাই। এইটা অনেক দরকারি ইস্যু। আমরা সবাই ঘরে যাই চর্চা করি, বাইরে ‘ভালো মানুষটি’ সাজতে চাই। এই ক্ষেত্রে রাইসু উল্টা। লোকে গোপনে কিশোরী শরীর চায়, কিন্তু বাইরে কিশোরী বাঁচাও আন্দোলন করে। আর রাইসু প্রকাশ্যেই কিশোরী/ তরুণী সঙ্গ চান। আবার দেখেন, রাইসু চোর-বাটপার, ধর্ষকদের অধিকার নিয়া কথা কন। অথচ চোর-বাটপারের কোনো অধিকার থাকতে পারে, সেইটাই বঙ্গসমাজের জানার মধ্যে নাই, দায়িত্ব পালন তো দূরের কথা। এই ইস্যুগুলো ‘প্রশ্নবোধক রাইসুরে’ মজবুত করছে।

কোনো একদিন মনে হয়, রাইসুরে ফেসবুকে জিগাইতে দেখছি, “ফরহাদ মজহার/ সলিমুল্লাহ খান থিকা তিনি কেন বেটার বুদ্ধিজীবী” (তথ্য ভুল থাকলে কেউ ধরাইয়া দিলে শুধরাবোনে)। ওই পোস্টে কিছু কই নাই। আইজ কই, ফরহাদ/ সলিমুল্লাহ দুজনই ‘ভালো মানুষের’ কারবার করেন। দুইজনই ‘ভাল মানুষের ধারণা’র সাবস্ক্রাইবার। ফরহাদ মজহারের চিন্তায় এইখানে ছেদ ঘটছে, যেইটা রাইসু কনটিনিউ করছেন। এইখানে রাইসু মজহারের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এইটা নিয়া একটা উদাহরণ দেই, মজহাররে তুইলা নিয়া ফেরত দেওয়ার পর তার চরিত্রে ‘কালিমা’ দিল যে তিনি ‘বালিকা প্রেগনেন্ট’ করছেন। এখন কন, রাইসুর ক্ষেত্রে ‘এই কালিমা’ খাটব কি না? খাটব তো না-ই বরং লোকে হাসব!

নানা ইস্যুতে রাইসু স্পেস তৈরি করছেন—বাড়াইছেন। সেই স্পেসগুলো আমরাও ইউজ করি। যে কথা বলা টাফ হইত রাইসুর কারণে তা ইজি হইছে। এই কারণে উনার কাছে কৃতজ্ঞ। উনার লগে এক শহরে আছি, এইটাই বেশ মজার। রাইসু যে শহরের বাতাসের সিসা নিতেছেন, আমিও সেই সিসাই নিতেছি। এইটা তো কম উদযাপনের না!

(কভার ফটো. যুবা রহমান, পদ্মার পাড়ে; ছবি. প্রদীপ চৌধুরী অপূর্ব)

Facebook Comments
More from যুবা রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *