১৯৮৯ এর আড্ডা

ব্রাত্য রাইসুর কবিতা আমাদের সময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা, পড়লেই টের পাওয়া যায়।

সময়টা ১৯৮৯ সাল। সেই সময় ঢাকা শহরের নানা জায়গায় নিয়মিত বেশকিছু সাহিত্য আড্ডা হইত। এর মধ্যে সেগুনবাগিচায় কবি সাইমুম রাজু সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘সূচক’কে কেন্দ্র করে বিশ্ব-পরিচয় পাঠাগারে, কবি সরকার আমিন সম্পাদিত ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’কে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের উস-প্রেসে, কবি মঈন চৌধুরী সম্পাদিত ‘প্রান্ত’-কে কেন্দ্র করে শান্তিনগরে, কবি ফরহাদ মজহার সম্পাদিত ‘বিষ্যুদবার’-কে কেন্দ্র করে শ্যামলীতে নিয়মিত কবিতা, শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র-দর্শনের আড্ডা হইত; পালা করে আমি সবগুলোতেই নিয়মিত যাইতাম।

এ ছাড়াও মাঝেমধ্যে শাহবাগের সিলভানা আর কোহিনূরে ছুটা-আড্ডায় অনেকবার, পিজির পেছনে ধোঁয়া-আড্ডায় দুই-তিনবার গেছি… বোহেমিয়ান জীবন-যাপনের দিকে আমার ভীষণ ঝোঁক ছিল বরাবরই, হঠাৎ হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে যাওয়া, বড়দের সাথে ধুমছে তর্ক করা, কবিতা লেখা, প্রেম করা, চরকির মত ঘুরে বাড়ানোই ছিল আমার আসল কাম সেই সময়।

শাহেদ কায়েস

আমার সেই চরকি-সময়ে ব্রাত্য রাইসুর সাথে পরিচয় ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি, কবি মঈন চৌধুরীর শান্তিনগরের বাসায়, মঈন ভাই সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘প্রান্ত’র কোনো এক আড্ডায়। তখন আমি থাকতাম মধ্য বাসাবো। সত্যি বলতে কি সেই সময় রাইসুর সাথে আমার খুব বেশি আড্ডা হয় নাই, আমার বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল কবির হুমায়ূন, সরকার আমিন, মুজিব ইরম, শাহনাজ মুন্নি, সাদ কামালী, তাপস গায়েন, চঞ্চল আশরাফ, জোনায়েদ সাকী, নাসিরুদ্দিন, পরবর্তীতে রাজীব নূরের সাথে; আলফ্রেড খোকন অনেক দূরে থাকলেও খোকনের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক আমি অনুভব করতাম।

ব্রাত্য রাইসুর সাথে পরিচিত হওয়ার শুরুতেই তারে আমার ভালো লেগে যায় তার বোহেমিয়ান জীবন-যাপন, মুখের উপর সত্যি কথাটা বলে ফেলতে পারা আর তার ফান-প্রিয়তা, অর্থাৎ সেন্স অব হিউমারের জন্য। আমার যতটুকু মনে পড়ে রাইসুর সাথে আমার লম্বা আড্ডা হইছিল হাতে গোনা কয়েকদিন মাত্র; বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে লিটলম্যাগ ‘নদী’ আয়োজিত কবিতা পাঠের সন্ধ্যায়, পরিবাগের রাস্তা ধরে হাঁটতে-হাঁটতে, বেশ পরে একদিন আজিজ মার্কেটের দোতলায়। পরবর্তীতে মাঝেমধ্যে অনলাইন চ্যাট হইত নব্বই দশকের শেষের দিকে ‘এমআইয়ারসি’তে, তখন আমি দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজে (এখন চেন্নাই), পড়াশুনার জন্য; অধিকাংশ সময়ে অনলাইন আড্ডার বিষয় ছিল কবিতা ও জীবন।

রাইসুর আরেকটা বিষয় আমাকে মুগ্ধ করতো খুব, সেটা হচ্ছে তার ব্যাপক পাঠ অভিজ্ঞতা, তার কাছ থেকে নতুন নতুন বইয়ের সন্ধান পেতাম, কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল সম্পর্কে আমি প্রথম শুনি রাইসুর কাছে। তার কাছ থেকে ধার নিয়ে, পরবর্তীতে ফটোকপি করে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের বেশ কিছু কবিতা আমি পড়ে ফেলি এবং ভিন্ন স্বাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা পাই।

শুরুতে রাইসুর কবিতা আমাকে খুব বেশি আকর্ষণ না করলেও পরে ধীরে ধীরে তার কবিতা আমার ভালো লাগতে শুরু করে, বিশেষ করে সেই সময় তার স্যানাটোরিয়াম সিরিজের কবিতাগুলো আমার অসাধারণ লাগে। ব্রাত্য রাইসুর কবিতা আমাদের সময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা, পড়লেই টের পাওয়া যায়। তার কবিতায় হিউমার, তীর্যক শ্লেষ আমার ভালো লাগে। তার জীবনযাপন এবং কবিতায় কোনো ভান নাই; ভালো লাগা, মন্দ লাগার বিষয়গুলো সে স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে পারে।

কবি ব্রাত্য রাইসুর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা রইল। রাইসু বেঁচে থাকুক দীর্ঘসময়, তার হাত ধরে বাংলা কবিতা আরও সমৃদ্ধ হোক।

গোয়াংজু, দক্ষিণ কোরিয়া, ১৮ নভেম্বর ২০১৭

Facebook Comments

কবি ও বিশ্ব-পরিব্রাজক। জন্ম ১৯৬৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকায়। স্থায়ী নিবাস সোনারগাঁ। কাজ করেন মানুষের অধিকার নিয়ে। আপাতত অবস্থান কোরিয়ায়, মাস্টার্স করছেন গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার বিষয়ে।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতার বই: বাক ফেরার অভিজ্ঞতা, ১৯৯৯; চূড়ায় হারানো কণ্ঠস্বর, ২০০৩; মায়াদ্বীপ, ২০১৫
সম্পাদিত বই: মঙ্গলসন্ধ্যা প্রেমের কবিতা, ২০১৬
মানবাধিকার বিষয়ক বই: The Gwangju Laureates: Human Rights and Democracy in 12 Asian Countries, 2015; published from Gwangju, South Korea.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *